সোফায় বসে রঙ্গলালবাবুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলেন এসিজি। সিগারেটের ধোঁয়ার রেখা ওঁর মাথার সাদা চুলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।
গল্পের মাঝেই আবার বেজে উঠল কলিংবেল। ঘণ্টির ছন্দ শুনেই অশোকচন্দ্র এবার চিনে নিতে পারলেন নতুন অতিথিকে। তাই রঙ্গলালের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘রঘুপতি যাদব—।’
‘হরি হে মাধব!’ পাদপূরণ করলেন রঙ্গলাল। তাঁর মুখে সামান্য আশঙ্কার ছাপ ফুটে উঠল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল এসিজির অনুমান সঠিক। ইন্সপেক্টর রঘুপতি যাদব গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে—অনেকটা পড়া-না-পারা ছাত্রের মতো। ওর হাতে বেশ বড় মাপের সবুজ প্লাস্টিকের কভার দেওয়া একটা ফাইল। এই মুহূর্তে ওকে যতটা না ইন্সপেক্টর তার চেয়ে ঢের বেশি ছাত্র-ছাত্র দেখাচ্ছে।
‘আরে, এসো ইন্সপেক্টর সাহেব, এসো—এসো। মুখটা যেরকম বাংলার পঞ্চান্নর মতো করে রেখেছ তাতে মনে হচ্ছে পাখি নিয়ে সমস্যায় পড়েছ।’
মজা করে প্রাক্তন ছাত্র রঘুপতিকে আহ্বান জানালেন এসিজি।
রঘুপতি যাদব ঘরে ঢুকল। বয়েস চল্লিশের এপিঠে। ছোট করে ছাঁটা চুল। কাঁচাপাকা চওড়া গোঁফ। ফরসা মুখে সামান্য বসন্তের দাগ। হাতের শিরা এবং পেশি দুই-ই চোখে পড়ার মতো।
রঘুপতি চাপা গলায় গজগজ করে বলল, ‘আপ তো মজাক কর রহে, স্যার—লেকিন মেরা তো নিদ খরাব হো গই।’
‘কেন, কেন, ঘুম শিকেয় উঠল কেন?’ চোখ থেকে কার্বন ফ্রেমের চশমাটা খুলে অশোকচন্দ্র ঠাট্টার সুরেই প্রশ্ন করেছেন প্রাক্তন ছাত্রকে।
‘স্রেফ এক ইঞ্চির জন্যে—’ রুক্ষভাবে বলল রঘুপতি। তারপর যেন এই প্রথম দেখতে পেল রঙ্গলাল গোস্বামীকে।
রঙ্গলাল প্রায় বিগলিত হয়ে রঘুপতি যাদবকে আকর্ণবিস্তৃত হাসি উপহার দিয়ে বললেন, ‘মনে পড়েছে মহললাল? আমি সেই রঙ্গলাল।’
রঘুপতি অসন্তুষ্ট চোখে তাকাল অশোকচন্দ্রের দিকে : ‘কী ব্যাপার, গুপ্তাসাব? আবার কি পান্না-চুনির প্রবলেম, নাকি হাস্যকবি সন্মেলন?’
‘রঘুপতি, রঘুপতি—’ ওর কাছে এসে কাঁধে হাত রাখলেন এসিজি। আদরের গলায় বললেন, ‘তোমার মেজাজটাকে একটু ডাউন করো, প্লিজ। কর্পূরের মতো ভোলাটাইল মেজাজ নিয়ে কখনও মিস্ট্রি সলভ করা যায়! নাও বোসো—একটু কফি-টফি খাও, তারপর তোমার এক ইঞ্চির গরমিল নিয়ে মাথা ঘামানো যাবে।’
রঙ্গলাল গোস্বামী রঘুপতির আচরণে খানিকটা হকচকিয়ে সিঁটিয়ে গিয়েছিলেন। অশোকচন্দ্রের ‘কফি-টফির’ প্রস্তাবে গলা বাড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘কফি আমার প্রিয় নয়/টফি হলেই ভালো হয়—।’
রঘুপতি সোফায় বসতে গিয়ে হেসে ফেলল, দেখল রঙ্গলালের দিকে। তারপর বলল, ‘আপনি এই বয়েসেও টফি খান?’
