ব্রজেনের কাছে ঝুঁকে এলেন এসিজি। গলা নিচু করে বললেন, ‘কাউকে আপনার সন্দেহ হয়?’
‘কীসের সন্দেহ?’ অনেকটা যেন চমকে উঠল ব্রজেন। তারপর সামলে নিয়ে বলল, ‘আমি ছোটমানুষ—সন্দেহ কাকে করব! তবে স্যার যে-ই খুন করে থাকুক টাকার লোভে করেছে। স্যারের টাকাপয়সা সম্পত্তির তো কোনও হিসেব ছিল না…আশপাশের অনেকেই তক্কেতক্কে ছিল।’
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন এসিজি। তারপর হাতে হাত ঘষে বললেন, ‘ঠিক আছে…অনেক ধন্যবাদ, ব্রজেনবাবু। আপনি আপনার সিটে গিয়ে বসুন…সেরকম কোনও খবর হলে আপনাকে জানাব।’
ব্রজেন উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলে গেল, ‘আমার সর্বনাশ হয়ে গেল…আমার লাইফটা শেষ হয়ে গেল…।’
এসিজি ব্রজেনের আগের কথাটা ভাবছিলেন : ‘আশপাশের অনেকেই তক্কেতক্কে ছিল…।’
তার মানে?
ডক্টর ভবানীপ্রসাদ দে এসিজিকে বললেন, ‘ডক্টর গুপ্ত, একজন হোস্টেস ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল কিটটা গ্যালিতে দিয়ে গেছে। বলছে, তাড়াতাড়ি চেক আপের কাজটা সেরে ফেললে ভালো হয়…।’
অশোকচন্দ্র গুপ্ত আনমনাভাবে কী যেন চিন্তা করছিলেন। ঘোর ভেঙে চমকে উঠে ভবানীপ্রসাদের দিকে তাকালেন, বললেন, ‘আপনি বরং চেক আপটা সেরেই নিন। আমি ততক্ষণে এদিককার কাজ এগিয়ে নিই। আপনি যখন টয়লেটের ওখানে যাচ্ছেন তখন একজন হোস্টেসকে ডেকে একটু বলে দিন মিস্টার চ্যাটার্জির পারসোনাল সেক্রেটারিকে এখানে পাঠিয়ে দিতে…প্লিজ।’
‘উইথ প্লেজার—’ বলে ডক্টর দে উঠে গেলেন।
রঙ্গলাল অলিপথের ওপারে একটা সিটে চোখ বুঝে বসেছিলেন। ভবানীপ্রসাদ চলে যেতেই চোখ খুলে তাকালেন এসিজির দিকে : ‘স্যার, কাকে আপনার সন্দেহ হয়?’
এসিজি মুচকি হেসে জবাব দিলেন, ‘এখনও বলা সম্ভব নয়।’
বৃদ্ধের ছড়া-কাটার দুষ্টুমিটা ধরতে পেরে হেসে ফেললেন রঙ্গলাল।
রমেশ শর্মাকে অশোকচন্দ্রের কাছে নিয়ে এল ইরিনা।
পারসোনাল সেক্রেটারির পারসোনালিটি কম নয়। অন্তত রমেশকে দেখে এসিজির তাই মনে হল।
ফিটফাট স্যুটেড-বুটেড স্মার্ট চেহারা। চোখে মেটাল ফ্রেমের ছোট্ট চশমা। মাথার চুল পাতলা হয়ে কপালটা বড় হয়ে গেছে, কিন্তু তাতে ব্যক্তিত্ব বেড়েছে বই কমেনি।
রমেশ শর্মার বয়েস খুব বেশি হলে চল্লিশের ওপাশে। তবে মুখে কেমন একটা বাচ্চা-বাচ্চা ভাব আছে। বেবিফেস বোধহয় একেই বলে!
‘মিস্টার রমেশ শর্মা, ডক্টর গুপ্ত’, বলল ইরিনা, ‘উনি মিস্টার চ্যাটার্জির সঙ্গে ট্র্যাভেল করছিলেন।’
রমেশকে এসিজির কাছে বসিয়ে ইরিনা চলে গেল।
এসিজি লক্ষ করলেন, রমেশ মাঝে-মাঝেই নার্ভাসভাবে গালে হাত বোলাচ্ছে।
এসিজি চুপ করে বসে রইলেন। রমেশের টেনশনকে বেড়ে ওঠার সময় দিলেন। দেখা যাক ও কী বলে!
