রঙ্গলাল গোস্বামী ছোট্ট করে মন্তব্য করলেন, ‘একে তো যুবতী তায় এক্সট্রিম সুন্দরী/তাঁকে ঘিরে জমে উঠবে স্যারের হুনুরি।’
কথায়-কথায় জানা গেল, জলধর নিয়োগী দশ বছর হল চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। কিন্তু মানুষটিকে দেখে তা বোঝায় উপায় নেই। লম্বা, শক্ত কাঠামো। মাথায় টাক পড়েছে। তাকে ঘিরে কাঁচাপাকা চুল। দু-কানেও খানিকটা করে চুল। চোখে কালো ফ্রেমের সাধারণ চশমা। তবে চামড়ার ভাঁজ খুঁটিয়ে দেখলে বয়সের আঁচ করা যায়।
এসিজি জলধর নিয়োগীর সঙ্গে কথা বলছিলেন, আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন। তাঁর ডানপাশে বসা রঙ্গলালবাবু ঘরের ছাদের দিকে মুখ তুলে আনমনাভাবে কিছু একটা আওড়াচ্ছিলেন। তাঁর চায়ের কাপ অনেকক্ষণ আগেই শেষ।
কথাবার্তার সময় সুমিতা দু-একবার ঘরে ঢুকেছিল। কৌতূহলের চোখে তাকিয়ে ছিল অশোকচন্দ্রের দিকে। তারপর আবার চলে গেছে ঘর থেকে। ওর বছর দশেকের মেয়ে বকুল একবার চলে এসেছিল ‘দাদুর’ কাছে। সুমিতা ‘পড়া শেষ হয়নি এখনও—পড়তে চলো’ বলে স্নেহের ধমক দিয়ে ডেকে নিয়ে গেছে।
ঘরটা ছোট মাপের। চেহারায় নিম্ন মধ্যবিত্ত, মলিন। একপাশে ছাপা চাদরে ঢাকা বিছানা। তার পাশে ট্রাঙ্ক, আলনা, ঠাকুরের আসন। সেখান থেকেই বোধহয় হালকা ধূপের গন্ধ ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। জলধরবাবু বিছানায় বসেছেন। অশোকচন্দ্র আর রঙ্গলাল নড়বড়ে চেয়ারে। সামনে যথেষ্ট মেরামত করা একটা টেবিল।
জলধরবাবুর সঙ্গে সহজ-সরল গল্প জুড়ে দিয়েছিলেন অশোকচন্দ্র। সেই গল্প করতে-করতেই কীভাবে যেন অধ্যাপক রণতোষ দত্তর কথা এসে পড়েছিল।
‘দারুণ মানুষ ছিলেন। চাকরিজীবনে বহু লোক চরিয়েছি। লোক চিনি। অন্তরটা বড় পরিষ্কার ছিল।’ থেমে-থেমে স্মৃতিচারণের সুরে কথাগুলো বললেন জলধর নিয়োগী। ওঁর চোখ সামান্য ঘোলাটে লাগছিল। কথা থামিয়ে পরনের লুঙ্গি আর হাফহাতা সাদা ফতুয়া টেনেটুনে ঠিকঠাক করলেন। তারপর এসিজির দিকে তাকালেন।
স্থির চোখে মিনিটখানেক তাকিয়ে থেকে জলধরবাবু প্রশ্ন করলেন, ‘এইরকম একটা মানুষ—হঠাৎ কেন সুইসাইড করল বলুন তো?’
এসিজি হাসলেন। মাথার পিছনে হাত চালিয়ে সাদা চুলোর গোছায় বারদুয়েক টান মেরে বললেন, ‘সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তো আপনাকে বিরক্ত করতে এসেছি—।’
‘বিরক্ত হওয়ার কী আছে।’ বৃদ্ধ মানুষটি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ‘কেউ সুইসাইড করলে তার তো একটা কারণ নিশ্চয়ই থাকবে। যদি না অবশ্য অন্য কিছু হয়। আপনার কী মনে হচ্ছে?’
সময় নিতে একটা সিগারেট ধরালেন এসিজি। তারপ লাইটার পকেটে রেখে ঠোঁটে সিগারেট নিয়েই বললেন, ‘মনে হওয়ার ব্যাপারটা এখনও ঝাপসা, মিস্টার নিয়োগী—।’
কিন্তু সতিই কি ঝাপসা? রণতোষ দত্ত মানুষটা কি একটু-একটু করে পরিষ্কার হচ্ছে না? ছবিটা যখন পুরোপুরি স্পষ্ট হবে তখন বোঝা যাবে মানুষটা কেন মারা গেল, কীভাবে মারা গেল। সুইসাইড না মার্ডার?
