একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুমিতা : ‘যার-যার বিচার তার-তার কাছে…’
সুমিতা নিয়োগীকে এখন আর মোটেই অসহায় বিধবা মনে হচ্ছিল না। ওর সৌন্দর্যের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের একটা আভা ছড়িয়ে পড়ছিল। মেয়েটিকে ক্রমশই ভালো লাগছিল এসিজির।
আর কিছু বলে ওঠার আগেই ঘরে এসে ঢুকল বকুল। ফরসা রং, একমাথা কোঁকড়া চুল, কটা চোখ—একেবারে মায়ের মতো হয়েছে।
বকুল ঘরে ঢুকেই মায়ের কাছে গিয়ে বায়নার সুরে বলল, ‘আমার পড়া হয়ে গেছে। এখন ওই ম্যাজিকটা আলমারি থেকে বের করে দাও—।’
এসিজি জিগ্যেস করলেন, ‘কী ম্যাজিক, মা-মণি?’
বকুল চটপট জবাব দিল, ‘দুটো প্যাঁচ খাওয়া পেরেকের ম্যাজিক।’
এসিজি হেসে বললেন, ‘বুঝেছি। ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে নাড়াচাড়া করে পেরেক দুটোকে আলাদা করতে হয়, তাই না?’
‘হ্যাঁ—’ মাকে ছেড়ে এসিজির দিকে দু-পা এগিয়ে এল বকুল। চোখ বড় করে জিগ্যেস করল, ‘তুমি কী করে জানলে?’
অশোকচন্দ্র হেসে বললেন, ‘আমি অনেক ম্যাজিক জানি। এখুনি তোমাকে একটা ম্যাজিক দেখাচ্ছি। তুমি আমাকে দু-গ্লাস জল এনে দাও।’
‘দু-গ্লাস জল কেন?’ অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে জানতে চাইল বকুল।
‘একগ্লাস খাব, আর-একগ্লাস জল দিয়ে ম্যাজিক দেখাব।’
‘আমি নিয়ে আসছি—’ বলে সুমিতা তাড়াতাড়ি ভেতরে চলে গেল জল নিয়ে আসতে।
দু-গ্লাস জল এসে পড়ল একটু পরেই। এসিজি একটা গ্লাস তুলে নিয়ে সেটার জল দ্বিতীয় গ্লাসে খানিকটা ঢেলে দিলেন। তাতে দ্বিতীয় গ্লাসটা কানায় কানায় ভরতি হল। তখন প্রথম গ্লাসের জল ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন তিনি। তারপর একটু দম নিয়ে সুমিতাকে বললেন, ‘একটা পুরোনো পোস্টকার্ড দিতে পারেন?’
সুমিতা একটা পোস্টকার্ড খুঁজে এনে দিল।
পোস্টকার্ডটা টইটম্বুর গ্লাসের ওপর চেপে বসিয়ে দিলেন এসিজি। তাতে গ্লাসের মুখটা ঢাকা পড়ে গেল। তখন পোস্টকার্ড সমেত জল ভরতি গ্লাসটাকে সাবধানে ধরে সেটাকে উলটে দিলেন। তারপর ধীরে-ধীরে নীচের হাতটা সরিয়ে নিলেন। পোস্টকার্ড ঢাকা দেওয়া গ্লাস-ভরতি জল দিব্যি স্থির হয়ে রইল।
এ-দৃশ্য দেখে বকুল খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল।
এসিজি গ্লাসটা আবার সাবধানে সোজা করে রেখে দিলেন টেবিলে।
বকুল এবার চলে এল এসিজির কাছে। আবদার করে বলল, ‘আমাকে এর সিক্রেটটা শিখিয়ে দাও—।’
এসিজি ওকে বুঝিয়ে বললেন, বাতাসের চাপ পোস্টকার্ডে চাপ দিয়ে একগ্লাস জলকে কীভাবে সহজে ধরে রাখতে পারে।
বকুল অবাক বিস্ময়ে বৃদ্ধের কথা শুনছিল।
ওকে বোঝানো শেষ করে অশোকচন্দ্র বললেন, ‘আমি আরও অনেক ম্যাজিক জানি। তোমাকে সেগুলোর সিক্রেট শিখিয়ে দেব পরে।’
