এমনসময় কুমারমঙ্গলম এসিজিদের কাছে এল। ক্যাপ্টেনের নির্দেশ থাকায় বেচারি দূর থেকেই ইশারায় কাছে আসার অনুমতি চেয়েছে। এসিজি ঘাড় নেড়ে সায় দিতেই ও চটপট করে চলে এসেছে ভবানীপ্রসাদের কাছে। ঝুঁকে পড়ে ডক্টর দে-র কানে-কানে কী যেন বলে কুমারমঙ্গলম চলে গেল।
অশোকচন্দ্র প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন ভবানীপ্রসাদের দিকে।
ভবানীপ্রসাদ একবার শ্রাবণীর দিকে দেখে নিয়ে এসিজিকে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন জিগ্যেস করছেন, আইডেন্টিফিকেশান যখন হয়ে গেছে তখন ওঁদের ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল কিট নিয়ে আমি বডিটা যতটা সম্ভব থরো চেকআপ করে একটা রিপোর্ট লিখে দেব কি না—তাতে ”আকাশ এয়ারলাইনস”-এর সুবিধে হবে। ওঁদের চেয়ারম্যান তাই চাইছেন—বলছেন, ইটস পার্ট অফ রুটিন প্রসিডিয়োর।’
‘আমিই সে-কথা আপনাকে বলব ভাবছিলাম। বুলেট যদি না হয় তা হলে মিস্টার চ্যাটার্জির মুখে কী হিট করল? আর অত মারাত্মক ইমপ্যাক্টের ফোর্স জিনিসটা পেল কোথা থেকে? তবে ডক্টর দে, কুড য়ু ওয়েট ফর আ ফিউ মিনিটস? মিস চ্যাটার্জিকে আমি এখুনি ছেড়ে দিচ্ছি…তারপর…।’
‘ও. কে.—আই ক্যান ওয়েট।’
‘তারপর, মিস চ্যাটার্জি?’ এসিজি শ্রাবণীর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন।
‘এরপর ব্রজেন দাস। ওকে কম্বাইড হ্যান্ড বলতে পারেন। অড জব ম্যান। সবরকমের কাজই একটু-একটু পারে। এই তো, লাস্ট উইকে আমাদের কর্ডলেস ফোনটা খারাপ হয়েছিল, ব্রজেন কীসব খুটখাট করে সেটা সারাই করে দিল। আমাদের বাড়ির টিউব লাইট কেটে গেলে সেটা পালটাতেও ব্রজেন, আবার ডাইনিং টেবিলের গ্রানাইট পাথরটা ঝকঝকে তকতকে করে রাখার ব্যাপারেও ব্রজেন। ওর ওপরে আমরা খুব ডিপেন্ডেন্ট। কিন্তু দাদা ওকে বাড়াবাড়িরকম আশকারা দিত, বিশ্বাসও করত। আমি মাঝে-মাঝেই দাদাকে অ্যালার্ট করতাম। বলতাম, ”বিশ্বাস করার একটা লিমিট আছে। তুমি কিন্তু সেটা প্রায়ই ভুলে যাও।” কিন্তু কে শোনে কার কথা!’
‘আর শাওনি রাঘবন?’
‘ও স্টেনো কাম টাইপিস্ট। বছরখানেক হল জয়েন করেছে। ওকে ঠিক বোঝা যায় না। তবে দাদা ওকে লাইক করত। ওকে তো এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ফ্লাই করাতে চেয়েছিল, আমি বারণ করেছি! সামান্য একটা দু-পয়সার স্টেনো-টাইপিস্ট—সে চড়বে এক্সিকিউটিভ ক্লাসে! প্লেনে চড়ছে তাই না কত! দাদার সেই এক প্রবলেম! ওকে ভীষণ স্নেহ করত। শাওনিও সেটা বুঝত—তাই ঢং করত। নাঃ, ডক্টর গুপ্ত, দাদার মিসহ্যাপের ব্যাপারে আমাকে যদি কাউকে সন্দেহ করতে বলেন সে ওই শাওনি রাঘবন। এবার আপনি ইনভেস্টিগেট করে দেখুন…। ক্যাপ্টেন আমাকে বলেছেন যে, উনি আপনার ওপরে খুব ডিপেন্ড করছেন…আপনাকে পুরো অথরিটি দিয়েছেন…।’
‘মিস চ্যাটার্জি, থ্যাঙ্ক য়ু সো মাচ।’
এসিজি উঠে দাঁড়ালেন। সেই সঙ্গে শ্রাবণীও।
রঙ্গলাল গোস্বামী কিছু একটা বলবেন-বলবেন করছিলেন। ওঁর উসখুসুনি দেখে অশোকচন্দ্র বললেন, ‘কিছু বলবেন, রঙ্গলালবাবু?’
