ভাঙাচোরা আলো-আঁধারি অলিপথে পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন দু-জনে।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,
‘রঙ্গলালবাবু, খুনির দেখা পাওয়া খুব সহজ নয় বলে মনে হচ্ছে। আর-একদিন এসে অন্তরা দত্তর সঙ্গে কথা বলতে হবে।’
রঙ্গলালবাবু হেসে জিগ্যেস করলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের আইডিয়ার ওপরে বেস করে দু-লাইনের একটা ছোট্ট কবিতা শোনাব?’
এসিজি পালটা হেসে বললেন, ‘শোনান। আমি বারণ করলে কি আপনি ক্ষান্ত হবেন!’
গলাখাঁকারি দিয়ে রঙ্গলাল বললেন, ‘স্যার, আপনার কথার মানে অনেকটা এইরকম। সহজে খুনি ধরতে আমায় কহ যে/খুনি কখনও দেয় না ধরা সহজে।’
‘সাধু! সাধু!’ শান্তিনিকেতনী ঢঙে স্বভাব-কবিকে বাহবা দিলেন অশোকচন্দ্র।
জানলা দিয়ে বিকেলের আলো দেখা যাচ্ছিল। সেদিকে তাকিয়ে ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত ভাবছিলেন, এখনই যদি ঝুপ করে সন্ধে নেমে আসে তা হলে কেমন হয়। অথচ এখনও সন্ধে হতে অনেক দেরি।
রণতোষ দত্তর জীবনে অতর্কিতে সন্ধে নেমে এসেছে। সেই সন্ধের আঁধারে এসিজি পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছিলেন। অন্তরা দত্তের শেষ কথাটা তাঁকে ভাবিয়ে তুলছিল।
রঙ্গলাল গোস্বামীকে সঙ্গী করে বিকেল-বিকেল দত্তবাড়িতে চলে এসেছেন এসিজি। পরিতোষ দত্ত এখনও অফিস থেকে ফেরেননি। অন্তরার মেয়ে টুসি বোধহয় ভেতরে কোথাও রয়েছে। কলতলার দিক থেকে বাসন মাজার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল।
অন্তরা চা-বিস্কুট দিয়ে এসিজি ও রঙ্গলালকে আপ্যায়ন করলেন। তারপর সন্দিহান সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে ওঁদের সামনে বসলেন।
চা শেষ করা পর্যন্ত অশোকচন্দ্র মামুলি কথাবার্তা বলছিলেন। তারপর শেষ চুমুক শেষ হতেই অন্তরার কাছ থেকে সৌজন্যের অনুমতি নিয়ে একটা উইলস ফিলটার ধরালেন। রণতোষবাবুর কথা তুলে প্রথম প্রশ্ন করলেন অশোকচন্দ্র, ‘ওঁর সুইসাইডের ব্যাপারটা আপনি প্রথম জানতে পারেন?’
অন্তরা সহজ স্বরে সপ্রতিভ জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ। সকালবেলা চা দিতে গিয়েছিলাম। রোজ সকালে আমিই দাদাকে চা দিয়ে আসি। তো গিয়ে দেখি দরজা ভেজানো। দু-একবার ডাকাডাকি করে দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। আর তখনই সব দেখতে পেলাম—মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে যেন শিউরে উঠলেন অন্তরা। চাপা গলায় বললেন, ‘বীভৎস দৃশ্য!’
‘উনি মারা যাওয়াতে সবাই খুব শকড হয়েছেন। নীচের তলার জলধরবাবু, সুমিতা ওঁর কথা খুব বলছিলেন, খুব প্রশংসা করছিলেন।’
‘সে তো করবেই!’ বিরক্তভাবে উত্তর দিলেন অন্তরা, ‘ভাড়া না নিলে, বিনিপয়সায় পড়ালে লোকে প্রশংসা তো করবেই।’
এসিজি অবাক হলেন। সিগারেটে গভীর টান দিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘রণতোষবাবু বিনি পয়সায় কাকে পড়াতেন, বকুলকে?’
