অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর এসিজি জিগ্যেস করলেন, ‘রণতোষবাবুর সঙ্গে কারও কোনও প্রেম—মানে, অ্যাফেয়ার ছিল?’
‘এর সঙ্গে সুইসাইডের সম্পর্ক কী?’ হঠাৎ যেন ভয় পেয়ে গিয়েই পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন পরিতোষ। তারপর চকিতে একবার তাকালেন অন্তরার দিকে।
অন্তরা চোখ নামিয়ে ফেলেছিলেন।
রঘুপতি অধৈর্য হয়ে বলল, ‘ইনভেস্টিগেশান আপ কর রহে হ্যায় ইয়া হম! স্যার যা জানতে চাইছেন তার সহি জবাব দিন—।’
রঙ্গলাল গোস্বামী কপালে ভাঁজ ফেলে সবাইকে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। ওঁর মুখের গোয়েন্দা-গোয়েন্দা ভাবটা এখনও যায়নি।
একটু ইতস্তত করে অন্তরা দত্ত বললেন, ‘দাদার একটা—ইয়ে ব্যাপার ছিল। এটা প্লিজ পাঁচকান করবেন না—ওঁর সুনাম নষ্ট হবে।’ কিছুক্ষণ সময় নিলেন অন্তরা। তারপর : ‘বছরচারেক আগে দাদার সঙ্গে ওঁর এক ছাত্রীর একটা অ্যাফেয়ার হয়েছিল। ছাত্রীটি ম্যারেড ছিল—তাই একটু-একটু স্ক্যান্ডালও হয়েছিল। মেয়েটি পরে কলকাতার পাট চুকিয়ে ব্যাঙ্গালোরে চলে যায়। তখন দাদা খুব শকড হয়েছিলেন—ডিপ্রেশানে ভুগেছিলেন। তারপর ধীরে-ধীরে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়…।’
এসিজি স্বামী-স্ত্রীকে লক্ষ করছিলেন।
কখনও কোনও শক পেলে তার জন্য চারবছর পর কেউ সুইসাইড করে না। তা হলে কি রঘুপতির ‘মার্ডার’ থিয়োরিটাই সত্যি!
এরপর আরও কিছুক্ষণ ওঁদের সঙ্গে কথা বলার পর এসিজি বললেন, ‘রঘুপতি, চলো, এবার আসল জায়গায় যাওয়া যাক। রণতোষবাবুর ঘরটা আমি ভালো করে একবার দেখতে চাই।’
দত্ত দম্পত্তির অনুমতি নিয়ে ওঁরা তিনজনে ছাদের দিকে রওনা হলেন।
অগোছালো বই আর কাগজপত্রের স্তূপের কথা বাদ দিলে বলতে হয় ঘরটা বেশ পরিপাটি করে সাজানো।
ছাদের দক্ষিণ কোণ ঘেঁষে ঘরটা দাঁড়িয়ে। ছাদে উঠে কোনাকুনি চলে যেতে হয় ছাদের অপর প্রান্তে। সেখানেই কোণঠাসা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে অকুস্থল। একুশ দিন আগে এখানেই ঘটে গেছে দুঃখের ঘটনা।
ঘরের সিলিং বেশ নিচু। সেখান থেকেই ঝুলছে চকোলেট রঙের সিলিং ফ্যান। ঘরের বাঁ-দিক ঘেঁষে মামুলি বিছানা। আর ডানদিকে লেখাপড়ার টেবিল আর একটা চেয়ার। ঘরের দু-দেওয়ালে ছোট মাপের একজোড়া করে জানলা।
বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকায় ঘরে কেমন একটা গুমোট ভাব ছিল। তা ছাড়া সর্বত্র ধুলো ছড়িয়ে আছে। রঘুপতি নাক সামান্য কুঁচকে টেবিলের দিকের জানলা দুটো খুলে দিল।
রঙ্গলালবাবু আলতো গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘এসিজি স্যার, আমি কি বিছানায় আসন গ্রহণ করতে পারি?’
এসিজি ঘরটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। রঙ্গলালের প্রশ্নে সামান্য চমকে উঠে বললেন, হ্যাঁ, পারেন—এবং ওখানেই বসে থাকবেন, নইলে আমাদের কাজের অসুবিধা হবে। রঘুপতির দিকে তাকিয়ে : ‘ওটাই সেই চেয়ার?’
