বৃদ্ধ মুচকি-মুচকি হাসছিলেন—অনেকটা দুষ্টুমির হাসি। ক্যাপ্টেন চলে গেলেন টয়লেট স্পেসের দিকে। পরদা সরিয়ে ঢুকে গেলেন ভেতরে। আর-একটা পরদা সরালেই ওপাশে ইকনমি ক্লাস—সেখানে সাবরিনাকে দেখতে পেলেন। ওকে ডেকে নিচু গলায় এসিজির নির্দেশটা জানিয়ে দিলেন।
ক্যাপ্টেন এসিজির কাছে ফিরে আসার মিনিটখানেকের মধ্যেই মদনমোহন চ্যাটার্জির বাকি তিনসঙ্গী এসে হাজির হল : ব্রজেন দাস, রমেশ শর্মা এবং শ্রাবণী চ্যাটার্জি।
এসিজি লক্ষ করলেন, শ্রাবণী ধারালো দৃষ্টিতে শাওনিকে একঝলক দেখলেন। রমেশও একবার তাকাল শাওনির দিকে। আর ব্রজেন দাস নির্বিকার।
এসিজির অনুরোধে সবাই বসে পড়ল। ক্যাপ্টেন সুখানি বসলেন এসিজির পাশের সিটটায়।
মাথার পিছনের সাদা চুলের গোছায় কয়েকবার টান মেরে উঠে দাঁড়ালেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত, বললেন, ‘এটা গোয়েন্দাকাহিনির খুব বিখ্যাত শেষ দৃশ্য। আমার রিকোয়েস্ট, আপনারা প্রত্যেকে মনোযোগ দিয়ে গল্পটা শুনবেন। যদি কোথাও আমার ভুল হয়, তা হলে দয়া করে ভুল ধরিয়ে দেবেন।’
উঠে দাঁড়ানোর ফলে এসিজি সবাইকে কম-বেশি দেখতে পাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল, ওরা এক-একটি রংবেরঙের পাখি। তার মধ্যে আসল পাখিটাকে খুঁজে বের করতে হবে। দুষ্টু পাখি।
এসিজি বলতে শুরু করলেন, ‘মিস্টার মদনমোহন চ্যাটার্জিকে আপনারা সকলেই মোটামুটি জানতেন। দাম্ভিক একরোখা ক্ষুরধার বুদ্ধির বিজনেসম্যান। কাউকে কোম্পানি থেকে ছাঁটাই করতে হলে তিনি হাটে হাঁড়ি ভেঙে তারপর তাকে বরখাস্ত করতেন। আগামীকাল তিনি ছ-জনকে ছাঁটাইয়ের চিঠি ধরাবেন ঠিক করেছিলেন। এই কাগজটায় সেই ছ-জনের নাম লেখা আছে…।’
ঝুঁকে পড়ে মিস্টার চ্যাটার্জির ব্রিফকেস থেকে নামের লিস্টটা তুলে নিলেন অশোকচন্দ্র। সেইসঙ্গে মাইকেলের কবিতার জেরক্স করা পৃষ্ঠাটাও। তারপর : ‘…ছ-জনেরই নামের তলায় তিনবার দাগ দেওয়া এবং পাশে লেখা : ”কালসাপ। নো পে অফ।” আমার মনে হয়…।’
ব্রজেন দাস কাঁপতে-কাঁপতে উঠে দাঁড়াল, বলল, ‘বিনা কারণে স্যার আমাকে বরখাস্ত করছিলেন। স্যারকে আমি হাতে-পায়ে ধরে অনেক রিকোয়েস্ট করেছি, কিন্তু উনি শুনতে চাননি। বলেছি, ঘরে আমার সাতবছর আর দু-বছরের দুটো বাচ্চা রয়েছে—কিন্তু স্যারকে কিছুতেই টলাতে পারিনি—।’
‘সেইজন্যেই তুমি দাদাকে মার্ডার করলে!’ ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন শ্রাবণী চ্যাটার্জি, ‘ছোটলোকের এতবড় সাহস!’
‘প্লিজ ম্যাডাম—’ শ্রাবণীকে হাত তুলে ইশারা করলেন এসিজি : ‘দয়া করে একটু শান্ত হোন—আমার গল্প এখনও শেষ হয়নি।’ এসিজি ব্রজেনের দিকে ফিরলেন : ‘ব্রজেনবাবু, এই কাগজটা একবার দেখুন তো! চিনতে পারেন?’
