রঙ্গলাল গোস্বামী রওনা হয়ে যেতেই রমেশ উত্তেজিতভাবে বলে উঠল, ‘এটা কি ঠিক হচ্ছে, মিস্টার গুপ্ত?’
এসিজি হেসে বললেন, ‘প্লিজ, উত্তেজিত হবেন না, মিস্টার শর্মা। প্লেনের ক্যাপ্টেন অর্জন সুখানি আমাকে এই অথরিটি দিয়েছেন। কিলিং ইজ নট আ ম্যাটার অফ জোক। খুনিকে খুঁজে বের করতে গেলে কত কাঠখড় পোড়াতে হয় জানেন!’
রমেশ চুপ করে গেল বটে, কিন্তু উসখুস করতে লাগল।
একটু পরেই রঙ্গলাল ফিরে এলেন—হাতে বাদামি রঙের একটা ছোট ব্রিফকেস।
ওটা নিয়ে কোলের ওপরে বসালেন এসিজি। আঙুলের চাপ দিয়ে খুলতে যাবেন, রমেশ আলতো করে অনেকটা অনুরোধের ঢঙে বলল, ‘মিস্টার গুপ্ত, এটা কি না খুললেই নয়?’
থেমে গেলেন এসিজি : ‘কেন বলুন তো? কী আছে এতে?’
‘কোম্পানির সব কনফিডেনশিয়াল কাগজপত্র…।’
হাসলেন এসিজি…’য়ু আর রিয়েলি আ জেম অফ আ ওয়ার্কার। ড্যাম ডেডিকেটেড। বাট ম্যান, উই আর ডিলিং উইথ আ কিলিং। এর গুরুত্ব আপনি কেন বুঝতে পারছেন না কে জানে!’
কথা বলতে-বলতেই ব্রিফকেস খুলে ফেললেন এসিজি, এবং ভেতরের কাগজপত্র ঘাঁটতে শুরু করলেন।
হঠাৎই একটা কাগজ দেখে তিনি চমকে উঠলেন। কাগজটা বের করে নিলেন। কয়েকবার চোখ বুলিয়ে রমেশ শর্মাকে দেখালেন।
‘অ্যাজমার টান শুরু হওয়ার আগে মিস্টার চ্যাটার্জি কি এই কাগজটা দেখছিলেন?’
‘ঠিক বলতে পারছি না। হতে পারে। এরকমই কী একটা কাগজ দেখছিলেন—এর চেয়ে ডেফিনিট কিছু আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।’
এসিজি যে-কাগজটা দেখছিলেন সেটা একটা কবিতার বইয়ের একটি পৃষ্ঠার জেরক্স কপি। সেই পৃষ্ঠায় মাইকেলের বিখ্যাত কবিতা ‘আত্মবিলাপ’-এর পুরোটা এবং ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার প্রায় অর্ধেকটা রয়েছে। আর পৃষ্ঠার মাথায় হেডিং দেওয়া আছে ‘গীতিকবিতা’।
কিন্তু অশোকচন্দ্রের চমকে ওঠার কারণ অন্য। ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতার দুটি লাইন লাল কালি দিয়ে কেউ আন্ডারলাইন করে দিয়েছে। এবং সেই লাইন দুটি হল ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে।’
‘এর অর্থ কী বলতে পারেন?’ এসিজি কপালে ভাঁজ ফেলে রমেশ শর্মাকে জিগ্যেস করলেন।
এমনভাবে হাসল রমেশ যেন এসিজির বোকামিতে বেশ মজা পেয়েছে। তারপর বলল, ‘মিস্টার গুপ্ত, বেঙ্গলি আমার মাদার টাং নয়—আমি কী করে এই কবিতার মানে বুঝব!’
এসিজি মিথ্যের বাণ ছুড়লেন। বেশ সিরিয়াস মুখ করে বললেন, ‘মিস চ্যাটার্জি বলছিলেন যে, আপনি একটু-আধটু বাংলা পড়তে পারেন…।’
চোখ পিটপিট করল রমেশ। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা ইংরেজিতে ট্রানস্লেট করার চেষ্টা অবশ্যই অডাসিটি। তবে তদন্তের স্বার্থে একটা খোঁড়া তর্জমা আপনাকে করে শোনাচ্ছি : ”ইফ য়ু আর বর্ন, য়ু আর টু ডাই/ ইমমরটালিটি ইজ অ্যান ইটারনাল লাই। তো এই লাইনদুটোর তলায় লাল কালি দিয়ে কেন দাগ দেওয়া হয়েছে বলতে পারেন? এই দাগের মানেটাই আমি জানতে চাইছিলাম।”
‘হতে পারে, এটা হয়তো খুনের হুমকি। মিস্টার চ্যাটার্জিকে কেউ ভয় দেখাচ্ছিল।’
‘একজ্যাক্টলি! কিন্তু কে ওঁকে ভয় দেখাতে চেয়েছিল?’
