এরপর রঘুপতি যাদব ওর জগাখিচুড়ি ভাষায় যা বলে গেল তা মোটামুটি এই। ব্যাপারটা হয়েছে দিন কুড়ি আগে, লালাবাগানে—মানিকতলা থানা এলাকায়। গুরুদাস কলেজের বাংলার অধ্যাপক ডক্টর রণতোষ দত্ত আত্মহত্যা করেছেন। ভদ্রলোকের বয়েস চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন মতো হবে। সুন্দর, লম্বা, সুপুরুষ, স্বাস্থ্যবান চেহারা ছিল—তবে কে জানে কেন বিয়ে-থা করেননি। দোতলা বাড়ির ছাদের একটা ঘরে দিনরাত বইপত্র নিয়ে ডুবে থাকতেন। সেই ঘরেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন—সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ধুতি বেঁধে। প্রথম-প্রথম ব্যাপারটা ঠিকই ছিল, কিন্তু পরে একটা গরমিল দেখা দেয়। বাড়িতে আরও লোকজন থাকেন। একতলায় একঘর ভাড়াটে। আর দোতলায় থাকেন রণতোষবাবুর ভাই পরিতোষ দত্ত, ভাইয়ের স্ত্রী অন্তরা দত্ত আর ওঁদের একটা বছর চারেকের মেয়ে টুসি। বাড়ির মালিক পরিতোষ দত্ত আর রণতোষ দত্ত। ওঁদের বাবা বছর কুড়ি আগে মারা গেছেন। তবে এই ঘটনার পর এখন মালিক পরিতোষ দত্ত। পরিতোষবাবু স্টেটব্যাঙ্কের বউবাজার ব্রাঞ্চে চাকরি করেন—বেশ ভালো পোস্টেই। ভদ্রলোকের চাকরির রেকর্ড একদম পরিষ্কার—কোনও গন্ডগোল নেই।
‘রঘুপতি রঘুপতি—’ হাত তুলে রঘুপতিকে থামতে ইশারা করলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত : ‘তোমাকে তো বহুবার বলেছি, গায়ের জোরের লড়াইয়ে স্পিডটা একটা ফ্যাক্টর, বুদ্ধির লড়াইয়ে নয়। তুমি এত তাড়াহুড়ো করে গল্পটা বোলো না—গাড়ির স্পিড একটু স্লো করো। এবার বলো দেখি, রণতোষবাবুর সুইসাইডে গন্ডগোলটা কোথায়, আর সুইসাইড নোটের কেসটাই বা কী? তারপর পরিতোষবাবুর ক্যারেকটার সার্টিফিকেট শুনব।’
রঘুপতি যাদব ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘রণতোষ দত্তের বডিটা সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছিল। আর তাঁর বডির ঠিক নীচেই মেঝেতে উলটে পড়ে ছিল একটা চেয়ার। মানিকতলা থানার এ. এস. আই. মজুমদার কেসটা ইনভেস্টিগেট করছিলেন—প্রথমে তিনি ব্যাপারটা খেয়াল করেননি। পরে মাপজোখ করে পতা চলা কে হ্যাঙিং বডি আর ওই চেয়ারের মধ্যে এক ইঞ্চি মতো ফাঁক থেকে যাচ্ছে। লেকিন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট একদম ও. কে.—ক্লিন সুইসাইড বাই হ্যাঙিং—মানে, সেরকম হলে যেরকম হয় আর কী। তবে স্টমাকে সামান্য একটু ঘুমের ওষুধ পাওয়া গেছে।’
সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে এসিজি প্রশ্ন করলেন, ‘রণতোষ দত্ত ধুতি পরতেন।’
‘হ্যাঁ—’
এমনসময় বিশু ট্রে-তে করে খাবার-দাবার আর কফি নিয়ে এসে টি-টেবিলে রাখল।
এসিজির অনুরোধে রঙ্গলাল আর রঘুপতি খেতে শুরু করল। এসিজি নিজে কফির কাপ তুলে নিলেন। কফিতে চুমুক দিয়ে মাথার সাদা চুলের গোছা ধরে টান মারলেন কয়েকবার।
