‘কে?’ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন রঙ্গলাল।
‘বকুল—’ হেসে বললেন এসিজি।
দোতলা থেকেই ওঁরা বকুলের গলা পাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, ও ছুটতে-ছুটতে জীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছে।
সিঁড়ির মুখে দুজনকে দেখেই ফুটফুটে মেয়েটা একগাল হেসে বলল, ‘তোমার জন্যে ওয়েট করছিলাম। এখন একটা ম্যাজিক দেখিয়ে তার সিক্রেটটা শিখিয়ে দাও—।’
এসিজি পালটা হেসে বললেন, ‘ছাদে চলো, তোমাকে আজ অনেকগুলো ম্যাজিক শিখিয়ে দেব। তবে একটা কন্ডিশান আছে—।’
‘কী কন্ডিশান?’ বকুল চোখ গোল-গোল করে প্রশ্ন করল।
‘ছাদে চলো, বলছি—।’
সরু সিঁড়ি বেয়ে ওরা তিনজন উঠে এলেন ছাদে।
একপাশে কয়েকটা ফুলগাছের টব। এলোমেলোভাবে টাঙানো নাইলনের দড়িতে শুকোতে দেওয়া জামাকাপড় ঝুলছে। বিকেলের রোদ মরে এসেছে, তবে একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। একটু দূরেই নিষ্পাপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে অকুস্থল।
এসিজি ছাদের সুরকি ওঠা ময়লা মেঝেতে বসে পড়লেন। বকুলকে কাছে ডেকে বললেন, ‘আমি তোমাকে অনেক ম্যাজিকের সিক্রেট শিখিয়ে দেব। তবে এক্সচেঞ্জে তোমাকেও কিছু সিক্রেট বলতে হবে।’
‘কী সিক্রেট, বলো—।’
‘রণতোষ জেঠুর সুইসাইডের ব্যাপারে।’
চোখের পলকে বাচ্চা মেয়েটার মুখ পালটে গেল।
বোঝা গেল, এসিজির আন্দাজে ছোড়া ঢিল ঠিক জায়গায় লেগেছে। রঙ্গলালের মনে হয়, বকুল বোধহয় সত্যিই কোনও সিক্রেট জানে।
বকুলকে পিঠ চাপড়ে সাহস দিলেন এসিজি, বললেন, ‘বলো, কোনও ভয় নেই। আমরা কাউকে বলব না—।’
একটুক্ষণ কী যেন ভাবল বকুল। তারপর যান্ত্রিক স্বরে বলল, ‘রনো আঙ্কলের ঘর থেকে আমি শুধু একটা বাক্স নিয়ে এসেছি—।’
‘কীসের বাক্স?’ ভেতরে-ভেতরে সামান্য উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন এসিজি। চেষ্টা করে তাঁকে গলার স্বর স্বাভাবিক রাখতে হল।
‘মায়ের বাক্স—’ অম্লানবদনে এসিজির প্রশ্নের জবাব দিল বকুল।
‘মায়ের বাক্স তোমার আঙ্কলের ঘরে গেল কী করে?’ রঙ্গলালবাবু এবার সক্রিয় ভূমিকা নিলেন।
‘তা তো জানি না। বোধহয় মা নিজেই আঙ্কলকে দিয়েছে।’
‘তুমি ঘরের কোথায় বাক্সটা পেলে?’ এসিজি জানতে চাইলেন।
‘ফ্লোরে পড়ে ছিল—।’
‘বাক্সটা তুমি কবে নিয়ে এসেছে?’
‘যেদিন সকালে রনো আঙ্কল সুইসাইড করেছিল, সেদিন।’
‘রনো আঙ্কল তখন কী করছিল?’
