ব্রজেন দাস বসে পড়েছিল অনেকক্ষণ আগেই। এবার ওর মাথা ঝুঁকে পড়ল। ফোঁপানির আওয়াজ শোনা গেল মুখ থেকে। তারই মাঝে ও কীসব কথা বলছিল, কিন্তু কান্নাজড়ানো কথার একটি বর্ণও বোঝা গেল না।
শ্রাবণী চ্যাটার্জি জিগ্যেস করলেন, ‘ইনহেলারটাকে ওই শয়তানটা মার্ডার ওয়েপনে কনভার্ট করলে কী করে?’
‘কাজটা কঠিন—তবে ব্রজেন দাসের মতো টেকনিশিয়ানের কাছে অবশ্যই ততটা কঠিন নয়। ইনহেলারের যে-জায়গা দিয়ে ওষুধের স্প্রেটা বেরোয় ঠিক সেই জায়গা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে একটা স্টিলের বুলেট। মিস্টার চ্যটার্জির বডি পোস্টমর্টেম করার সময় নিশ্চয়ই ওটা খুঁজে পাওয়া যাবে। তো ওই বুলেটটাকে নিশ্চয়ই ছিটকে দিয়েছে কোনও জোরালো স্প্রিং অথবা বারুদ। আমার খুব বিশ্বাস, ব্রজেন দাসের আস্তানা সার্চ করলে বেশ কয়েকটা খালি ইনহেলার পাওয়া যাবে—চাই কি মার্ডার ওয়েপনের একটা ডুপ্লিকেট মডেলও পাওয়া যেতে পারে। কারণ, বারকয়েক টেস্ট না করে ব্রজেন দাস এ-ঝুঁকি কিছুতেই নেবেন না—কী, ঠিক বলেছি তো, দাসবাবু?’ ঠাট্টার সুরে এসিজি বললেন, ‘এই হল আমার মোটামুটি গল্প।’
এসিজি থামার পর অনেকেই অনেক প্রশ্ন করতে লাগল। জানতে চাইল, ঠিক কীভাবে খুনটা হয়েছে, এসিজি প্রথম কখন ব্রজেন দাসকে সন্দেহ করলেন—ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসিজি এতটুকু বিরক্ত না হয়ে ধৈর্য ধরে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে চললেন।
ক্যাপ্টেন সুখানি উঠে দাঁড়িয়ে অশোকচন্দ্রের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন, বললেন, ‘থ্যাংকু য়ু, ডক্টর, ফর সলভিং অ্যান অ্যাপারেন্টলি ইমপসিবল ক্রাইম।’
আর সবাই ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়িয়েছে। শুধু শ্রাবণী চ্যাটার্জি মাথা নিচু করে চোখ মুছছেন।
সকলের মুখের ওপরে চোখ বুলিয়ে এসিজি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘একমিনিট। আপনারা কেউ যাবেন না। আমার গল্প এখনও একটু বাকি আছে।’
সবাই অবাক হয়ে তাকাল বৃদ্ধ গোয়েন্দার দিকে।
শাওনি বলল, ‘তার মানে!’
হাসলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত : ‘তার মানে আসল খুনির নাম আমি এখনও বলিনি।’
পলকে সবাই চুপ করে গেল। কয়েক সেকেন্ড। তারপরই শুরু হল গুঞ্জন।
‘আসল খুনি?’ শ্রাবণী কান্না ভুলে মুখ তুলে তাকালেন।
‘বলেন কী, এসিজি স্যার!’ রঙ্গলাল গোস্বামী।
‘ইজ দিস আ জোক?’ ক্যাপ্টেন অর্জন সুখানি।
‘আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে, ডক্টর গুপ্ত।’ ডক্টর ভবানীপ্রসাদ দে।
এসিজি বললেন, ‘একটা কথা আপনারা কেউই আমার কাছে জানতে চাননি।’ একটু থামলেন বৃদ্ধ হুনুর। তারপর ‘ব্রজেন দাস কী করে জানলেন যে, ওঁকে ছাঁটাই করা হবে? মিস্টার চ্যাটার্জি যে-ধরনের মানুষ ছিলেন তাতে এ-কথা ব্রজেনবাবুকে তিনি কিছুতেই আগে জানাতেন না। আমার ধারণা…।’
ব্রজেন দাস চোখ তুলে তাকিয়ে ছিল এসিজির দিকে।
এসিজি ওকে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনাকে ছাঁটাইয়ের খবরটা কে দিয়েছিল? রমেশ শর্মা?’
