‘আপনার নাম কি ব্রজেন দাস?’
এসিজির প্রশ্নে পলকে সব ছটফটানি থেমে গেল। বৃদ্ধের দিকে সন্দেহের ঠান্ডা চোখে তাকাল ব্রজেন : ‘আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?’
ডক্টর দে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এসিজি হাত তুলে ওঁকে ক্ষান্ত করলেন। তারপর মোলায়েমভাবে হেসে ব্রজেনকে বললেন, ‘উত্তেজিত হবেন না, ব্রজেনবাবু। এখানে এসে ঠান্ডা হয়ে বসুন, সব বলছি…।’
ব্রজেন দাস এসিজির অনুরোধ মেনে নিল। এসিজিদের কাজের জায়গায় একটা সিট বেছে নিয়ে বসে পড়ল। ওর নজর কিন্তু বারবার ছিটকে যাচ্ছিল টয়লেটের কাছে পলিথিন শিট ঢাকা দেওয়া ডেডবডিটার দিকে। বোধহয় ভাবছিল, মেঝেতে ওটা কী ঢাকা দেওয়া রয়েছে!
হঠাৎ অশোকচন্দ্রের দিকে ঘুরে তাকিয়ে ব্রজেন বলে উঠল, ‘স্যার কোথায়? স্যারের কী হয়েছে?’
ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বেশ ধীরে-ধীরে সময় নিয়ে এসিজি টয়লেট স্পেসের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘ওই পলিথিন শিটের নীচে আপনার স্যারের ডেডবডি আছে। ওঁকে কেউ খুন করেছে।’
‘খুন!’ তড়াক করে দাঁড়িয়ে উঠল ব্রজেন। ওর হাত সামান্য কাঁপছিল, ‘কী করে হল এসব? কে খুন করল স্যারকে? আমি স্যারকে একবার দেখব…প্লিজ…।’
এসিজি ভবানীপ্রসাদকে ইশারা করলেন। তারপর ব্রজেনকে বললেন, ‘আপনি যান, স্যারকে শেষ দেখা দেখে আসুন। ডক্টর দে আপনাকে বডি দেখাবেন।’
ব্রজেন ডক্টর দে-র সঙ্গে পা বাড়াল।
ইরিনা চুপ করে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে এসিজি নিচু গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘ব্রজেন দাস মিস্টার চ্যাটার্জির ব্যাপারটা জানল কী করে?’
হাতের নখ খুঁটতে-খুঁটতে ইরিনা বলল, ‘হয়তো আমার দোষে জেনেছেন। আমি আর সাবরিনা ব্যাপারটা ডিসকাস করছিলাম, তখন এই ভদ্রলোক আমাদের পাশ দিয়ে ইকনমি ক্লাসের টয়লেটে যাচ্ছিলেন। তখনই ওভারহিয়ার করেছেন।’
‘ঠিক আছে,’ বলে ঘাড় নেমে ইরিনাকে বিদায় দিলেন বৃদ্ধ।
আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ব্রজেন দাস চোখ মুছতে-মুছতে ফিরে এল এসিজির কাছে। কান্না-ভাঙা গলায় বলল, ‘স্যারই যখন আর নেই তখন আমার আর বেঁচে থেকে কী হবে! কোন হতভাগ্য আমার দেবতার মতো স্যারকে এইভাবে খতম করল! এবার আমার কী হবে? কোথায় যাব আমি?’
এসিজির ইশারায় রঙ্গলাল গোস্বামী ব্রজেন দাসের কাছে এলেন। ওকে ধরে যত্ন করে একটা সিটে বসিয়ে দিয়ে বললেন, ‘খুনি ধরতে ভাই/ আপনার হেলপ চাই। খুনির পেলে পাত্তা/ জুড়োবে স্যারের আত্মা।’
ব্রজেন দাস পলকে শোক ভুলে কবিমানুষটির দিকে এমনভাবে তাকাল যে, মনে হল স্যারের মৃত্যুর শকের চেয়ে রঙ্গলালের কবিতা ওকে আরও বেশি শক দিয়েছে। কিন্তু রঙ্গলাল অবিচলিতভাবে আকর্ণ হেসে একটা সিটে গিয়ে বসে পড়লেন।
‘মিস্টার দাস, আপনি জানলেন কী করে যে, মিস্টার চ্যাটার্জির বিপদ হয়েছে?’ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে এসিজি জিগ্যেস করলেন।
ব্রজেন দাস চোখ মুছে ইরিনার কথাটাই বলল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘স্যারের সারা মুখে-বুকে এত রক্ত কেন? কীভাবে খুন হয়েছেন স্যার?’