‘ওপরদিকে…অল্প-অল্প দোল খাচ্ছিল…।’
‘মাই গড!’ শিউরে উঠে অন্যদিকে মুখ ফেরালেন এসিজি।
রঙ্গলালবাবুও বেশ ঘাবড়ে গিয়ে অবাক চোখে বাচ্চা মেয়েটাকে দেখতে লাগলেন।
বকুলকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে যা জানা গেল তার সারমর্ম এই, সুযোগ পেলেই ও রনো আঙ্কলের ছাদের ঘরে চলে যেত। ঘটনার দিন সকালে ও একটা নতুন ওয়াটার বটল আঙ্কলকে দেখাতে গিয়েছিল। গিয়ে দ্যাখে, রণতোষবাবু সিলিং পাখা থেকে বিশ্রীভাবে ঝুলছেন। ও ভীষণ ভয় পেয়ে পালিয়ে চলে আসে মায়ের কাছে। মাকে ফিসফিস করে সব বলতেই মা ভয়ে কেঁদে ফ্যালে। তারপর ওকে চুপিচুপি একটা কাজ করতে বলে। কাজটা হল, রণতোষ দত্তর ঘর থেকে খুঁজে একটা কাঠের বাক্স নিয়ে আসা। বাক্সটা মায়ের। সবুজ রঙের ওপরে সাদা আলপনা দেওয়া। অনেকটা বাঁধানো বইয়ের মতো দেখতে। বাক্সের ভেতরে কী আছে বকুল জানে না। ও চুপিচুপি আবার চিলেকোঠার ঘরে ফিরে যায়। এদিক-ওদিক একটু নজর দিতেই দেখতে পায় মেঝেতে কাত হয়ে পড়ে থাকা একটা চেয়ারের পাশে বাক্সটা পড়ে আছে। সেটা বগলদাবা করে ও একছুটে পালিয়ে আসে ওর মায়ের কাছে। মাকে বাক্সটা দিতেই মা সেটা আঁকড়ে ধরে ভীষণ কাঁদতে থাকে। খানিক পরে মা চুপিচুপি ওপরে চলে যায়। একটু পরেই আবার ফিরে আসে। এসে বকুলকে বলে গোটা ব্যাপারটা সিক্রেট রাখতে।
কথার শেষ দিকটায় বকুল বারবার দম নিচ্ছিল, সামান্য হাঁফাচ্ছিল যেন। বক্তব্য শেষ করে এবার ও ওর প্রথম আবদারে ফিরে গেল ‘এবার একটা ম্যাজিক দেখিয়ে তার সিক্রেটটা শিখিয়ে দাও—।’
এসিজি পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা ছোট রুবিক কিউব বের করলেন। কিউবটার এক-একটা পিঠে নানারঙের রঙিন খোপ। অভ্যস্ত হাতে কিউবটাকে বারকয়েক মোচড় দিলেন তিনি। একটু পরেই দেখা গেল কিউবটার ছ’পিঠে তৈরি হয়ে গেছে সুন্দর রঙিন নকশা। সেটা বকুলকে দেখিয়ে এসিজি বললেন, ‘এটার নাম হল রুবিক কিউব। প্রমিস করছি, কাল তোমার জন্য এরকম একটা কিউব এনে দেব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা ছোট্ট কাজ করে দিতে হবে। মায়ের বাক্সটা তোমাকে এক্ষুনি লুকিয়ে নিয়ে আসতে হবে। ওটা দেখেই আমি তোমাকে আবার ফেরত দিয়ে দেব। ঠিক পারবে তো?’
বেণী দুলিয়ে ঘাড় হেলাল বকুল ‘হ্যাঁ, পারব—’
কথা শেষ হতে-না-হতেই ছাদের সিঁড়ির দিকে ছুট লাগাল বকুল।
ছুটে চলে যাওয়া মেয়েটিকে দেখতে-দেখতে অশোকচন্দ্র আনমনাভাবে মন্তব্য করলেন, ‘দেখা যাক বাক্স-রহস্য থেকে রণতোষবাবুর মৃত্যু-রহস্য ভেদ করা যায় কি না।’
বিকেলের আলো মলিন হয়ে এসেছে। আকাশে দু-একটা পায়রা। রাস্তা দিয়ে ছুটে-চলা গাড়ির শব্দ হালকাভাবে কানে আসছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রণতোষ দত্তর ঘরটা এখন যেন অনেকে বেশি অর্থময়। রুবিক কিউবটা পকেটে রেখে চোখ থেকে কার্বন ফ্রেমের চশমা খুলে নিলেন এসিজি। পাঞ্জাবির কোণ দিয়ে কাচ দুটো মুছলেন। তারপর চশমাটা ঠিকঠাক করে নাকের ওপরে বসালেন। এখন কি সবকিছু আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে?’
