রমেশ শর্মা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। ওর মুখ-চোখ লাল, হাত অল্প-অল্প কাঁপছে।
এসিজিকে লক্ষ করে রমেশ বলল, ‘ডক্টর গুপ্ত, আমি বোধহয় মার্ডারারকে চিনতে পেরেছি…।’
‘প্লিজ, মিস্টার শর্মা—এ-বিষয়ে একটি কথাও নয়।’ প্রায় আদেশের সুরে বললেন অশোকচন্দ্র, ‘আপনি সিটে ফিরে যান। আমি এখন শাওনি রাঘবনের সঙ্গে কথা বলব। দরকার হলে আপনাকে আবার ডাকব।’
রমেশ শর্মা যেন গালে একটা থাপ্পড় খেল। ওর মুখে লালচে ছোপ দেখা দিল। দু-একবার ইতস্তত করে ও হাঁটা দিল।
এসিজি রঙ্গলালবাবুকে বললেন, ‘আপনার প্রশ্নের উত্তর একটু পরে দিচ্ছি। সবদিক বিচার না করে হুট করে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। আপনি, প্লিজ, একটু শাওনি রাঘবনকে খবর দিন…।’
শাওনি রাঘবনের বয়েস বাইশ কি তেইশ। মাজা রং। মেয়েদের তুলনায় বেশ লম্বা। চোখে রিমলেস চশমা। চিবুকে বিউটি স্পট। সরু-সরু আঙুলে দীর্ঘ নখ—তাতে চকোলেট রঙের নেলপলিশ। ঠোঁটে একই রঙের লিপস্টিক। গায়ে কালো চুড়িদারের ওপরে গোলাপি কার্ডিগান। কানে চকচকে দুল। কপালে টিপ। চোখের দৃষ্টি গভীর—মনে হয় যেন অতলান্তিক।
এসিজির মনে হল, অসংখ্য চৌম্বক বলরেখা শাওনিকে ঘিরে রেখেছে। তার আওতায় এসে পড়লে একটা চোরাটান টের পাওয়া যাবে।
মিস্টার চ্যাটার্জির খবরটা শোনার পর শাওনি তেমন একটা মুষড়ে পড়ল না। শুধু বলল, ‘হোয়াট আ ফেটফুল এন্ড। হি সার্টেইনলি ডিডন্ট ডিজার্ভ ইট।’
‘মিস্টার চ্যাটার্জি’ আপনাকে পছন্দ করতেন শুনলাম—।’ এসিজি বললেন।
‘ঠিকই শুনেছেন,’ বেপরোয়া ভঙ্গিতে জবাব দিল শাওনি, ‘কিন্তু সেটা মিস চ্যাটার্জি পছন্দ করতেন না।’
‘কেন বলুন তো?’
‘উনি খুব স্ট্যাটাস কনশাস। ওঁর কথাবার্তায় চালচলনে বড়লোকের দুর্গন্ধ বেরোয়। সেইজন্যেই গরিবদের অপছন্দ করাটা ওঁর অভ্যোসে দাঁড়িয়ে গেছে।’
‘রমেশ শর্মা বা ব্রজেন দাসের বেলাতেও তাই?’
‘ব্রজেন দাসের বেলা ওঁর অ্যাটিটিউডটা সেরকম বোঝা যেত না। তবে রমেশ শর্মার বেলায় বোঝা যেত। আর জানবেন, মেয়েরা সহজে মেয়েদের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। আমরা চোখের নজর রিড করতে পারি। বাট রমেশ ইজ আ ভেরি নাইস চ্যাপ।’
এসিজি ইমোশন্যাল পোটেনশিয়ালের সমীকরণগুলো বুঝতে চেষ্টা করছিলেন। কী বলতে চাইছে শাওনি?
‘মিস্টার চ্যাটার্জি আপনাকে ঠিক কী চোখে দেখতেন? ফাদারলি অ্যাফেকশান? না কি…।’
ঠোঁট বেঁকিয়ে খিলখিল করে হাসল শাওনি। জলতরঙ্গের বাজনা বেজে উঠল যেন।
‘আমার কাছে কি অ্যাফেকশানের কোয়ালিটি বা কোয়ান্টিটি মাপার যন্ত্র আছে নাকি যে, মেপে দেখব ওটা ফাদারলি, ব্রাদারলি…নাকি লাভারলি!’ আবার খিলখিল করে হাসি। তারপর : ‘সোজা কথা হল, মিস্টার চ্যাটার্জি ওয়াজ আ নাইস গাই। আই লাইকড হিম আ লট। আই উইল মিস হিম।’
‘ওঁর হাঁপানি রোগ—মানে, অ্যাজমা ছিল জানতেন?’
