ঠোঁটে হাসল রমেশ। সিটের হাতলে নখের আঁচড়ে কাটতে-কাটতে বলল, ‘বারদুয়েক সেরকম অবস্থা হয়েছিল। তবে কোনওরকমে বেঁচে গেছি। আমি বোধহয় খুব লাকি।’
‘মিস্টার চ্যাটার্জির তা হলে তো অনেক শত্রু থাকার কথা…।’
‘ওঁর বন্ধু বলেই কেউ ছিল না—শুধু দু-চারজন ছাড়া…।’
ব্রজেনের কথাটা মনে পড়ল এসিজির। তাই জিগ্যেস করলেন, ‘সেই দু-চারজনের মধ্যে কি আপনি পড়েন?’
‘অবশ্যই—’ জোর গলায় বলল রমেশ, ‘অন্তত আমি তাই মনে করি। এছাড়া ব্রজেন দাসের ওপরেও স্যার বেশ ভরসা করতেন। আর শ্রাবণী চ্যাটার্জি তো স্যারের ফ্যামিলি মেম্বার।’
‘শাওনি রাঘবন?’
‘ও তো বেশিদিন আসেনি। তবে ও স্যারের বেশ পছন্দের ছিল।’
আপনি তো বছরদশেক মিস্টার চ্যাটার্জির কাছে কাজ করছেন। যাকে পছন্দ করেন না তাঁর সঙ্গে এতবছর কাজ করাটা নেহাত মামুলি ব্যাপার নয়।’
‘এর সঙ্গে স্যারের মার্ডারের কী কানেকশান আছে জানতে পারি?’ একটু রুক্ষভাবে জানতে চাইল রমেশ।
‘সেরকম ডায়রেক্ট কানেকশান কিছু নেই। শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড একটু বুঝতে চাইছি।’ হাতের একটা ভঙ্গি করে বললেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। তারপর ‘মিস্টার চ্যাটার্জি হার্টের কোনও প্রবলেম ছিল?’
‘যদ্দূর জানি, ছিল না। শ্রাবণী—মানে, মিস চ্যাটার্জি হয়তো আরও ভালো বলতে পারবেন।’
‘আপনি নাকি জেম অফ আ ওয়ার্কার? এসিজি আচমকা প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন ইমোশন্যাল পোটেনশিয়ালের খোঁজে।
রমেশ অবাক হয়ে তাকাল বৃদ্ধের দিকে। চশমাটা ঠিক করে নাকের ওপরে বসিয়ে বলল, ‘আর য়ু মেকিং ফান অফ মি?’
‘না-না মোটেই না।’ হাত নেড়ে রমেশকে ম্যানেজ করলেন এসিজি ‘মিস চ্যাটার্জি আপনার প্রশংসা করে এ-কথা বলেছেন।’
রমেশ চট করে নরম হয়ে গেল। বিনয়ে মাথা নামাল।
‘আপনি তো পারসোনাল সেক্রেটারি, মিস্টার শর্মা—আপনার জানা উচিত। এই ট্রিপে মিস্টার চ্যাটার্জির টেনশান কেমন ছিল?’
‘হাই টেনশান। তবে এটা নতুন কিছু নয়। কোটি-কোটি টাকার কারবার। সবসময়ে ওঁকে হাই টেনশনেই চলতে হত। যেমন, এই যে আমরা কলকাতা যাচ্ছিলাম…কাল সকালেই আমাদের হলদিয়া রওনা হওয়ার কথা ছিল। সেখানে একটা হাই টেনশান মিটিং ছিল—আমাদের নতুন স্টিল প্ল্যান্টের প্রজেক্ট নিয়ে। এসব ওঁর গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল…।’
‘প্লেন ফ্লাই করার পর আপনি ওঁর বিহেভিয়ারে অ্যাবনরম্যাল কিছু নোটিস করেননি?’
‘না। সেই একইরকম জেদি, একরোখা, অহঙ্কারী একজন মালটিমিলিয়নেয়ার। কলকাতায় গিয়ে মিস্টার চ্যাটার্জি ছ’জনকে ছাঁটাই করবেন ঠিক করেছিলেন। কাউকে ছাঁটাই করার ব্যাপার হলে উনি করতেন কি একেবারে পাবলিক নোটিস দিয়ে আর সব স্টাফকে জানিয়ে রীতিমতো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তারপর ছাঁটাইয়ের চিঠি ধরাতেন। ইউনিয়ন কিছু করতে পারত না। কারণ, টাকা দিয়ে ইউনিয়নের মুখ বন্ধ করার সহজ পথ উনি জেনে গিয়েছিলেন। বোঝেনই তো, সব ইউনিয়নই তো আর সমান নয়!’