বকুলের গাল টিপে আদর করে অশোকচন্দ্র উঠে পড়লেন। সুমিতাকে বললেন, ‘চলি, মিসেস নিয়োগী। আমাকে হেলপ করার জন্যে অনেক ধন্যবাদ।’
সুমিতা উঠে দাঁড়িয়েছিল। এসিজির কথায় ছোট্ট করে হেসে বলল, ‘আপনার সামান্য ক’টা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি—একে হেলপ বলে না।’
অশোকচন্দ্র কয়েক সেকেন্ড কী ভেবে বললেন, ‘আচ্ছা পরিতোষ দত্ত, অন্তরা দত্ত কেমন মানুষ বলুন তো—।’
সুমিতার মুখটা পালটে গেল। নিজেকে সামলে নিতে খানিকটা সময় নিল, তারপর চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘মানুষ? আচার-আচরণ দেখে তো মনে হয় না।’
বকুল শাড়ি ধরে ওকে বিরক্ত করছিল। সুমিতা আলতো ধমক দিয়ে মেয়েকে বলল, ‘ভেতরে যাও—।’
মেয়েটা একটা জলের গ্লাস আর ভিজে পোস্টকার্ড নিয়ে চলে গেল ভেতরে।
এসিজি একাগ্র ছাত্রের মতো সুমিতার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
সুমিতা বলল, ‘ভদ্রমহিলা তো প্রায়ই নোংরা ভাষায় চিৎকার করে ঝগড়া করেন। কখনও কাজের বউয়ের সঙ্গে, কখনও স্বামীর সঙ্গে, আর কখনও বা ভাসুরের সঙ্গেও ঝগড়া করতেন। অবশ্য এগুলোকে ঠিক ঝগড়া বলা যায় না, কারণ ব্যাপারগুলো সবসময়েই একতরফা হত। রণতোষবাবু এ নিয়ে আমার কাছে বারকয়েক আক্ষেপও করেছেন।’
‘পরিতোষবাবু স্ত্রীকে কখনও বারণ করতেন না?’
‘না, ওঁর পক্ষে বারণ করা সম্ভব নয়। সে-ক্ষমতা ওঁর নেই—।’
বিষণ্ণ হাসল সুমিতা : ‘ওঁদের সঙ্গে কথা বললেই আপনি সব বুঝতে
পারবেন।’ কী খেয়াল হতেই ও আরও বলল, ‘আপনি তো ওঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন—।’
‘হ্যাঁ, বলেছি…’ চিন্তিতভাবে জবাব দিলেন এসিজি, ‘আবারও বলব।’
রঙ্গলালবাবু অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিলেন কিছু একটা বলার জন্য। এখন সুযোগ পেয়ে বলে বসলেন, ‘রণতোষবাবু যদি সুইসাইড করে থাকেন তা হলে তার কারণ কিছু আন্দাজ করতে পারেন?’
সুমিতার মুখটা হঠাৎ পালটে গেল। মাথা নিচু করে চোখের কোণ টিপল কয়েকবার। যখন মুখ তুলল তখন ফরসা মুখ খানিকটা লালচে, থমথমে। একটু সময় নিয়ে ও বলল, ‘কী জানি, জানি না…’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আরও যোগ করল, ‘ওঁর কাছে যেটা যথেষ্ট কারণ বলে মনে হয়েছে সেটা হয়তো অন্য কারও কাছে কোনও কারণই নয়। সুইসাইডটা হয়তো সম্পূর্ণ অকারণে…।’
‘আর মার্ডার হলে?’ অশোকচন্দ্র জানতে চাইলেন।
‘তা হলেও একই কথা বলব। ওঁকে খুন করারও কোনও যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে না।’
একটু ভাবলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। তারপর বললেন, ‘রাত বাড়ছে। এবার চলি, মিসেস নিয়োগী। পরে আবার দেখা হবে।’
রঙ্গলাল গোস্বামী সুমিতাকে নমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, তা হলে এবার যাই। খুনির যেন দেখা পাই।’
