রঘুপতি যাদব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর চোয়ালের রেখা দেখে কিছুটা বিপদ আঁচ করেছিলেন অশোকচন্দ্র। তাঁর অনুমান মিথ্যে হল না।
পরিতোষ দত্তর চোখে সরাসরি তাকিয়ে রঘুপতি বলল, ‘আপনি আজ অফিসে যাচ্ছেন না, পরিতোষবাবু। আর আপনার বড়া ভাই সুইসাইড করেননি—মে বি ইট ওয়াজ মার্ডার।’
পরিতোষ দত্তর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল পলকে। আর তখনই দেখা গেল, দরজার পরদার পাশটিতে কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছেন অন্তরা দত্ত। ওঁর মুখেও এখন রক্তের অভাব।’
‘মার্ডার!’ পরিতোষবাবু ভীষণ চমকে গেলেন। হতবুদ্ধিভাবে তিনজনের দিকে পালা করে দেখলেন : ‘কেন, আপনারাই তো বললেন, ব্যাপারটা প্লেন সুইসাইড!’ একটু থেমে ইতস্তত করে তারপর : ‘তা ছাড়া, আমরা তো জানি, দাদা বেশ ক’দিন ধরে ডিপ্রেশানে ভুগছিল।’
‘আপনি এত এক্সাইটেড হয়ে পড়ছেন কেন জানি না, মিস্টার দত্ত—’ শক্ত গলায় বলল রঘুপতি, ‘ইনভেস্টিগেশান করার সময় আমাদের যা-যা মনে হয়েছে বলেছি। লেকিন কে আপনাকে বলল যে, ইনভেস্টিগেশান খতম হয়েছে!’ পরিতোষ দত্তর হাত ধরে একটা চেয়ারের দিকে এগিয়ে দিল রঘুপতি ‘আইয়ে, বয়েঠ যাইয়ে। আমার স্যার আপনার সঙ্গে থোড়াবহত বাতচিত করবেন।’
স্কুল ছুটির পরে জোর করে আটকে রাখা ছাত্রের মতো গোমড়া মুখ করে পরিতোষ দত্ত একটা চেয়ারে বসলেন। সন্দিহান চোখে তাকিয়ে রইলেন শুভ্রকেশ হুনুরের দিকে।
অশোকচন্দ্র শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। তারপর নিজের পরিচয় দিলেন, হেসে বললেন, ‘আমি এক হুনুর, এখানে হুনুরি, মানে, গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছি। ইন্সপেক্টর যাদব কলেজ-জীবনে আমার ছাত্র ছিল—।’
রঘুপতি বাধা দিয়ে হেসে বলল, ‘এখনও তাই।’
রঙ্গলাল গোস্বামীর সঙ্গেও পরিতোষ দত্তর পরিচয় করিয়ে দিলেন এসিজি। তারপর গলা তুলে বললেন, ‘মিসেস দত্ত, আপনি ভেতরে আসুন। আপনি এখানে এসে বসলে আমাদের কাজের কোনও অসুবিধে হবে না।’
অন্তরা দত্ত একটু লজ্জা পেয়ে গেলেন। তারপর কুণ্ঠিত পায়ে ঘরের ভেতরে এসে ঢুকলেন। ভদ্রমহিলার মুখে বিন্দু-বিন্দু ঘাম। পরনে সামান্য অগোছালো ছাপা শাড়ি। বোঝা যায়, রান্নাবান্নার কাজে সাময়িক ইস্তফা দিয়ে কৌতূহল মেটাতে চলে এসেছেন এ-ঘরে।
স্ত্রীকে দেখে পরিতোষ দত্ত যেন অকূল পাথারে খড়কুটো খুঁজে পেলেন। সাততাড়াতাড়ি হাত নেড়ে বলে উঠলেন, ‘দ্যাখো না, এনারা এখন বলছেন দাদা আত্মহত্যা করেনি, ব্যাপারটা খুনও হতে পারে…।’
অন্তরা দত্ত বেশ শান্ত গলায় বললেন, ‘খুন হোক আর আত্মহত্যা হোক, যে-মানুষ্টা চলে গেছে সে তো আর ফিরে আসবে না।’
এসিজি বেশ অবাক হয়ে অন্তরাকে দেখলেন। ওঁর চেহারার সঙ্গে এই ধীর স্থির মন্তব্য যেন একেবারেই বেমানান।
অন্তরা এসিজিকে লক্ষ করে বললেন, ‘আমাদের যা-যা বলার পুলিশকে বহুবার বলেছি। নতুন কিছু আর বলার নেই। তবু যদি কিছু আপনাদের জিগ্যেস করার থাকে তা হলে বলুন…।’