মুখে একবার হাত বুলিয়ে নিল রমেশ। তারপর বলল, ‘এসব করে মিস্টার চ্যাটার্জি কেমন একটা স্যাডিস্টিক আনন্দ পেতেন। তো ব্রিফকেস খুলে-নানান কাগজপত্র দেখছিলেন আর আমার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই এটা-সেটা ডিসকাস করছিলেন…হঠাৎ…।’
একটু থামল রমেশ, ওর চোখে কেমন একটা দ্বিধা খেলে গেল। তারপর বেশ ধীরে-ধীরে বলল, ‘…হঠাৎই ওঁর টান শুরু হল—ওই টেনশান থেকে ওঁর যেমন হত আর কী!’
‘টান শুরু হলে মিস্টার চ্যাটার্জি কী করতেন, ওষুধ খেতেন?’
‘না, ইনহেলার ব্যবহার করতেন। উনি ভাবতেন আমরা কেউ ব্যাপারটা জানি না। আসলে মিস্টার চ্যাটার্জি খুব দাম্ভিক ছিলেন—এই টাইপের লোকেরা যেমন হয় আর কী! এরকম একজন বিখ্যাত মানুষ…সে হাঁপানির টানের কাছে কাবু হয়ে পড়েছে…এটা পাবলিক জানুক তিনি চাননি। তাই টান ধরলেই উনি ইনহেলার পকেটে নিয়ে উধাও হয়ে যেতেন—দু-চারবার পাম্প নিয়ে আবার ফিরে আসতেন আমাদের কাছে। আমি সবই জানতাম, কিন্তু না জানার ভান করতাম।’
‘আপনি ইনহেলারের ব্যাপারটা জানলেন কী করে?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর রমেশ বলল, ‘ব্রজেন আমাকে একদিন কথায়-কথায় বলেছিল।’
‘ব্রজেন দাস জানল কী করে?’
‘ও স্যারের সবই জানত। ওকে দিয়েই তো স্যার ইনহেলার কেনাতেন। ব্রজেন আমাকে একবার নামটা বলেছিল…”বেকলেট-ফিফটি” না কী যেন।’
‘মিস্টার চ্যাটার্জি তা হলে টয়লেটে গিয়েছিলেন ইনহেলারের পাম্প নিতে?’
‘আমার তো তাই মনে হয়। তারপর অনেকক্ষণ ধরে উনি ফিরছেন না দেখে মিস চ্যাটার্জি এয়ারহোস্টেসকে ডেকে বলেন…।’
‘উনি ফিরছেন না দেখে আপনার চিন্তা হয়নি?’
‘হয়েছিল—মালিকের জন্যে একজন এমপ্লয়ির যতটুকু চিন্তা হয় ঠিক ততটুকু—তার বেশি নয়। কারণ, মদনমোহন চ্যাটার্জি যে আমার মালিক সেটা আমি কখনও ভুলতে পারতাম না। তা ছাড়া, আপনাকে তো বললাম, উনি সেটা ভুলতে দিতেন না…।’
‘মিস্টার চ্যাটার্জিকে আপনি একদমই পছন্দ করতেন না…।’
মাথা নাড়ল রমেশ। এসিজির দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ব্যাপারটা পছন্দ-অপছন্দের নয়। একটা কাজ করার জন্যে উনি মাসে-মাসে আমাকে মাইনে দিতেন—আমি সেই কাজটা দিতাম, মাইনে নিতাম। এসব ব্যাপারে আমি খুব প্রফেশন্যাল।’
রমেশ শর্মাকে হঠাৎই থামিয়ে দিয়ে এসিজি রঙ্গলালকে বললেন, ‘রঙ্গলালবাবু, আপনি আমাকে একটু হেলপ করুন। মিস শ্রাবণী চ্যাটার্জির কাছে একটু যান—মিস্টার চ্যাটার্জির ব্রিফকেসটা নিয়ে আসুন—বলবেন আমি চেয়েছি।’