রঘুপতি ফাইলের একটা পৃষ্ঠায় চোখ রেখে খেতে-খেতে জড়ানো গলায় বলল, ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্টে যা বলছে তাতে সন্দেহ হওয়ার কোনও কারণ নেই। সিক্সথ সার্ভিকাল ভার্টিব্রা মেডালা, পন্স, আর মিডব্রেইনে গিয়ে হিট করেছে। নতিজা রেসপিরেশন আর কার্ডিয়াক ফাংশানের ভাইটাল কন্ট্রোল সেন্টার ড্যামেজ হয়ে ডেথ—।’
কফিতে বারতিনেক লম্বা চুমুক দিয়ে অশোকচন্দ্র বললেন, ‘বুঝেছি। কিন্তু তুমি সুইসাইড নোটের কথা কী যেন বলছিলে—।’
ইতিমধ্যে খাওয়া শেষ করে কফি শুরু করেছে রঘুপতি। কফির কাপ টেবিলে রেখে ফাইল থেকে একটা চিরকুট বের করে এগিয়ে দিল এসিজির দিকে : ‘দেখিয়ে গুপ্তাসাব, ইয়ে রহা আপকা সুইসাইড নোট।’
কফি শেষ করে একটা সিগারেট ধরালেন এসিজি। তারপর প্রাক্তন ছাত্রের হাত থেকে চিরকুটটা নিয়ে ভালো করে দেখলেন। রণতোষ দত্তের লেখা সুইসাইড নোট। রুলটানা কাগজে বলপয়েন্ট পেন দিয়ে লেখা।
‘কোনও ব্যক্তির আত্মার সর্বনাশ হওয়া কেমন ভয়ানক ও গুরুতর বিষয়, তাহা বলা অসাধ্য; কিন্তু ধিক ২! মনুষ্যেরা ঈশ্বরের নিয়ম জানিয়াও মনে করে, যদ্যপি আমরা পাপ করি, তথাপি তিনি দয়ালু হইয়া পরলোকে আমাদিগকে অবশ্য ভালো স্থান দিবেন।’
—ফুলমণি ও করুণার বিবরণ
এটাকে কি সুইসাইড নোট বলা যায়? সিগারেটে গভীর টান দিলেন এসিজি। এরকম পুরোনো ধাঁচের বাংলায় কি কেউ সুইসাইড নোট লেখে! তা ছাড়া, শেষে ওই ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ ব্যাপারটাই বা কী? এটা কোনও লেখা থেকে কোট করা হয়নি তো!
সেটা রঘুপতিকে জিগ্যেস করতেই ও বলে উঠল, ‘আমরা ইনভেস্টিগেট করে দেখেছি, স্যার। এটা পুরোনো একটা স্টোরি থেকে নেওয়া—ফুলমণি ও করুণার বিবরণ—রাইটারের নাম হানা ক্যাথেনিন ম্যালেন্স। বাংলার প্রফেসররা এসবের খোঁজখবর রাখেন।’
কাগজটা দেখতে-দেখতে মাথার সাদা চুলের গোছা ধরে টান মারলেন ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত! আনমনাভাবেই বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ, রঘুপতি, সুইসাইড নোটটা যেন কেমন-কেমন। তা ছাড়া, কাগজটা কোনও বড় পৃষ্ঠা থেকে সাবধানে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। যদি রণতোষবাবু এই অদ্ভুত সুইসাইড নোটের ব্যবস্থা করে গিয়ে থাকেন, তা হলে বলতে হয়, তাঁর আত্মার সর্বনাশ হয়েছিল, তিনি কোনও একটা পাপ কাজ করে সেই অনুতাপে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্ত এখানে আর-একটা খটকা লাগছে : ‘যে-ভদ্রলোক অনায়াসে নিজের পাপ স্বীকার করেন তাঁর পক্ষে স্পষ্ট সুইসাইড নোট লিখতে অসুবিধে কোথায়!’
‘ঠিকই বলেছেন স্যার—’ গম্ভীরভাবে সায় দিল রঘুপতি যাদব, ‘ওই সুইসাইড নোট আর এক ইঞ্চির ব্যাপারটা নিয়ে আমরা থোড়াসা মুসিবতে পড়ে গেছি। রণতোষবাবু মহল্লায় বেশ পপুলার আদমি ছিলেন। তো এসব কী করে জানাজানি হয়ে গিয়ে লোকাল থানায় পাবলিকের প্রেসার এসেছে। তাতে এই কেস ঘুরেফিরে এখন আমার হাতে—।’