মাইকেলের কবিতার পাতাটা ব্রজেন দাসের মুখের সামনে ধরলেন অশোকচন্দ্র। ব্রজেন দাসের মুখের রং ফ্যাকাসে হয়ে গেল পলকে।
‘ ”বঙ্গভূমির প্রতি” কবিতাটার দুটো লাইনের তলায় লাল কালিতে দাগ দিয়েছেন আপনি : ”জন্মিলে মরিতে হবে,/ অমর কে কোথায় কাবে”। এইভাবে মদনমোহন চ্যাটার্জিকে খুনের হুমকি দিয়েছেন আপনি। ক্ষুরধার বুদ্ধির মালিক মদনমোহনবাবু কিন্তু বুঝতে পেরেছিলেন, এটা আপনারই কীর্তি—তাই আপনার বরখাস্তের সিদ্ধান্তটা আরও পাকা করেছিলেন। সেটাই আপনি মেনে নিতে পারেননি। আক্ষেপের ব্যাপারটা কী জানেন? আপনি ”জন্মভূমির প্রতি” কবিতা পড়েছেন বটে, কিন্তু ওই একই পৃষ্ঠায় ছিল আর-একটি কবিতা—”আত্ম-বিলাপ”—সেটা আপনি পড়েননি।’ এসিজি আবৃত্তির ঢঙে ধীরে-ধীরে বললেন, ‘আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়…।’
ভবানীপ্রসাদ জিগ্যেস করলেন, ‘কিন্তু মিস্টার দাসকে স্যাক করার ডিসিশান নেওয়া হয়েছিল কেন?’
একবার রমেশ শর্মার দিকে তাকালেন এসিজি, তারপর বললেন, ‘মিস্টার চ্যাটার্জির বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ব্রজেনবাবু নিয়মিতভাবে টাকা সরাতেন। এভাবে কয়েকলক্ষ টাকা তিনি চুরি করেছিলেন…।’
‘মি-মিথ্যে কথা!’ চেঁচিয়ে উঠল ব্রজেন দাস।
দূরে বসা প্যাসেঞ্জাররা বিরক্ত এবং কৌতূহলী চোখে এসিজিদের দিকে তাকালেন।
ক্যাপ্টেন সুখানি ব্রজেন দাসকে বসতে বললেন। তারপর চাপা গলায় যোগ করলেন, ‘প্লিজ কন্ট্রোল ইয়োর টেম্পার। কথাবার্তা আস্তে আস্তে বলুন, নইলে অন্য প্যাসেঞ্জাররা ইরিটেটেড হবে।’
এসিজি হেসে বললেন, ‘চিন্তা করার কোনও কারণ নেই, দাসবাবু, আমার কথা সত্যি কি মিথ্যে সেটা পুলিশ তদন্ত করলেই প্রমাণ হয়ে যাবে। যখন আপনি দেখলেন, বাঁচার আর কোনও পথ নেই তখন মিস্টার চ্যাটার্জির মরার পথ বেছে নিলেন। আপনাকে উনি ভীষণ বিশ্বাস করতেন। আপনার কথায়, একবার ”ব্রজ” বলে হাঁক দিলেই হল—আপনি সটান গিয়ে হুকুম তামিল করতে হাজির হতেন। আপনি জানতেন, মিস্টার চ্যাটার্জির অ্যাজমার প্রবলেম—উনি ইনহেলার ব্যবহার করেন। এও জানতেন, উনি সবার সামনে ইনহেলার ব্যবহার করেন না—করেন আড়ালে। প্লেনে সেই আড়াল বলতে একমাত্র টয়লেট। সুতরাং, আপনার প্ল্যান তৈরি হল। এবার দরকার মারণাস্ত্র—মার্ডার ওয়েপন।’ একটু থামলেন এসিজি। তারপর বললেন, ‘ব্রজেনবাবু, কর্ডলেস ফোন যে সারাতে পারে, টেপ-ডেক সারাতে পারে, এফ. এম. ট্রানজিস্টার তৈরি করতে পারে, সে একটা ইনহেলারকে অবশ্যই মারণাস্ত্রে বদলে দিতে পারবে। আপনি সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট, টেকনিক্যাল কাজ জানেন, আপনি কেন লোকের বাড়ি চাকরের কাজ করবেন! করবেন এই কারণে যেহেতু আপনি—আপনারই কথায়—ভাগ্য ফেরাতে চান। সত্যিই তো! নিয়মিতভাবে হাজার-হাজার টাকা চুরি করে আপনি তো ভাগ্যই ফেরাচ্ছিলেন!’