ক’দিন ধরে বেশ গুমোট চলছে। আকাশে মেঘ আছে, কখনও-কখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টিও পড়ছে। কিন্তু থার্মোমিটারের পারা তাতে নড়ছে বলে মনে হয় না।
ছোট্ট ঘরটার একজোড়া জানলা দিয়ে আকাশ দেখা না গেলেও তার চেহারা-চরিত্র স্পষ্ট অনুভব করা যাচ্ছিল। ঘরের সিলিং ফ্যানের ব্লেডগুলো ক্রমাগত ঘুরপথে ছুটে-ছুটে এখন যেন হাঁফাচ্ছে। সেইসঙ্গে সামান্য ক্যাঁচকোঁচ শব্দও তুলছে।
এসিজি স্বামী-স্ত্রীকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে দেখলেন।
পরিতোষ দত্ত বেশ সচকিত। সাপের ঝাঁপির ডালা আচমকা খুললে সাপ যেরকম সতর্ক হয়ে যায়। অথচ অন্তরা দত্ত অবিচলিত—অন্তত দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। একেই বোধহয় পরিভাষায় বলে ‘কুল-কাস্টমার।’
‘রণতোষবাবু আপনাদের সঙ্গেই খাওয়া-দাওয়া করতেন?’ অন্তরাকে লক্ষ করে প্রথম প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন এসিজি।
‘হ্যাঁ। আমার হাতের রান্না দাদা খুব পছন্দ করতেন।’
‘মারা যাওয়ার আগে বেশ ক’দিন ধরে উনি ডিপ্রেশানে ভুগছিলেন শুনলাম। এর কারণ কিছু আঁচ করতে পারেন?’
পরিতোষ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ওঁকে বাধা দিয়ে অন্তরা বললেন, ‘সেরকম কিছু না। তবে দাদা ইদানীং পাপ, শাস্তি, মৃত্যু—এসব নিয়ে খুব পড়াশোনা করছিলেন…।’
অশোকচন্দ্র আড়চোখে রঘুপতির দিকে তাকালেন।
পরিতোষ দত্ত আলতো গলায় বললেন, ‘দাদা এমনিতে খুব ইমোশনাল ছিল। যে-কোনও তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভীষণ সিরিয়াসলি ভাবত।’
‘উনি বিয়ে করেননি কেন?’
‘সংসারের নানান কর্তব্য করতে গিয়ে নিজের বিয়েটাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।’
পরিতোষ দত্তর উত্তর শুনে অশোকচন্দ্র গুপ্ত তেমন সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। শাকের আড়ালে কোথায় যেন মাছের গন্ধ পেলেন। এও লক্ষ করলেন, অন্তরা স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছেন—চোখে শাসনের ভ্রূকুটি।
এসিজি মাথার সাদা চুলের গোছায় টান মারলেন কয়েকবার। কার্বন ফ্রেমের চশমাটাকে নেড়েচেড়ে ঠিক করে বসালেন। তারপর অন্তরার থেকে সৌজন্য অনুমতি নিয়ে নতুন একটা উইলস ফিলটার ধরালেন।
ধোঁয়া ছেড়ে বহুক্ষণ ধরে পরিতোষ দত্তকে দেখলেন এসিজি। সহজে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এমন নার্ভাস মানুষ। রণতোষ দত্তর চেয়ে প্রায় আঠারো-বিশ বছরের ছোট। কিন্তু স্বাস্থ্যের হাল এমনই যে, ওঁর পক্ষে দাদার ওপরে শারীরিক জোর খাটানো অসম্ভব। যদি না কেউ ওঁকে সাহায্য করে থাকে। তা ছাড়া, এখানে আসার পথে রঘুপতি যা বলেছে তাতে মৃতদেহে ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন ছিল না। শুধু পাকস্থলীতে সামান্য পরিমাণে ভ্যালিয়াম পাওয়া গেছে। রণতোষ দত্ত যদি সত্যি-সত্যিই খুন হয়ে থাকেন তা হলে তাঁকে বোধহয় আগে থেকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে কাবু করে ফেলা হয়েছিল।
