রণতোষ দত্তর ব্যাপারটা যদি সত্যিই খুন হয় তা হলে কার-কার উদ্দেশ্য এবং সুযোগ থাকতে পারে সেটাই এসিজি মনে-মনে খতিয়ে দেখছিলেন। কিন্তু বারবারই তাঁর হিসেব হোঁচট খাচ্ছিল।
নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে তাতে গভীর টান দিলেন অশোকচন্দ্র। তাঁর মাথা—যাকে তিনি ‘থিঙ্কিং মেশিন’ বলেন—কি বিগড়ে গেল! সুইসাইড, না মার্ডার? খুন, না আত্মহত্যা?
হাতড়াতে-হাতড়াতে হঠাৎই কতকগুলো কাগজ খুঁজে পেলেন এসিজি। প্রথম কাগজটার মাথায় শিরোনাম লেখা : পাপ ও মৃত্যু।
তারপর পাতার পর পাতা শুধু বিভিন্ন লেখা থেকে উদ্ধৃতি টোকা রয়েছে। বিখ্যাত-বিখ্যাত মানুষের মৃত্যুর বিষয়ে মন্তব্য—ছোট-বড়, ইংরেজি-বাংলা নানারকম। তারই মধ্যে জন মিলটনের লেখা একটা ইংরেজি লাইন দেখতে পেলেন এসিজি :
‘Death is the golden key that opens the palace of eternity.’
তার নীচে বাংলা তর্জমাও চোখে পড়ল ‘মৃত্যু হল সোনার চাবি—যা দিয়ে অনন্তের প্রাসাদের দরজা খুলে যায়।’
প্রায় প্রতি পৃষ্ঠাতেই রণতোষবাবুর হতে লেখা বেশ কিছু মন্তব্য এসিজি লক্ষ করলেন। একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় বড়-বড় হরফে লেখা : ‘মৃত্যু যদি স্বর্গ হয়, জীবন তা হলে নরক। আমি মানুষ বলেই আমার অন্তরে পাপ আছে।’
পৃষ্ঠাগুলো প্রথম থেকে পরপর দেখছিলেন অশোকচন্দ্র। সাধারণ রুলটানা দিস্তে কাগজে লেখা। প্রত্যেক পাতায় পৃষ্ঠার সংখ্যা বসানো।
সুইসাইড নোটটা যে একই ধরনের কাগজে লেখা সেটা এসিজির বেশ মনে ছিল। হঠাৎই একটা ব্যাপার লক্ষ করে তিনি চমকে উঠলেন। পাতাগুলোর মধ্যে দু-নম্বর পৃষ্ঠাটা নেই!
সাদা চুলের গোছায় আলতো করে টান মারলেন এসিজি। তাঁর থিঙ্কিং মেশিনের চাকা বনবন করে ঘুরতে শুরু করল।
মৃত্যু সম্পর্কে মন্তব্য। রুলটানা কাগজ। বলপয়েন্ট পেন। সুইসাইড নোট। পাপ ও মৃত্যু।
রণতোষ দত্ত কি কোনও কারণে পাপবোধে কাবু হয়ে পড়েছিলেন? সেইজন্যেই পাপ ও মৃত্যু নিয়ে এতসব কথা ভাবছিলেন? নাকি তিনি নেহাতই পড়াশোনা বা গবেষণার তাগিদে মৃত্যু সম্পর্কে নানারকম মন্তব্য সংগ্রহ করছিলেন?
আনমনাভাবে সিগারেট টানতে-টানতে চেয়ারটার কাছে চলে এলেন বৃদ্ধ হুনুর। বিড়বিড় করে বললেন, ‘মৃত্যু যদি স্বর্গ হয়, জীবন তা হলে নরক…’ তারপর চেয়ারে বসে পড়লেন।
মৃত্যু সকলের অপছন্দের, অথচ মৃত্যু অনিবার্য। তাই মৃত্যুকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য কতরকম মহিমাই না তার ওপরে আরোপ করেছেন দার্শনিক ও সাহিত্যিকরা! মৃত্যু হল সোনার চাবি! মৃত্যু হল স্বর্গ!