অনেকগুলো সেকেন্ড-মিনিট পার হয়ে যাওয়ার পর রমেশ আর থাকতে পারল না। ইতস্তত করে বলল, ‘শেষ পর্যন্ত মিস্টার চ্যাটার্জি মার্ডার্ড হলেন…।’
‘আপনি জানলেন কী করে?’ সঙ্গে-সঙ্গে তির ছুড়লেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত।
‘আমি জানলাম মানে…শ্রাবণী…মানে, মিস চ্যাটার্জি আমাকে বললেন। ভেরি স্যাড।’
‘স্যাড তো বটেই—ব্যাডও।’ বললেন এসিজি, ‘কে ওঁকে খুন করতে পারে? কাউকে সন্দেহ হয় আপনার? এনি আইডিয়া?’
হাত আর ঠোঁট একসঙ্গে ওলটাল রমেশ : ‘কী করে বলব! তবে যার মনে রাগ আছে, লোভ আছে, সে-ই এমন কাজ করতে পারে। কীভাবে মার্ডার্ড হয়েছেন স্যার? মিস চ্যাটার্জি বলছিল—মানে, বলছিলেন, বুলেট-ফুলেট কিচ্ছু। কিন্তু আমি ভাবছিলাম, মার্ডারার এয়ারপোর্ট সিকিওরিটির এক্স-রে আইকে ফাঁকি দিয়ে একটা রিভলভার কী করে স্মাগল করে নিয়ে আসবে। দ্যাটস আ ভেরি টাফ ডিল, ইজনট ইট?’
মাথা নেড়ে সায় দিলেন এসিজি : ‘ঠিকই বলেছেন। এই পয়েন্টটা আমাকে গোড়া থেকেই ডিসটার্ব করছে।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রমেশ, বলল, ‘মিস্টার চ্যাটার্জিকে মার্ডার করার কোনও দরকার ছিল না। এমনিতে বয়েস হয়েছিল…তার ওপর অসুস্থ ছিলেন…।’
‘ষাট-বাষট্টি আর এমনকী বয়েস! তবে অসুখ-বিসুখ থাকলে…কী অসুখের কথা বলছেন আপনি?’
‘অ্যাজমা। টান ধরলে স্যারের ভীষণ ব্রিদিং প্রবলেম হত। আর যখন খুব টেনশান বাড়ত…বুঝতেই পারছেন, কোটি-কোটি টাকার বিজনেস, টেনশান তো থাকবেই…ফলে তখনই টানটা বেড়ে যেত। ওঁর সঙ্গে তো খুব ক্লোজলি কাজ করছি, তাই ব্যাপারটা জানি।’
‘উনি আপনার কোলিগের মতো ছিলেন, কী বলেন?’
‘কোলিগ!’ সরাসরি এসিজির চোখে তাকাল রমেশ, বিষণ্ণ হেসে বলল, ‘উনি আমার বস ছিলেন। সেটা উনি সবাইকে সবসময় মনে করিয়ে দিতেন—কিছুতেই আমরা ভুলতে পারতাম না যে, মিস্টার চ্যাটার্জি আমাদের ভাগ্যবিধাতা, অন্নদাতা…অবশ্য ওঁর মন বেশ উদার ছিল…কারণে-অকারণে আমাদের বাড়তি টাকাপয়সা দিতেন। কিন্তু ওই যে বললাম, ওঁর কথাই ছিল শেষ কথা—এটা কোম্পানির দারোয়ান থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত সবাইকে উনি সমানভাবে বুঝিয়ে দিতেন। আপনার ওপরে কোনও কারণে বিরক্ত হলেই চাকরি থেকে ছুটি—আপনি ওঁর কোম্পানিতে কতবছর কাজ করেছেন, কত কী স্যাক্রিফাইস করেছেন সেসব তখন আর মাথায় থাকত না।’
এসিজি বেশ অবাক হচ্ছিলেন। মেঘ না চাইতেই জল! এক্সাইট করার আগেই ইমোশন্যাল পোটেনশিয়ালের প্রদর্শনী! রমেশ শর্মার কথায় বেশ তেতো ভাব টের পাওয়া যাচ্ছিল।
‘আপনাকে কখনও জবাব দিতে চেয়েছিলেন না কি?’
