সুমিতার শরীর ফুলে-ফুলে উঠছিল। বড় করে শ্বাস টেনে ও বলল, ‘হ্যাঁ—রনোদার ওই ”পাপ ও মৃত্যু” নামে লেখার পাতা থেকে—আপনি হয়তো দেখেছেন…।’
অন্ধকারেই ঘাড় হেলালেন এসিজি।
ভারি গলায় সুমিতা বলল, ‘আমাকে যা-খুশি সাজা দিন, কিন্তু দেখবেন, দেবতার মতো ওই মানুষটার কোথাও যেন কালি না লাগে। উনি যে-ভুল করেছিলেন সেটা কোনও ভুলই নয়। কিন্তু ওঁর নীতিবাগিশ মন ভেতরে-ভেতরে ওঁর গলা টিপে ধরেছিল, ওঁকে কুরেকুরে খাচ্ছিল…।’
পাশের কোনও বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ শোনা গেল কয়েকবার।
এসিজি নরম গলায় বললেন, ‘এবারে নীচে চলুন। ব্যাপারটা যাতে ঠিকমতো মিটে যায় সেজন্যে ইন্সপেক্টর যাদবকে আমি রিকোয়েস্ট করব। আপনি সুইসাইড নোটটা আমাকে দিন।’
‘নীচে চলুন, দিচ্ছি—।’
তিনজন ছায়া-ছায়া মানুষ অকুস্থলের পাশ দিয়ে হেঁটে এল সিঁড়ির কাছে। অবসন্নভাবে সিঁড়ি নামতে লাগল।
একতলার কাছাকাছি এসে সুমিতা অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘অনেকবার ভেবেছি সুইসাইড নোটটা পুড়িয়ে ফেলব, কিন্তু পারিনি…ওঁর শেষ লেখা…।’ সুমিতা আবার কেঁদে ফেলল।
রঙ্গলালবাবু বললেন, মিসেস নিয়োগী, প্লিজ… জলধরবাবুরা শুনতে পাবেন।’
এসিজি বললেন, ‘আমরা আর ভেতরে ঢুকব না। আপনি শুধু বকুলকে একবার ডেকে দেবেন। আর…এই নিন আপনার বাক্স…।’
সুমিতা চোখ মুছতে-মুছতে বাক্সটা নিল। তারপর ওঁদের অলিপথে দাঁড় করিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে।
একটু পরেই সুমিতা ফিরে এল, একটা ভাঁজ করা কাগজ তুলে দিল এসিজির হাতে। এসিজি সেটা না দেখেই পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন।
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল বকুল।
ওকে দেখে এসিজি বললেন, ‘মা-মণি, আমরা এবার গুডবাই—।’
‘আবার যেন দেখা পাই—’ সপ্রতিভভাবে বলল বকুল।
এসিজি অবাক চোখে রঙ্গলালবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘স্বভাব-কবিতা কি সংক্রামক ব্যাধি?’
রঙ্গলাল হাসলেন, কিছু বললেন না।
বকুল অশোকচন্দ্রের রুবিক কিউবটা ফেরত দিয়ে বলল, ‘আমারটা কাল মনে করে আনবে কিন্তু—।’
এসিজি কিউবটা পকেটে ঢুকিয়ে রেখে বললেন, ‘অবশ্যই—’ তারপর সুমিতাকে বললেন, ‘মিসেস নিয়োগী, আপনি কোনওরকম দুশ্চিন্তা করবেন না। আর আমরা কাল সন্ধেবেলা আসছি। তখন শুধু চায়ে চলবে না, চায়ের সঙ্গে টা-ও চাই।’
সুমিতা ভেজা চোখ মুছে হাসতে চেষ্টা করল, বলল, ‘আসবেন কিন্তু—।’
রঙ্গলালবাবুকে সঙ্গে নিয়ে অশোকচন্দ্র গুপ্ত রাস্তায় বেরিয়ে এলেন।
সন্ধ্যের কলকাতা গালে-ঠোঁটে রং লাগিয়ে যথারীতি চঞ্চল হয়ে পড়েছে। এসিজি নতুন একটা সিগারেট ধরাতেই রঙ্গলালবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘সবই তো বুঝলাম, স্যার, কিন্তু ওই এক ইঞ্চির গরমিলের ব্যাপারটা কী হল?’
এসিজি সিগারেটে জম্পেশ টান দিয়ে কুলকুল করে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘বুঝতে পারেননি! ব্যাপারটা তো খুব সোজা। চেয়ার পেতে তার ওপরে ওই কাঠের বাক্সটা রেখে তবেই সিলিং ফ্যানের ঠিকমতো নাগাল পেয়েছিলেন রণতোষবাবু। তারপর ওঁর পায়ের ছটফটানিতে চেয়ার, বাক্স দুটোই উলটে গিয়েছিল—।’
রঙ্গলালবাবু প্রশংসার উজ্জ্বল চোখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ হুনুরের দিকে। তারপর সুর করে বললেন, ‘দেখে আপনার তীক্ষ্ন বুদ্ধি/হলেম আমি নিহতবুদ্ধি—।’
এসিজি চমকে রঙ্গলালের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘নিহতবুদ্ধি মানে?’
রঙ্গলালবাবু বিনীত হেসে বললেন, ‘এই ওয়ার্ডটা আমার ইনভেনশান, স্যার। নিহতবুদ্ধি মানে হল সাঙ্ঘাতিক হতবুদ্ধি অবস্থা—।’
এসিজি আর হাসি চাপতে পারলেন না।