‘না—।’
‘মিস্টার চ্যাটার্জিকে কে মার্ডার করতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’
‘দ্যাট ভেনমাস লেডি, আর কে! উনি এখন কত কোটি টাকার মালিক হলেন আপনার কোনও ধারণা আছে!’
‘মালিক হিসেবে মিস্টার চ্যাটার্জি কেমন ছিলেন?’
‘গুড—কোয়াইট গুড। খুব সফট হার্টেড ছিলেন। ছোটবোনকে খুব ভালোবাসতেন—মানে, ব্রাদারলি…।’ আবার হাসিতে ভেঙে পড়ল শাওনি, ‘লাস্ট উইকে আমাকে বলেছিলেন যে, একটা দারুণ নিউজ দেবেন। দারুণ আনন্দের খবর।’
কৌতূহলী হয়ে উঠলেন এসিজি : ‘খবরটা কি পেয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী খবর?’
‘শ্রাবণী চ্যাটার্জির বিয়ে—রমেশ শর্মার সঙ্গে। রমেশ খুব লাকি। ইট ওয়াজ গুড নিউজ ফর মিস চ্যাটার্জি, বাট আই থিংক ব্যাড নিউজ ফর রমেশ।’
এসিজির মুখে সামান্য অবাকভাব দেখে শাওনি বলল, ‘কেন, ওরা আপনাকে বলেনি? শুনলাম তো আপনি ওদের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেছেন…।’
‘আচ্ছা, মিস রাঘবন, আপনি ব্যাড নিউজ ফর রমেশ বললেন কেন?’
হাসল শাওনি : ‘বিয়েটা টিকবে বলে মনে হয় না—সেইজন্যে।’
এসিজি আনমনা হয়ে চিন্তায় ডুবে যাচ্ছিলেন। শাওনি ‘ডক্টর গুপ্ত’ বলে তিনবার ডাকার পর ওঁর হুঁশ ফিরল।
‘থ্যাংক য়ু সো মাচ, মিস রাঘবন। আই অ্যাম গ্রেটফুল টু য়ু।’
‘কেন জানতে পারি?’ চোখের কোণ দিয়ে তাকাল শাওনি।
‘এখুনি জানতে পারবেন—একটু অপেক্ষা করুন।’
এসিজি উঠে দাঁড়ালেন। গল্পটা কি ঠিক-ঠিক খাড়া করা যাচ্ছে? ক্যাপ্টেনকে কি খবর দেওয়া যায় এখন?
ভবানীপ্রসাদ একটা সিটে চোখ বুজে শরীর এলিয়ে ছিলেন। এসিজি ওঁকে ডেকে বললেন, ‘ডক্টর দে, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি?’
ভবানীপ্রসাদ চোখ মেলে তাকালেন।
‘উঠে পড়ুন—আমরা লাস্ট চ্যাপ্টারে পৌঁছে গেছি। আমি ক্যাপ্টেনকে ডেকে পাঠাচ্ছি আর মিস্টার চ্যাটার্জির বাকি সঙ্গী-সাথীদেরও ডাকছি। আর-একটু পরেই আমরা ভাইজাগে নেমে পড়ব।’
এসিজির কথা শুনে ভবানীপ্রসাদের ঘুম চটকে গেল। সাততাড়াতাড়ি মুখ-টুখ মুছে সোজা হয়ে বসলেন। লজ্জা পেয়ে বললেন, ‘সরি, ভীষণ টায়ার্ড লাগছিল…।’
রঙ্গলাল গোস্বামীকে দিয়ে খবর পাঠাতেই ক্যাপ্টেন সুখানি মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে চলে এলেন।
এসিজির কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, ডক্টর গুপ্ত, আর য়ু থ্রু?’
‘ইয়েস, ক্যাপ্টেন। আই থিংক দ্য গেম ইজ ওভার। আপনি কাউন্ডলি মিস্টার চ্যাটার্জির বাকি তিনজন কম্প্যানিয়ানকে ডেকে পাঠান। সকলের সামনেই তাস খুলে দেখাতে চাই আমি।’