গত দু-দিন ধরে রঘুপতি যাদবের দেওয়া কাগজপত্র খুঁটিয়ে দেখেছেন এসিজি। প্রতিটি কাগজের প্রতিটি অক্ষর মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন। তারপরই মনে হয়েছে, বছর পঞ্চান্নর এক সুদর্শন অধ্যাপককে তিনি দেখতে পাচ্ছেন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। চোখে চশমা। অকৃতদার, কর্তব্যপরায়ণ, ভালোমানুষ। কিন্তু মানুষটার মুখটা এখনও অস্পষ্ট, আর চোখ দুটো ঝাপসা।
এসিজি রঘুপতিকে বলেছিলেন, তিনি বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চান। রঘুপতি তাতে হেসে বলেছে, স্যার যত খুশি কথা বলুন, ওর আপত্তি নেই। ওর শুধু অঙ্কের উত্তর চাই।
অতএব তৃতীয় দিন সন্ধেবেলা অশোকচন্দ্র এসে হাজির হয়েছেন লালাবাগানের এই জীর্ণ বাড়িতে। সঙ্গে রঙ্গলাল গোস্বামী। রঙ্গলালবাবুর শখ হয়েছে এসিজির মতো ‘প্রতিভাবান’ গোয়েন্দার কার্যকলাপ অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মতো পর্যবেক্ষণ করবেন। তাই পর্যবেক্ষণের এই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি।
কিছুক্ষণ একমনে সিগারেটে টান দিলেন এসিজি। তারপর হঠাৎই বৃদ্ধ মানুষটিকে প্রশ্ন করলেন, ‘রণতোষবাবুর ভাই পরিতোষবাবু কীরকম লোক?’
বড় মাপের একটা নিশ্বাস ফেললেন জলধর নিয়োগী, তারপর বললেন, ‘এমনিতে বোধহয় তেমন খারাপ লোক নন। দোষের মধ্যে বউয়ের কথায় চলেন। দাদার সঙ্গে মাঝে-মধ্যে কথা কাটাকাটি হত।’
‘কী নিয়ে কথা কাটাকাটি হত?’ শান্ত গলায় জিগ্যেস করলেন অশোকচন্দ্র।
ঠোঁট ওলটালেন জলধর নিয়োগী : ‘ঠিক কী নিয়ে তা জানি না। তবে কথাবার্তার মধ্যে ব্যাঙ্ক, টাকাপয়সা, লোন—এসব শুনতাম।’
‘আপনাদের বাড়িভাড়ার টাকা কে নিত?’
‘প্রথম-প্রথম আমিই দিয়ে আসতাম। রণতোষবাবুর কাছে। বছর দশেক হল আমি গেঁটে বাতে ভুগি। তাই পরের দিকে খোকা—মানে, শশধর দিয়ে আসত—’ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বৃদ্ধের বুক ঠেলে : ‘ও—ইয়ে—চলে যাওয়ার পর থেকে বউমা—মানে, সুমিতা দিয়ে আসে।’
‘কাকে? রণতোষবাবুকে?’
‘কখনও-কখনও বড়ভাইকে দিয়ে আসত। কখনও ছোটভাইকে। কখনও বা ছোটভাইয়ের বউকে—।’
‘বাড়িওয়ালা হিসেবে এঁরা কেমন?’
ফতুয়ার ভেতরে হাত চালিয়ে গায়ে হাত ঘষলেন জলধর, বললেন, ‘রণতোষবাবু তো দারুণ মানুষ ছিলেন। খোকা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের জন্যে কী না করেছেন! খোকার অফিসে দৌড়োদৌড়ি করা, ই এস আই অফিসে যাওয়া, এল আই সি, প্রভিডেন্ট ফান্ড—সব ব্যাপারে আমাদের হেল্প করেছেন। সেইজন্যেই তো সংসারটা ভেসে যায়নি। তা ছাড়া, খোকা মারা যাওয়ার পর বাড়িভাড়া সাড়ে চারশো থেকে তিনশো করে দিয়েছিলেন। আজকের যুগে এরকম ভাবা যায়?’