এসিজি মাথা নাড়লেন। না, মৃত্যু অতি জঘন্য, মৃত্যু অত্যন্ত কুৎসিত। বিশেষ করে অস্বাভাবিক মৃত্যু।
মাথা তুলে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকালেন এসিজি। তিনি যেন স্পষ্ট দেখতে পেলেন, রণতোষ দত্তর কঠোর সুপুরুষ শরীরটা সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে। কোন এক অলৌকিক বাতাসে শরীরটা সামান্য দুলছে। তাঁর পায়ের চেটো অল্পের জন্য এসিজিকে স্পর্শ করছে না।
দরজায় শব্দ হতেই ঘোর ভাঙল এসিজির।
দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন পরিতোষ দত্ত। তাঁর চোখেমুখে অপ্রস্তুত বিব্রত ভাব। কিন্তু তার সঙ্গে সামান্য কৌতূহলও যে মিশে আছে, সেটা এসিজির নজর এড়াল না।
ঘরের চারপাশে ঝটিতি একপ্রস্থ নজর চালিয়ে নিয়ে পরিতোষ বললেন, ‘ভাবলাম… একবার… ইয়ে… দাদার ঘরটা ঘুরে আসি। আপনাদের ইনভেস্টিগেশানে…ইয়ে…ডিসটার্ব করলাম না তো?’
পরিতোষ দত্তর আচমকা হাজির হওয়াটা এসিজি তেমন পছন্দ করেননি। হাতের সিগারেটে একটা ছোট্ট টান দিয়ে পরিতোষবাবুর দিকে সরাসরি না তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ভাড়াটের সঙ্গে আপনাদের কেস চলছে?’
পরিতোষ দত্ত স্পষ্ট চমকে উঠলেন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আমতা-আমতা করলেন, কোনও জবাব খুঁজে পেলেন না। তারপর একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘না, কেস ঠিক নয়…সবে উকিলের সঙ্গে একটু কথা-টথা বলেছি। আসলে আমাদের ঘরগুলো ভীষণ ছোট-ছোট। তা ছাড়া, অন্তরা…ইয়ে…আমার ওয়াইফ বলছিল একতলাটায় একটা সেলাইয়ের স্কুল খুলবে। ওর সেলাইয়ের হাত খুব ভালো…।’
এসিজি আপনমনেই হেসে ফেললেন। অঙ্কটা যে কত সহজ এবার স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
পরিতোষকে লক্ষ করে তিনি বললেন, ‘আপনি যান, আপনার ওয়াইফকে গিয়ে বলুন, আমাদের কাজ হয়ে গেছে। এক্ষুনি আমরা নীচে নামছি।’
ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে পরিতোষ চলে গেলেন।
এসিজি এবার রঘুপতিকে লক্ষ করে প্রশ্ন করলেন, ‘কিছু আন্দাজ করতে পারলে, রঘুপতি?’
রঘুপতি যাদবের কপালে ভাঁজ পড়েছিল। বোধহয় ও কিছু একটা ভাবছিল। অশোকচন্দ্রের প্রশ্নে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল : ‘কী, স্যার?’
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন বৃদ্ধ হুনুর। হাতের ছোট হয়ে আসা সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে চলে গেলেন টেবিলের কাছে। সিগারেটের টুকরোটা গুঁজে দিলেন অ্যাশট্রেতে। তারপর হেসে বললেন, ‘আমাদের তদন্ত কেমন চলছে সেটা দেখার জন্যে অন্তরা দত্ত বোধহয় স্বামীকে পাঠিয়েছিলেন। আর দাদা মারা যাওয়ার পর পরিতোষবাবু বাড়ির মালিক হওয়ামাত্রই ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করার জন্যে কেস করার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন। সেটা কার পরামর্শে তা তো আন্দাজ করতেই পারছ—।’
‘সব বাড়িওয়ালাই তো টেনান্টের এগেইনস্টে কেস করে—’ রঘুপতি সাদামাঠা গলায় বলল।
এসিজি বিড়বিড় করে বললেন, ‘সেরকম হলে তো প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল ছিল। কিন্ত সুমিতা নিয়োগীকে দেখার পর আমার মনে হয়েছে ব্যাপারটা বোধহয় ততটা প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল নয়—।’
