‘ব্রজেন এই ডিসিশানের কথা জানত?’
‘না বোধহয়। ভুলে যাবেন না, মিস্টার গুপ্ত, আমি ছিলাম স্যারের পারসোনাল সেক্রেটারি—তাই অনেক কিছু আমি একাই জানতাম…এমনকী শ্রাবণী, মানে, মিস চ্যাটার্জিও সেগুলো জানতেন না।’
‘ব্রজেন দাস জানলে পরে ওর হুমকি দেওয়ার এবং খুন করার একটা পজিটিভ মোটিভ তৈরি হতে পারে…।’
‘হাউ ডু আই নো?’ কাঁধ ঝাঁকাল রমেশ : ‘য়ু আর দ্য স্লুথ।’
‘আচ্ছা, ওর নামের পাশে কালসাপ কথাটা লেখা কেন?’
রমেশ শর্মা নখ খুটতে শুরু করল। বলবে-কি-বলবে না ভেবে কয়েকবার মাথা ওঠাল-নামাল। তারপর একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘চেপে রেখে লাভ নেই…আপনি পরে তো জানতেই পারবেন। ব্রজেন দাস স্যারের বিশ্বাসী লোক হয়ে ওঠার পর থেকে রেগুলার টাকা চুরি করত। এইভাবে ও কয়েকলক্ষ টাকা সরানোর পর স্যার ব্যাপারটা ধরতে পারেন। সপ্তাহদুয়েক আগে আমাকে বলেছিলেন। এটা আর কেউ জানে না। মিস চ্যাটার্জিও না।
অশোকচন্দ্রের কপালে ভাঁজ পড়ল, চোখ ছোট হয়ে গেল চিন্তায়। ওঁর চশমার কাচে আলো চকচক করছিল। রহস্যের জায়গাগুলো কি ধীরে-ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে?
একসময় ডক্টর ভবানীপ্রসাদ দে পরদার আড়াল সরিয়ে টয়লেট স্পেসের দিক থেকে বেরিয়ে এলেন। কিছু একটা দেখাবেন বলে ইশারায় এসিজিকে ডাকলেন।
এসিজি ভুরু উঁচিয়ে প্রশ্ন করতেই ডক্টর দে তৃপ্তির সুরে বললেন, ‘বোধহয় খুনের কায়দাটা আমি বুঝতে পেরেছি, ডক্টর গুপ্ত। বলব, কী করে মদনমোহন চ্যাটার্জিকে টয়লেটের ভেতরে মার্ডার করা হয়েছে?’
হাসলেন বৃদ্ধ হুনুর। উঠে দাঁড়িয়ে দু-পা সামনে এগিয়ে গেলেন। তারপর একটা হাত শূন্যে তুলে ডক্টর দে-কে বাধা দিলেন, ‘না, আমি বলছি। ভুল হলে শুধরে দেবেন, ও. কে.? অ্যাজামার অ্যাটাক হতেই মিস্টার চ্যাটার্জি ইনহেলার নিয়ে ওই টয়লেটে গিয়ে ঢুকেছিলেন। ইনহেলারের মাউথপিস কভার খুলে ক্যানিস্টারের স্প্রে বেরোনোর দিকটা মুখে ঢুকিয়ে অভ্যাসমতো পেছনদিকটায় চাপ দিয়েছিলেন…এবং সঙ্গে-সঙ্গে গুড়ুম…!’ মুখে পিস্তল ছোড়ার শব্দ করতে চাইলেন এসিজি : ‘ব্যস, সব শেষ।’
হেসে কাঁধ ঝাঁকালেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত।
আবিষ্কারের কৃতিত্ব হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় ভবানীপ্রসাদকে বেশ হতাশ দেখাল। অবাক হয়ে তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘কী করে বুঝলেন বলুন তো?’ তারপর এসিজির পাশ দিয়ে রমেশ শর্মার দিকে সন্দেহের চোখে একবার তাকালেন।
রমেশ মাথা নিচু করে আঙুল খুঁটছিল, উসখুস করছিল, আর মাঝে-মাঝেই ডক্টর দে-র দিকে তাকাচ্ছিল।
ভবানীপ্রসাদ এসিজির চোখে চোখ রেখে রমেশের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘মার্ডারার কি কনফেস করেছে? সব বলে দিয়েছে আপনাকে?’