‘হ্যাঁ, গুপ্তাসাব—ওয়ান অ্যান্ড ওনলি চেয়ার।’
এ-কথা শুনে বৃদ্ধ হুনুর তৎপরভাবে চলে গেলেন চেয়ারটার কাছে। ওটা তুলে নিয়ে এসে রাখলেন সিলিং ফ্যানের ঠিক নীচে। তারপর জ্বলন্ত সিগারেট হাতেই উঠে পড়লেন চেয়ারের ওপরে।
মাথা তুলে সিলিং ফ্যানটাকে একবার দেখলেন এসিজি, তারপর হাত বাড়ালেন তার দিকে।
এসিজির হাত ফ্যানে পৌঁছে গেল, কিন্তু তার ডাউন রড পর্যন্ত পৌঁছল না—খানিকটা ফাঁক থেকে গেল।
রঘুপতি বলল, ‘রণতোষ দত্ত প্রায় আপনার মতোই লম্বা ছিলেন—পাঁচ-আট।’
ঘরের একমাত্র পাখা বন্ধ থাকায় ওঁরা তিনজনেই দরদর করে ঘামছিলেন। রঙ্গলালবাবু ডানহাতের চেটো নেড়ে নিজেকে বাতাস করার চেষ্টা করছিলেন।
এসিজি চেয়ার থেকে নেমে পড়ে রঘুপতিকে বললেন, ‘পাখাটা চালিয়ে দাও—।’
সিলিং ফ্যান ঘুরতে শুরু করল। অশোকচন্দ্র তার নীচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মাথার ভেতরে নানা কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর তাঁর নজর হেঁটে বেড়াচ্ছিল ঘরের সর্বত্র।
চারিদিকে শুধু বই আর বই। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাতা এবং কাগজপত্র। ঘরের একদিকের দেওয়ালে একটা বাংলা ও একটা ইংরেজি ক্যালেন্ডার। একটা খাটো টুলের ওপরে বসানো চোদ্দো ইঞ্চি সাদা-কালো টিভি। তার পাশেই মেঝেতে সাদা রঙের জলের জগ।
ঘরের ডানদিকের দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে একটা মাঝারি মাপের আয়না। তার নীচের তাকে চিরুনি, ক্রিম, পাউডার আর ওষুধপত্র। তার পাশে দেওয়ালের হুক থেকে ঝুলছে বেশ কয়েকটা ধুতি-পাঞ্জাবি-গেঞ্জি-লুঙ্গি।
অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে এসিজি হাতের সিগারেট শেষ করলেন। তারপর আনমনাভাবে এগিয়ে গেলেন টেবিলের কাছে। টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে সিগারেটের টুকরোটা গুঁজে দিলেন।
মাথার চুলের গোছায় কয়েকবার টান মেরে বৃদ্ধ হুনুর এবার বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করলেন।
তারই মাঝে রঘুপতিকে জিগ্যেস করলেন, ‘ওঁর কোনও ডায়েরি-টায়েরি পাওয়া যায়নি?’
‘না—।’ নির্লিপ্ত গলার জবার দিল রঘুপতি।
রণতোষ দত্ত মানুষটাকে কল্পনা করার চেষ্টা করছিলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। রঘুপতির ফাইলে অধ্যাপক দত্তের ছবি দেখেছেন তিনি। নীচের বসবার ঘরে তাঁর দেওয়ালে-টাঙানো ফটোও দেখেছেন—ফটোয় ফুলের মালা দেওয়া। এখন ফুলের মালাটাকে গলার ফাঁস বলে মনে হচ্ছিল।
গাড়িতে করে এখানে আসার পথে রঘুপতির দেওয়া ধারাবিবরণী এসিজির মনে পড়ছিল।
ঘটনার দিন সকালে রণতোষবাবুর চা দিতে গিয়ে অন্তরা দত্ত মৃতদেহ আবিষ্কার করেন। তখন প্রায় আটটা বাজে। তিনি ছুটে এসে স্বামীকে দুর্ঘটনার কথা জানাতেই ব্যাপারটা রাষ্ট্র হয়। পরিতোষবাবু সঙ্গে-সঙ্গে মানিকতলা থানায় ফোন করে খবর দেন। ওঁদের এই বিপদের সময় একতলায় ভাড়াটেরাও পাশে এসে দাঁড়ান। বিশেষ করে সুমিতা তো পরিবারের একজন হয়ে প্রতিটি কাজে অন্তরাকে সাহায্য করেছেন।