‘আপনি কি ভাবছেন আমি?’ রুক্ষভাবে পালটা প্রশ্ন করল রমেশ।
‘হতে পারে।’ নির্বিকারভাবে বললেন বৃদ্ধ হুনুর, ‘আবার অন্য কেউও হতে পারে। ওঁর তো শত্রুর অভাব ছিল না!’
রমেশ বাঁকাচোখে এসিজির দিকে একবার তাকাল শুধু—কোনও মন্তব্য করল না।
‘কী করে এটা মদনমোহন চ্যাটার্জির ব্রিফকেসে গিয়ে পৌঁছল বলুন তো?’
‘কী করে আবার, কেউ রেখেছে।’ তাচ্ছিল্যের ঢঙে বলল রমেশ।
‘হ্যাঁ, ঠিকই—কিন্তু রাখার চান্সটা তো পেতে হবে!’
‘আপনি কি ইনডিরেক্টলি আমাকে অ্যাকিউজ করতে চাইছেন? ওহ ইয়েস, আই হেটেড হিম। কিন্তু সেজন্যে গলায় ফাঁসির দড়ি পরতে আমি রাজি নয়। মিস্টার চ্যাটার্জি শকুনের মতো ঠোকরাতেন বটে, কিন্তু সোনার ডিমও পাড়তেন। এরকম একজনকে সরানোর চেষ্টা করে আমার কী লাভ!’
‘হুঁ…ঠিকই বলেছেন।’ বিড়বিড় করে বললেন বৃদ্ধ। তিনি মনে-মনে ভাবছিলেন, লাল দাগ দেওয়া এই কবিতার পাতাটা চারজনের যে-কেউ মদনমোহন চ্যাটার্জির ব্রিফকেসে রাখতে পারে।
কাগজপত্র ঘাঁটতে-ঘাঁটতে আরও একটা জিনিস পাওয়া গেল।
একটা সুন্দর রাইটিং প্যাড। তার একটা পৃষ্ঠায় বড়-বড় হরফে লেখা, ইমডিয়েট ডিসমিসাল। তার নীচে ছ’জনের নাম—নাম ঠিক নয়, নামের আদ্যক্ষর। আর পৃষ্ঠার নীচের দিকে আগামীকালের তারিখ দেওয়া।
রমেশ বেশ অস্বস্তি নিয়ে এসিজির কাজকর্ম লক্ষ করছিল। এসিজি হঠাৎই ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘এই হাতের লেখাটা কার? মিস্টার চ্যাটার্জির?’
‘হ্যাঁ, আপনাকে বলছিলাম না, উনি ছ-জনকে ছাঁটাই করার ডিসিশান নিয়েছিলেন। এই লিস্টটায় যেসব নাম আছে সেগুলো কিছুদিন আগেই মিস্টার চ্যাটার্জি আমাকে বলেছিলেন।’
নামের আদ্যাক্ষরগুলোর ওপরে বারবার চোখ বোলাচ্ছিলেন এসিজি। একটি নাম ছাড়া আর কোনওটাই চেনা হল না। নামটার নীচে তিনবার দাগ দেওয়া এবং পাশে লেখা : ‘কালসাপ। নো পে অফ।’
সেই নামটায় আঙুল দিয়ে এসিজি রমেশকে জিগ্যেস করলেন, ‘এই বি. ডি. মানে কি ব্রজেন দাস। নাকি একই ইনিশিয়ালের অন্য কোনও স্টাফ আছে?’
রমেশ শর্মার মাথা ঝুঁকে পড়ল, হতাশায় মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিকই ধরেছেন…ব্রজেন দাস। এই ইনিশিয়ালের আর কোনও স্টাফ নেই। খুব স্যাড ডিসিশান।’
