এসিজির কাছে রণতোষ দত্তর মুখটা একটু-একটু করে স্পষ্ট হচ্ছিল। তিনি আচমকা একটা অপ্রীতিকর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন বৃদ্ধের দিকে : ‘যদি শোনেন পরিতোষবাবু ভাড়াটে উচ্ছেদ করার জন্যে কেস করার তোড়জোড় শুরু করেছেন, তা হলে আপনার কেমন লাগবে?’
‘অবাক লাগবে না। এটাই তো নিয়ম। পারুলকে বলেছি। সুমিতাকেও আমার সন্দেহের কথা বলেছি। দিনদশেক আগে পাড়ার মাদার ডেয়ারির দোকানে খবরটা পেলাম। যাকগে, যা হয় হবে…।’
এসিজি ভাগ্যনির্ভর বৃদ্ধকে দেখছিলেন। দেবতা, ধূপ আর ভাগ্য কখনও দুর্ঘটনাকে রুখতে পারে না।
রঙ্গলাল গোস্বামী বোধহয় অধৈর্য হয়ে পড়ছিলেন। কারণ তিনি বারবার ঘড়ি দেখছিলেন। একফাঁকে এসিজির কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘এনাকে নিয়ে অনেক হল, এবার ক্ষান্ত দিন/তেনাকে ডেকে করুন শুরু, জবানবন্দী নিন।’
অশোকচন্দ্র হাসি চেপে জলধরবাবুকে লক্ষ করে বললেন, ‘যদি আপনি অনুমতি দেন তা হলে আপনার বউমা সুমিতাদেবীর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’
জলধরবাবু একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎই যেন চমকে উঠে বললেন, ‘ওহ, হ্যাঁ—হ্যাঁ। আমি ওকে ডেকে দিচ্ছি—।’
উঠে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ট্রাঙ্কের ওপরে রাখা একটা তোবড়ানো সস্তা অ্যাশট্রে তুলে নিয়ে এলেন বৃদ্ধ। সেটা এসিজির সামনে টেবিলে নামিয়ে রেখে বিড়বিড় করে বললেন, ‘খোকা খুব সিগারেট খেত…।’
অভিনয় শেষ করে মঞ্চ ছেড়ে বৃদ্ধ অভিনেতা যেমন সহজ ছন্দে উইংসের দিকে এগিয়ে যায়, কথাটা বলে ঠিক সেইভাবে নিষ্ক্রান্ত হলেন জলধর নিয়োগী।
পাশের কোনও বাড়িতে সময়ের ঘণ্টা বাজছিল। অশোকচন্দ্র ঘণ্টা গুনলেন আটটা। তারপর সিগারেটের টুকরোটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিতেই সুমিতা এসে ঘরে ঢুকল।
পরনে ওর আটপৌরে ছাপা শাড়ি। কিন্তু সেও যেন কালি লেপে সূর্যদেবতাকে মলিন করার মিথ্যে চেষ্টা। সুমিতার রূপ উষ্ণ তরঙ্গের মতো ঘরের পরিমণ্ডলে জায়গা করে নিল। এ যেন তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের অমোঘ ভ্রমণ। অশোকচন্দ্রের মনে পড়ে গেল জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের কথা।
‘আমাকে ডেকেছেন?’
আড়চোখে রঙ্গলালকে দেখলেন বৃদ্ধ হুনুর। স্বভাবকবি মানুষটি স্তব্ধ বিস্ময়ে অপলকে সুমিতাকে দেখছেন।
সুমিতা বিছানার এককোণে সঙ্কুচিতভাবে বসল।
অশোকচন্দ্র ইতস্তত করে আলতো স্বরে বললেন, ‘সবই তো জানেন। আপনাকে বিরক্ত করতে খুবই খারাপ লাগছে। রণতোষবাবুর ব্যাপারেই কয়েকটা কথা বলব…।’
‘বলুন—।’
‘আপনি ওঁকে কীরকম চিনতেন?’