রঙ্গলাল লজ্জায় মুখ নিচু করে বললেন, ‘কী করব, ভালো লাগে। ভালো লাগার কি কোনও বয়েস আছে?’ তারপর রঘুপতিকে সৌজন্যের নমস্কার জানিয়ে, ‘আমি বাগবাজারের লালমহলের রঙ্গলাল গোস্বামী। স্যারের সঙ্গে গভীর পরিচয় করতে এসেছি—।’
এমনসময় দরজা ঠেলে ঢুকল বিশু। বছর বারো-তেরোর কিশোর। এসিজির কাছেই থাকে, ফাইফরমাশ খাটে। বিশুর হাতে পলিথিনের ক্যারিব্যাগ—তাতে ঠোঙা আর বাক্স।
এসিজি ওকে বললেন, ‘ললিতের মা-কে বল দুজন গেস্ট আছে। আর কফি তিনকাপ।’ তারপর রঙ্গলালকে লক্ষ করে, ‘সরি, রঙ্গলালবাবু, আজ আপনাকে টফি খাওয়াতে পারলাম না। আজ কফি দিয়ে কাজ চালান—অন্য আর-একদিন টফি খাওয়াব।’
এরপর রঘুপতির সঙ্গে রঙ্গলালের ‘গভীর’ পরিচয় করিয়ে দিলেন এসিজি।
সব শুনে রঙ্গলাল চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘ফিজিক্সের লোক, লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর! এই কম্বিনেশান বড় সুন্দর এবং ভয়ঙ্কর।’
এসিজি হেসে বললেন, ‘আবার অমর, আকবর, অ্যান্টনি—কী বলুন!’
রঘুপতি অবাক হয়ে তাকাল স্যারের দিকে ‘অমর, আকবর, অ্যান্টনি মানে? আপনি আজকাল হিন্দি পিকচার-টিকচার দেখছেন নাকি, গুপ্তাসাব?’
এসিজি আবার হাসলেন। চশমাটা নাকের ওপরে ঠিক করে বসিয়ে নিয়ে বললেন, ‘ও এক মজার ব্যাপার—তোমাকে পরে বুঝিয়ে দেব। এবারে তোমার এক ইঞ্চির গরমিলের গল্পটা বলো—।’
অশোকচন্দ্র গুপ্ত নতুন একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। ওঁর চোখ বুজে এল। বোঝা গেল, ‘থিঙ্কিং মেশিন’ নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছে।
সোফায় বসে ফাইলটা ঠিক পাশেই রেখেছিল রঘুপতি। সেটা হাতে তুলে নিয়ে খুলতে-খুলতে বলল, ‘গুপ্তাসাব, ব্যাপারটা ঠিক সুইসাইড নয়—তবে সুইসাইডের মতো—।’
এসিজি চোখ খুললেন। রঙ্গলাল গোস্বামীকে লক্ষ করে বললেন,
‘রঙ্গলালবাবু, এবার একটু খুন-জখমের গল্প শুনুন। আপনি কবি মানুষ, এসব গল্পে হয়তো বোর হয়ে যাবেন…তবু—।’
দু-হাত তুলে এসিজিকে থামিয়ে দিলেন রঙ্গলাল, খানিকটা সুর করে বললেন, ‘রঘুপতি যাদব এবং আপনি/ তৎসহ কিঞ্চিৎ খুন কিংবা খুনি/ সুগভীর পরিচয়ের অঙ্গ বলে মানি/ ইন্টারেস্ট তীব্র মম শুনিতে কাহিনি।’ স্বভাব-কবিতা শেষ করে বিনয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে আকর্ণবিস্তৃত হাসলেন রঙ্গলাল।
অশোকচন্দ্র পালটা হেসে রঘুপতিকে বললেন, ‘রঘুপতি, তুমি ননস্টপ তোমার কাহিনি বলে যাও। আমরা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছি। খুঁটিনাটি কিচ্ছু বাদ দেবে না।’
রঘুপতি বলতে শুরু করল, ‘ওই যে বললাম, ব্যাপারটা ঠিক সুইসাইড নয়—সুইসাইডের মতো। কেসটা প্রথম এসেছিল মানিকতলা থানায়—সুইসাইডের কেস হিসেবে। ব্যাপারটা বেশ স্ট্রেট ফরোয়ার্ড ছিল। সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ধুতি বেঁধে খুদকুশি। কিন্তু পরে দেখা গেল, সবকুছ ঠিকঠাক হ্যায়, লেকিন সিরফ এক ইঞ্চির গরমিল। আর সুইসাইড নোটেও থোড়াবহত গড়বড় আছে।’
