‘আর তুমি সেই রিলে রেসের লাঠিটা এখন আমার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছ!’ বলে হো-হো করে হেসে উঠলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত।
রঘুপতি না হেসে সিরিয়াস মুখে বলল, ‘আপ জো ভি সমঝে, গুপ্তাসাব, এই কেস আপনাকে সেটল করতে হবে—নো আদার অলটারনেটিভ।’
এসিজি সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, ‘তা হলে চলো, স্পটে একবার যাওয়া যাক। জায়গাটা কোথায় যেন বললে, লালাবাগান?’
‘হ্যাঁ। আমি একবার ওখানে ঘুরে এসেছি। তার রিপোর্ট এই ফাইলেই আছে। য়ু ক্যান গো থ্রু ইট। এখন বলুন, আপনি কবে যেতে পারবেন—।’
ভুরু উঁচিয়ে চোখ কপালে তুললেন অশোকচন্দ্র কবে মানে! আজ—এখনই! তোমার কোনও অসুবিধে নেই তো?’
‘আমার অসুবিধে! এটাই এখন আমার সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট অ্যাসাইনমেন্ট। আপনি তা হলে রেডি হয়ে নিন, নীচে আমার গাড়ি আছে।’
রঙ্গলাল গোস্বামী এতক্ষণে মুখ খুললেন, এসিজিকে লক্ষ করে তিনি বললেন, ‘আপনার তদন্তরসে হব কি বঞ্চিত/লালাবাগানে রঙ্গলাল সঙ্গী অবাঞ্ছিত?’
রঙ্গলালের কাব্যের সুড়সুড়িতে এসিজি হেসে ফেললেন, বললেন, ‘ছি, ছি, কী যে বলেন! আপনি সঙ্গী হলে আমাদের দারুণ ভালো লাগবে।’
তৈরি হয়ে ওঁরা তিনজনে নেমে এলেন রাস্তায়। তারপর উঠে পড়লেন রঘুপতির নিয়ে আসা গাড়িতে।
কোনও-কোনও সৌন্দর্য এমন হয় যা পুরুষকে স্থবির করে দেয়। তার অন্তরে আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। সে সেই সৌন্দর্যের ঘনিষ্ঠ হতে চায়, তাকে অপলকে দেখতে চায়, স্পর্শ করতে চায়—তার মাঝেই সবরকম পাওয়া পূর্ণ হয়।
একতলার একফালি বারান্দায় মেয়েটিকে দেখার পর অশোকচন্দ্র গুপ্তের সেইরকমই মনে হল।
বয়েস সাতাশ/আটাশ, সুঠাম শরীর, ফরসা রং, মাথায় ঘন কালো চুল। নাকের ডানপাশে—ঠোঁটের কাছাকাছি একটা স্পষ্ট তিল। চোখের রং সামান্য কটা। শরীরে বাড়তি মেদের আভাস। সিঁথিতে সিঁদুরের কোনও রেখা নেই।
এসিজির পিছন থেকে রঘুপতি যাদব চাপা গলায় বলল, ‘সুমিতা নিয়োগী। রণতোষবাবুদের ভাড়াটে। ওঁর হাজব্যান্ড বছরতিনেক আগে কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। একটা বছর আটেকের লেড়কি আছে—নাম বকুল। এ ছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি আছেন—।’
পুরোনো বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-উঠতে অশোকচন্দ্র রঘুপতির চাপা গলার ধারাবিবরণী শুনছিলেন। ও সুমিতা নিয়োগী, তার শ্বশুর জলধর নিয়োগী, শাশুড়ি পারুল নিয়োগী সম্পর্কে টুকরো-টুকরো খবর বলছিল। অবশ্য তথ্যগুলো এতই সাদামাটা যে, সেগুলোকে ঠিক খবর বলা যায় না।
সুমিতার স্বামী শশধর নিউ আলিপুরে একটা প্রাইভেট ফার্মে স্টোর অফিসারের চাকরি করতেন। খুব সরল-সোজা মানুষ ছিলেন। সুমিতার সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে । সুমিতার বাপের বাড়ি বাগনান। সেখানকার অবস্থা তেমন একটা সচ্ছল নয়। শশধর প্রায়ই ওদের টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করতেন। অবশ্য বাবা-মাকে লুকিয়ে।
দোতলায় উঠে একটা সিগারেট ধরিয়ে এসিজি রঘুপতিকে জিগ্যেস করলেন, ‘এত হাঁড়ির খবর তুমি পেলে কোথা থেকে?’