ব্রজেন দাস সায় দিয়ে মাথা নাড়ল।
হাসলেন এসিজি, বললেন, ‘অবস্থাটা আপনারা সবাই বুঝে দেখুন। ব্রজেনবাবুর চাকরি গেলে উনি যে খেপে যাবেন এটা স্বাভাবিক। তারপর মিস্টার চ্যাটার্জি ও ব্রজেন দাসের মাঝখানে থেকে ঠিকমতো একটু খেলতে পারলে ব্রজেন দাসকে দিয়ে খুনটা করানো সম্ভব। ব্রজেন দাসের খুনের অস্ত্র ছিল স্পেশাল ইনহেলার, আর রমেশ শর্মার নিখুঁত খুনের অস্ত্র ছিল ব্রজেন দাস। কিন্তু তারপর?
‘তারপর তো পথ পরিষ্কার! মিস্টার চ্যাটার্জি মারা গেলে শ্রাবণী চ্যাটার্জি সবকিছুর মালিক হচ্ছেন। সুতরাং, শ্রাবণীদেবীর সঙ্গে যদি রমেশ শর্মার বিয়ে হয়—এই খবরটা শাওনি আমাকে দিয়েছেন, আর শাওনিকে খবরটা দিয়েছিলেন মদনমোহন চ্যাটার্জি নিজে—হ্যাঁ, যা বলছিলাম…বিয়েটা হয়ে গেলে রমেশ শর্মা সম্পত্তির অর্ধেকের মালিক। যদি কোনও কারণে বিয়ে পরে ভেঙেও যায়, তা হলেও সম্পত্তির অনেকটা বাগিয়ে নেওয়া যাবে। তা ছাড়া…।’
‘য়ু ওল্ড ফুল! আপনমনে কীসব বকে চলেছেন? ক্যাপ্টেন সুখানির নির্দেশ ভুলে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল রমেশ শর্মা, ‘কোনও প্রমাণ আছে আপনার কাছে?’ শ্রাবণীর দিকে ফিরে ‘তুমি একটা কথাও বিশ্বাস কোরো না, শ্রাবণী। দিস ওল্ড বাগার ইজ লায়িং লাইক আ সিঙিং ক্যানারি। আই উইল—।’
এসিজি রমেশকে বাধা দিয়ে বললেন, ‘এখানে আমার ছাত্র ইন্সপেক্টর রঘুপতি যাদব হাজির থাকলে আপনার কপালে অনেক দুঃখ ছিল। এনি ওয়ে, প্রমাণের কোনও দরকার নেই। দোষ স্বীকার করার পর ব্রজেন দাস যদি পুলিশকে শুধু বলে যে, এর মধ্যে আপনিও ছিলেন, তা হলেই আপনি ফেঁসে যাবেন—জাল কেটে আর বেরোতে পারবেন না। আপনার কথাবার্তা খুবই ইনটেলিজেন্ট। কায়দা করে ব্রজেন দাসের ব্যাপারে আমাকে সূক্ষ্ম-সূক্ষ্ম সব সূত্র দিয়ে গেছেন। যাতে কখনওই মনে না হয় যে, আপনি ইচ্ছে করে ব্রজেন দাসকে ফাঁসাচ্ছেন, সেজন্যে দরকারমতো অভিনয়ও করে গেছেন। হ্যাটস অফ টু য়ু, মিস্টার শর্মা!’
শ্রাবণী উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, রমেশের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘রমেশ, এসব কী শুনছি! তুমি…তুমি সত্যি এরকম! আমি…আমি…।’
ব্রজেন দাস হঠাৎ চেঁচিয়ে এসিজিকে লক্ষ করে বলল, ‘স্যার! ডক্টর গুপ্ত! শর্মাজি আমাকে চাকরি খোয়ানোর খবর তো দিয়েছেন—এ ছাড়াও আমাকে সবসময় মিস্টার চ্যাটার্জির এগেইনস্টে ওসকাতেন। বলতেন, ”এই গোঁয়ার লোকটা আমাদের সবার সর্বনাশ করবে।” আমি, স্যার, ওঁকে ছাড়ব না!’