‘না, বকুলের মাকে—।’
খবরটা শুনে অশোকচন্দ্র যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। সুমিতাকে পড়াতেন রণতোষবাবু! কই, সুমিতা নিয়োগী তো এ-কথা তাঁকে বলেননি!
‘সুমিতাকে কী পড়াতেন?’
‘বাংলা। ওর নাকি বাংলা নিয়ে পড়াশোনার খুব আগ্রহ। সত্যি-মিথ্যে ও-ই জানে।’
বোঝা গেল, সুমিতার ছাত্রী হওয়াটা অন্তরা মোটেই পছন্দ করেননি। বিশেষ করে পুরোনো এক ছাত্রীর সঙ্গে আবেগতাড়িত সম্পর্কের বিড়ম্বনার পর।
‘সুমিতা কোথায় পড়তেন? একতলায় নিজেদের ঘরে, নাকি রণতোষবাবুর ঘরে?’
‘কখনও নীচে, কখনও চিলেকোঠার ঘরে—’ নিস্পৃহভাবে বললেন অন্তরা, ‘তবে দাদা খুব ভদ্র, সংযমী মানুষ ছিলেন।’
‘আপনারা ছাড়া ছাদের ঘরে আর কে-কে যাতায়াত করত? সুমিতা দেবী?’
‘হ্যাঁ—’ একটু থেমে অন্তরা আরও বললেন, ‘ওর মেয়েটাও যখন-তখন যেত। বকুলকে দাদা খুব ভালোবাসতেন। কথায়-কথায় নানান গিফট দিতেন। আসলে দাদার ভেতরে কোথায় যেন একটা অভাববোধ ছিল—।’
কিছুক্ষণ চুপ করে কী ভাবলেন এসিজি। তারপর অন্তরার চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘মিসেস দত্ত, দাদার ঘরে কখনও এমন কিছু আপনার চোখে পড়েছে যা আপনার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে?’
ঠোঁটে দাঁত চেপে কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন অন্তরা, তারপর বললেন, ‘না, সেরকম কিছু দেখিনি।’
‘আগের দিন আপনি বলছিলেন আপনার দাদা ইদানীং পাপ, শাস্তি, মৃত্যু—এইসব নিয়ে ভাবছিলেন। এসব উনি কেন ভাবছিলেন আন্দাজ করতে পারেন?’
‘জানি না। দাদা এমনিতে খুব নীতিবাগীশ মানুষ ছিলেন। পাপ করার লোক উনি ছিলেন না। তবু কেন ওসব ভাবছিলেন কে জানে!’
এসিজি প্রশ্ন করার মতো আর কিছু ভেবে পেলেন না।
রঙ্গলাল গোস্বামীকে ইশারা করে তিনি উঠে দাঁড়ালেন, অন্তরাকে বললেন, ‘চলি—।’
অন্তরা দত্ত উঠে দাঁড়ালেন। সামান্য উদ্বিগ্ন স্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘ঠিক করে বলুন তো, মিস্টার গুপ্ত, ব্যাপারটা কী—সুইসাইড, না মার্ডার?’
অশোকচন্দ্র সিগারেটে শেষ টান দিয়ে হাসলেন, বললেন, ‘খুন হোক আর আত্মহত্যা হোক, যে-মানুষ্টা চলে গেছে সে তো আর ফিরে আসবে না।’
অন্তরা বুঝতে পারলেন এসিজি ওঁর বলা কথা ওঁকেই ফেরত দিলেন। ওঁর মুখে সামান্য লালচে আভা ফুটে উঠল।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত আর রঙ্গলাল গোস্বামী বাইরের চাতালে বেরিয়ে এলেন। হাতের সিগারেটের টুকরোটা এককোণে রাখা আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিলেন এসিজি।
রঙ্গলাল গোস্বামী বললেন, ‘প্রশ্ন উত্তরের পালা শেষ হল, স্যার / এবারে বলুন সুইসাইড না মার্ডার।’
এসিজি বললেন, ‘এখন শুধু আর-একজনের সঙ্গে কথা বলা বাকি—।’
