ঠিক সেই মুহূর্তে হাঁপাতে-হাঁপাতে ছাদে ফিরে এল বকুল। হাতে বইয়ের মাপের একটা সবুজ কাঠের বাক্স।
বাক্সটা বৃদ্ধ হুনুরের হাতে দিয়েই মেয়েটা হাত বাড়াল তাঁর দিকে ‘তোমার রুবিক কিউবটা আমাকে একটু দাও, আমি একটু খেলি—।’
এসিজি হেসে কিউবটা পকেট থেকে বের করে বকুলের হাতে দিলেন, বললেন, ‘এই নাও। বাক্সটা আনার সময় তোমার মা দেখতে পায়নি তো?’
বকুল মাথা ঝাঁকাল : ‘না।’
এসিজি বললেন, ‘তুমি এবার নীচে চলে যাও। সন্ধে হয়ে আসছে—তোমার মা চিন্তা করবে। আমি যাওয়ার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাব।’
রুবিক কিউবটা হাতে নিয়ে বকুল লাফাতে-লাফাতে চলে গেল।
অশোকচন্দ্র রঙ্গলালবাবুকে বললেন, ‘আপনি আমাকে একটু সাহায্য করুন, রঙ্গলালবাবু। নীচে গিয়ে আপনি সুমিতা নিয়োগীকে ডেকে নিয়ে আসুন। জলধরবাবু বা ওঁর স্ত্রীর যেন জানতে না পারেন। বলবেন, খুব জরুরি ব্যাপার—আমি ওঁর সঙ্গে নিরিবিলি একটু কথা বলতে চাই।’
রঙ্গলালবাবু বিহ্বল চোখে অশোকচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বৃদ্ধের কথা শেষ হতেই ঠোঁট উলটে বললেন, ‘মিস্টিরিয়াস ব্যাপার-স্যাপার বুঝিতে না পারি/খুনি যেন চেনা কিন্তু চিনিতে না পারি।’ স্বভাব-কবিতা বলে রঙ্গলাল সুমিতাকে ডেকে নিয়ে আসতে চলে গেলেন।
সুমিতাকে নিয়ে রঙ্গলাল যখন ফিরে এলেন তখন সন্ধের ছায়া মন্থরভাবে নেমে এসেছে।
এসিজি বাক্সটা সুমিতাকে দেখিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘এটা আপনার?’
অস্পষ্ট আলোতেও সুমিতা বাক্সটা চিনতে পারল, বলল, ‘হ্যাঁ—কিন্তু এটা আপনি কী করে পেলেন?’
‘বকুল নিয়ে এসেছে। ও আমাদের সব বলেছে—।’
সুমিতা আচমকা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আকাশের কালচে নীল স্লেটে তখন সন্ধ্যাতারাই একমাত্র আলো।
সুমিতার কান্না-একটু স্তিমিত হয়ে এলে অশোকচন্দ্র প্রশ্ন করলেন, ‘বাক্সের ভেতরে কী আছে, মিসেস নিয়োগী?’
সুমিতা কান্না-প্লাবিত চোখে এসিজির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার ছোটবেলার সব জিনিস। মা জমিয়ে রেখেছিল—বিয়ের সময় বাক্সটা আমাকে দিয়েছিল। ওতে আমার ছোটবেলার ফটো আছে, চুলের কাঁটা-ফিতে আছে, খেলার পুতুল আছে, হাতের লেখা আছে—দামি কিছুই নেই।’
‘বাক্সটা রণতোষবাবুকে আপনি দিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ। উনি আমার ছোটবেলার ফটো, হাতের লেখা—এসব দেখতে চেয়েছিলেন।’
‘কেন?’
এই প্রশ্নে আবার অসহায়ের মতো কেঁদে ফেলল সুমিতা। অনেক কষ্টে অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘সবই আমাদের পোড়া কপাল। আমরা এক অদ্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। সবসময় একটা চোরা টান টের পেতাম—।’
‘সেইজন্যেই কি রণতোষবাবু ইদানীং অপরাধবোধে ভুগছিলেন?’