হেসে ফেললেন এসিজি, মাথা নেড়ে বলনে, ‘ধুস, কী যেন বলেন!’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর : ‘যাগগে, এবার বলুন দেখি, আমি ঠিক বলেছি কি না…।’
তারিফ করে মাথা নাড়লেন ভবানীপ্রসাদ : ‘ঠিক বলেছেন, তবে কনফার্ম করতে গেলে ল্যাবরেটরির হেলপ দরকার। এতক্ষণ ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজে আমি ডেডবডির মুখের গর্তে বেশ কয়েক জায়গায় অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাস্টিকের পার্টিকল পেয়েছি। মনে হচ্ছে, ইনহেলারের পুশটায়…মানে, ক্যানিস্টারের পেছনটায়…চাপ দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে একটা এক্সপ্লোশান হয় এবং একটা ছোট্ট স্টিলের বুলেট এত জোরে টাকরার দিকে ছুটে যায় যে, ওটা টাকরা ফুটো করে সোজা ব্রেনে গিয়ে লাগে। আপনি গোড়াতেই যা আন্দাজ করেছিলেন—মিস্টার চ্যাটার্জি ওয়াজ কিলড ইনস্ট্যান্টলি। আর বুলেটটাকে কী কায়দায় ট্রিগার করা হয়েছে সেটা বলা একটু মুশকিল—কারণ, সেই মেকানিজমটা ওই হাই ইমপ্যাক্টে বলতে গেলে ধুলো হয়ে গেছে। সেইজন্যেই ডেডবডির শুধু মুখে আর গালে কয়েকটা ছোট-ছোট টুকরো গেঁথে ছিল…আর সেরকম কোনও এভিডেন্স পাওয়া যায়নি। তবে টয়লেট কিউবিকলে অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাস্টিকের কিছু টুকরো পাওয়া গেছে। ওঃ, এককথায় ডায়াবলিক্যাল! নৃশংস!’
রমেশ শর্মা হাঁ করে ভবানীপ্রসাদ দে-র কথা শুনছিল। ওর চোখজোড়া যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
রঙ্গলাল গোস্বামীও নিপাট কৌতূহলে দুই ডক্টরের কথাবার্তা প্রায় গিলে খাচ্ছিলেন।
এসিজি মাথার পিছনে হাত নিয়ে চুলের গোছায় বারকয়েক টান মারলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মদনমোহন চ্যাটার্জির ইনহেলার ব্যবহারের অভ্যেসের কথা খুনি অবশ্যই জানত। এও জানত, তিনি সকলের চোখের আড়ালে গিয়ে ইনহেলার ইউজ করেন। প্লেনে আড়াল বলতে এই টয়লেট। সুতরাং, খুনিকে যা করতে হয়েছিল সেটা হল মিস্টার চ্যাটার্জির ইনহেলারটাকে কোনও একফাঁকে বদলে দেওয়া—আসল ইনহেলারের বদলে ইনহেলার-বন্দুক। ব্যস, তারপর শুধু অপেক্ষা…।’
‘ঘটনাটা ঘটে যেতেই আমরা ভাবলাম, বন্ধ টয়লেটের ভেতরে মদনমোহন চ্যাটার্জিকে কেউ গুলি করেছে। লকড রুম প্রবলেম—যার সমাধান মোটেই সহজ নয়। কিন্তু এখন ”হাউ” বোঝার পর ”হোয়াই” আর ”হু” টাও বোঝা যাচ্ছে।’
রঙ্গলাল উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘শাবাস, এসিজি স্যার, শাবাশ! স্বভাব-কবিতায় বলতে ইচ্ছে করছে : হাউ হোয়াই হু/ হু ক্যান ডু/ এরকম খুন/ মুখ সবার চুন/ জানে শুধু এসিজি/ খুনির সব ঠিকুজি! মিস্টার চ্যাটার্জিকে কে খুন করেছে, এসিজি স্যার?’