‘ভালো করেই চিনতাম।’ সঙ্কোচহীন গলায় উত্তর দিল সুমিতা, ‘ওরকম ভালোমানুষ ক’জন হয়! উনি চলে যাওয়াতে আমাদের সবার খুব ক্ষতি হয়ে গেল।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থামল সুমিতা। তারপর ভুরু কুঁচকে এসিজির দিকে তাকিয়ে হঠাৎই প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা, ওঁর সুইসাইড নিয়ে এতদিন পর আবার খোঁজ করছেন কেন?’
অশোকচন্দ্র কী যেন ভাবলেন। তারপর ঠান্ডা গলায় জবাব দিলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে ব্যাপারটা সুইসাইড নয়, মার্ডার।’
সুমিতার ফরসা মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চোখ চঞ্চল হয়ে ওকে উদভ্রান্তের মতো দেখাল।
‘খুন! অসম্ভব! রণতোষবাবু খুন হতেই পারেন না। ওঁর কোনও শত্রু ছিল না। দেবতার মতো মানুষ ছিলেন। ওঁকে প্রত্যেকে ভালোবাসত—।’
শেষ শব্দটা এসিজির কানে বাজল। দেবতার প্রতি মানুষের ভালোবাসা! সুমিতাকে সামান্য খোঁচা দেওয়ার জন্যই তিনি বললেন, ‘ভালোবাসলে কি আর খুন করা যায় না!’
সুমিতা মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর বলল, ‘হয়তো যায়। আপনি খুন-জখম-রাহাজানি অনেক দেখেছেন। আপনি ভালো জানবেন। তবে রণতোষবাবুর বেলায় এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’
সুমিতাকে একটু সহজ হওয়ার সময় দিয়ে এসিজি প্রশ্ন করলেন, ‘মাঝে-মাঝে বাড়িভাড়া দিতে যাওয়া ছাড়া আপনার সঙ্গে ওঁর আর কোনও কথা হত না?’
‘কেন হবে না! আমার—আমার হাজব্যান্ড মারা যাওয়ার পর উনি সব ব্যাপারে হেলপ করেছেন। বাবা কিংবা আমি ওসব পেরে উঠতাম না। সব জায়গায় অ্যাপ্লিকেশন লিখে দেওয়া, ফর্ম ফিল-আপ করা, দৌড়োদৌড়ি করা—সব রণতোষবাবু করেছেন। কোনওরকম ধকল আমাদের টের পেতে দেননি—’
‘একটা কথা আপনাকে জিগ্যেস করছি। কিন্তু একটা রিকোয়েস্ট আছে—এটা নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করবেন না…।’
সুমিতা মুখে একবার হাত বুলিয়ে নিল। তারপর বলল, ‘আলোচনা করার আমার আমার কে-ইবা আছে! আপনি নিশ্চিন্তে বলতে পারেন।’
‘শুনেছি বছর-চারেক আগে রণতোষবাবুর সঙ্গে তাঁর এক ছাত্রীর একটা অ্যাফেয়ার হয়েছিল। ব্যাপারটা নিয়ে একটু-আধটু স্ক্যান্ডালও হয়—’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর এসিজি বললেন, ‘এ ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন?’
সুমিতা মুখ নিচু করল। ওর চোয়াল শক্ত হল। তারপর শান্ত গলায় বলল, ‘না, জানি না। তবে তার সঙ্গে রণতোষবাবুর সুইসাইডের সম্পর্ক কী?’
‘না, সেরকম কিছু নয়। আমার মনে হচ্ছিল উনি বোধহয় খুব আবেগপ্রবণ মানুষ।’
‘আবেগপ্রবণ হওয়াটা কি অপরাধ?’ এসিজির চোখে চোখ রেখে সরাসরি প্রশ্ন করল সুমিতা।
‘না, অপরাধ কেন হবে?’ হাসলেন অশোকচন্দ্র।
‘আসলে গন্ডগোলটা কোথায় জানেন?’ সপ্রতিভভাবে বলে উঠল সুমিতা, ‘কোনও একটা অ্যাফেয়ার হলেই পুরুষদের দোষটা সকলের আগে চোখে পড়ে। এ-ব্যাপারেও মনে হয়, রণতোষবাবুকে অনেকে দোষী ভাবছে, আর ছাত্রীটিকে নির্দোষ। কে জানে!’