সুমিতা ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। তা ছাড়া, আরও একটা ব্যাপার হয়েছিল।’
‘কী ব্যাপার?’
‘রনোদা…রনোদা…আমাকে পড়াতেন।’ ইতস্তত করে বলল সুমিতা।
‘জানি—’ আলতো করে বললেন এসিজি।
‘একদিন বাংলা উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে-করতে উনি রবীন্দ্রনাথের ”শেষের কবিতা” প্রসঙ্গে চলে এসেছিলেন। তারপর হঠাৎই কেমন বেসামাল হয়ে গিয়ে অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ”সুমিতা, কিছুদিন ধরে কেবলই মনে হচ্ছে তুমি আমার বন্যা, তুমিই আমার মিতা—” এ-কথা বলেই রনোদা আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন…’ সুমিতা মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
অশোকচন্দ্র ওকে কান্নার সময় দিয়ে অপেক্ষা করে রইলেন।
সুমিতা একটু পরে কান্না-ভাঙা গলায় বলল, ‘আমি রনোদাকে শ্রদ্ধা করতাম, ভালোওবাসতাম। তাই ধৈর্য হারানোটা আমার খারাপ লাগেনি। কিন্তু তারপরই দেখলাম আক্ষেপে গ্লানিতে ”ছি-ছি” করে উনি একেবারে ভেঙে পড়লেন। বারবার বলতে লাগলেন, ”এ কী অন্যায় আমি করে বসলাম!” আমি যতই ওঁকে বোঝালাম যে এটা অন্যায় নয়, এমনকী কোনও দুর্ঘটনাও নয়। বরং যা স্বাভাবিক তাই-ই হয়েছে। কিন্তু রনোদা মানতে পারেননি। অপরাধবোধে একেবারে ডুবে গিয়েছিলেন। আমি অনেক করে বুঝিয়েও ওঁকে শান্ত করতে পারিনি। পাপ, শাস্তি, মৃত্যু—এসব নিয়ে লিখে-লিখে পাতার পর পাতা ভরতি করে ফেললেন। তারপর…।’
এসিজির মনে পড়ল, ‘পাপ ও মৃত্যু’ শিরোনামে এই লেখাগুলোই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন।
‘তারপর…’ আবার বলতে লাগল সুমিতা, ‘তারপর সেই ডিপ্রেশন থেকেই সুইসাইড করলেন।’
‘সুইসাইড কেমন করে বুঝলেন?’
আবছা অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে সুমিতার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘রনোদার সুইসাইড নোটটা আমার কাছে আছে। বকুল ওই বাক্সটা নিয়ে আসার পর আমি চুপিচুপি রনোদার ঘরে আসি। দেখি সুইসাইড নোটটা রনোদার লেখার টেবিলে খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। তাতে লেখা, ”তোমাকে কখন ভালোবেসে ফেলেছি বুঝতে পারিনি। আর বুঝতে পারিনি বলেই বশ হারিয়ে ওই পাপে তোমাকে জড়িয়ে ফেলেছি। তারপর থেকে বারবার লজ্জায় আমি মরে গেছি। এবার সত্যি-সত্যি মরলাম।”
সুমিতা এবার হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল—সর্বস্বান্ত দিশেহারা মানুষ যেভাবে কাঁদে।
এসিজি কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে সান্ত্বনা দিলেন।
অনেকক্ষণ পর সুমিতার কান্না থামল।
ও বলল, ”ওই সুইসাইড নোট পুলিশের হাতে গেলে রনোদাকে জড়িয়ে বাজে একটা স্ক্যান্ডাল হত। সেটা আমার পক্ষে সহ্য করা খুব কঠিন হত। আমি আমার চিন্তা করিনি—শুধু রনোদার কথাই ভেবেছিলাম…বিশ্বাস করুন…।’
‘সেইজন্যেই আসল সুইসাইড নোট সরিয়ে রণতোষবাবুর লেখা থেকে একটা পাতার খানিকটা ছিঁড়ে সুইসাইড নোট হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন?’