‘আমরা তো সেটাই জানার চেষ্টা করছি।’ এসিজি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন্তব্য করলেন, ‘আপনি ওঁর কাছে কাজ করছেন কতদিন?’
‘তা চারবছরের বেশি হবে।’
‘ঠিক কী ধরনের কাজ করতেন একটু বলবেন?’
‘সবরকম। টাই বেঁধে দেওয়া, জুতোর ফিতে বাঁধা, গাড়ি চালানো, টুকটাক এটা-সেটা সারিয়ে দেওয়া, এমনকী দরকার পড়লে স্যারকে রান্না করেও খাওয়াতাম। স্যার একবার ”ব্রজ” বলে হাঁক দিলেই হল—আমি সটান গিয়ে হাজির হতাম। আমি বলতে গেলে স্যারের ছায়া ছিলাম—এখন আমার কপালে কী আছে কে জানে!’
‘শুনলাম, গত সপ্তাহে আপনি মিস্টার চ্যাটার্জির কর্ডলেস ফোন সারিয়ে দিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ। তবে শুধু কর্ডলেস কেন, আমি স্যারের টেপ-ডেক সারিয়েছি, স্যারকে একটা এফ. এম. ট্রানজিস্টার রেডিয়ো বানিয়ে দিয়েছি…।’
‘একজন সাধারণ কাজের লোকের পক্ষে এসব সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির কাজ জানাটা একটু আনকমন—মানে সাধারণত দেখা যায় না, তাই না?’
হাসল ব্রজেন। মাথার তেল-চকচকে চুলে হাত বুলিয়ে বলল, ‘আমি সাধারণ কাজের লোক এটা আপনাকে কে বলল? দিদি?’
‘দিদি মানে?’
‘শ্রাবণীদি—স্যারের বোন।’
‘না-না, উনি কিছু বলেননি। উনি আপনার খুবই প্রশংসা করেছেন।’ ব্রজেনের ইমোশন্যাল পোটেনশিয়ালটা পরখ করবেন বলে এসিজি একটু মিথ্যে বললেন।
‘হুঁঃ—’ তেতো হাসল ব্রজেন : ‘স্যার আমাকে যেরকম বিশ্বাস করতেন, দিদি সেরকম করেন না। কী আর করা যাবে! সবার তো মন রাখা সম্ভব নয়!’
‘আপনি মাইনে কীরকম পান?’
‘সেটা কি বলতেই হবে?’ এসিজির দিকে বিদ্রোহী চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল ব্রজেন।
‘ঠিক আছে, বলতে হবে না। আপনার স্যারের কোনও শত্রু ছিল?’
‘বড়লোকদের শত্রু থাকবে না এ কখনও হয়! বরং বলতে পারেন স্যারের চারপাশে প্রচুর শত্রু কিলবিল করত। তবে হ্যাঁ, তারা কেউ থাকত বন্ধুর ছদ্মবেশে, আর কেউ-বা ছিল কর্মচারীর ছদ্মবেশে।’
কথাটায় একটা ইঙ্গিত ছিল। এসিজি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেই ইঙ্গিতটাই ধরার চেষ্টা করলেন।
‘আপনি কতদূর পড়াশোনা করেছেন, ব্রজেনবাবু?’
মাথা নিচু করল ব্রজেন, আলতো করে বলল, ‘আমি বি. এসসি. পাশ।’ তারপর একটু সময় নিয়ে বলল, ‘কী করব বলুন! বহু চেষ্টা করেও তেমন কোনও চাকরি-বাকরি জোটেনি। তাই লজ্জা-টজ্জা ঝেড়ে ফেলে বড়লোকের চাকরের কাজ করছি—ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করছি। তো এখানে স্যারের কাছে বেশ ভালোই ছিলাম…।’