রঘুপতি বলল, ‘সুমিতা নিয়োগীর সঙ্গে আলাদা কথা বলেছি। আর শশধরবাবুর দফতরে খোঁজ নিয়েছিলেন মানিকতলা থানার অফিসার মজুমদার।’
রঙ্গলাল গোস্বামী এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। তবে বেশ কৌতূহল নিয়ে চারপাশের সবকিছু খুঁটিয়ে দেখছিলেন, আর কান পেতে এসিজি ও রঘুপতির কথাবার্তা শুনছিলেন। ওঁর মুখে একটা গোয়েন্দা-গোয়েন্দা ভাব ফুটে উঠেছিল।
দোতলায় পৌঁছতেই তিনি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘জীর্ণ বাড়ির অজীর্ণ রোগ/বাড়ির গন্ধে মৃত্যুযোগ—।’
অশোকচন্দ্র একবার রঙ্গলালবাবুর দিকে শুধু দেখলেন, কিছু বললেন না। কিন্তু তাঁর মনে হল, রঙ্গলালবাবুর কথা বুঝি একেবারে মিথ্যে নয়। বাড়িটা যে অন্তত পঞ্চাশ-ষাট বছরের পুরোনো তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তা ছাড়া, বাড়িটায় ঢোকার পর থেকেই কেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ তাঁর নাকে আসছে। গন্ধটার মধ্যে সাবান অথবা ডিটারজেন্টের গন্ধের ধরন আছে।
ওঁদের তিনজনকে প্রথম দেখতে পেলেন অন্তরা দত্ত। একটু মোটাসেটা গিন্নি-গিন্নি চেহারা। চোখে বুদ্ধির ছাপ। মহিলা বোধহয় রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আর-একটা ঘরে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঢুকতে যাচ্ছিলেন, তিনজন অতিথিকে দেখে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই রঘুপতি যাদবকে চিনতে পেরে মুখে একচিলতে সৌজন্যের হাসি ফুটিয়ে তুললেন।
‘মিসেস দত্ত, রণতোষবাবুর সুইসাইডের ব্যাপারে আমরা একটু বাতচিত করতে এসেছি। ইনি আমার স্যার, ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত। আর ইনি মিস্টার রঙ্গলাল গোস্বামী—পোয়েট।’
রঙ্গলালবাবু ঘাড় হেলিয়ে বিনীত হেসে বললেন, ‘পোয়েট নয়, ন্যাচারাল পোয়েট। মানে, স্বভাব-কবি।’
অন্তরা দত্ত শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে-মুছতে ওঁদের ভেতরে আসতে বললেন। ছিমছামভাবে সাজানো ছোট মাপের বসবার ঘরে ওঁদের বসিয়ে মিসেস দত্ত চলে গেলেন। তার কয়েক সেকেন্ড পরেই ঘরে এসে ঢুকলেন পরিতোষ দত্ত। লম্বা রোগাটে চেহারা। চোখে চশমা। রং মাঝারি। কপালে কয়েকটা ভাঁজ।
পরিতোষ দত্ত যে চেষ্টা করে বিরক্তির ভাব লুকিয়ে রেখেছেন সেটা বুঝতে এসিজির কোনও অসুবিধে হল না। পোশাক দেখেই বোঝা যায় ভদ্রলোক অফিসে বেরোচ্ছেন।
‘কী ব্যাপার, ইন্সপেক্টর যাদব, দাদার সুইসাইডের ইনভেস্টিগেশান এখনও শেষ হয়নি! আমি এখন অফিসে বেরোচ্ছি—।’