বিনয়-গদগদ ঢঙে ঘাড় কাত করে রঙ্গলাল বললেন, ‘ম্যাডাম, একটা স্বভাব-কবিতা রচনা করেছি…অধমের অপরাধ নেবেন না…।’
এসিজি উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘বলুন, বলুন, রঙ্গলালবাবু—মিস চ্যাটার্জি কিছুই মনে করবেন না।’
‘বলি তা হলে?’ ঘাড় কাত করে জানতে চাইলেন রঙ্গলাল।
শ্রাবণী হেসে ঘাড় নাড়লেন : ‘স্বভাব-কবিতা! সেটা আবার কী! যা হোক, বলুন—।’
‘শ্রাবণী ও শাওনিতে দ্বন্দ্ব যথেষ্ট/ একই নাম দুই রূপ কৃষ্ট ও খ্রিস্ট।’
শ্রাবণীর মুখটা পলকে অন্ধকার হয়ে গেল। কিন্তু তারপরই চট করে মেঘ সরিয়ে হেসে উঠে বললেন, ‘য়ু আর অ্যাজ অ্যামেজিং : অ্যাজ রিডিকিউলাস। লাইক য়ু।’ তারপর এসিজির দিকে তাকিয়ে : ‘দারুণ মজার মানুষ, তাই না?’
শ্রাবণী চ্যাটার্জি অহঙ্কারী পা ফেলে নিজের সিটের দিকে চলে গেলেন।
ডক্টর দে পরদা সরিয়ে টয়লেট কিউবিকলের সামনে এলেন। ভাবছিলেন ইরিনা কিংবা সাবরিনাকে বলবেন প্লেনের ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল কিটটা নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু ঠিক তখনই একটু চেঁচামেচি শোনা গেল যেন।
এসিজি, রঙ্গলাল এবং ভবানীপ্রসাদ—তিনজনেই শব্দ লক্ষ করে চোখ ফেরালেন। দেখলেন, ইরিনা এবং একজন যুবক কথা-কাটাকাটি করতে-করতে এক্সিকিউটিভ ক্লাসের টয়লেট স্পেসের সামনে চলে এসেছে।
ইরিনা ছেলেটিকে আটকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সে নাছোড়বান্দা।
‘বলছি তো, আমি স্যারের বাড়ির কাজের লোক। স্যারের বিপদ শুনলে আমাকে তো ছুটে আসতেই হবে। আমাকে এভাবে…।’ বেশ গলা চড়িয়েই কথা বলছিল ছেলেটি।
‘আপনি ব্যাপারটা বুঝতে চাইছেন না, স্যার। এটা এক্সিকিউটিভ ক্লাস। আপনি ইকনমি ক্লাসের টিকিট নিয়ে এখানে আসতে পারেন না।’
‘বিপদের সময় আবার ক্লাস কী!’ একরকম তেড়ে উঠে বলল ছেলেটি, ‘আমার স্যারের—মানে, মিস্টার মদনমোহন চ্যাটার্জির যদি কিছু হয়ে থাকে তা হলে আমাকে অ্যালাউ করতেই হবে, দিদি।’
এয়ারহোস্টেসকে দিদি!
এই ডাক শুনে ইরিনা আর থাকতে পারল না—ঠোঁট টিপে হেসে ফেলল। আড়চোখে তাকাল এসিজির দিকে : কী করা যায় এখন?’
এসিজি চট করে ব্রজেন দাসের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
মদনমোহন চ্যাটার্জির বাড়ির কাজের লোক হলেও ব্রজেনকে কাজের লোক বলে ঠাহর করা মুশকিল।
লম্বা ফরসা চেহারা। কাটা-কাটা মুখ-চোখ। তেল মাখানো চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। নাকের নীচে পুরু গোঁফ। চোখের তারা বেশ চঞ্চল। গায়ে সাদা ফুলহাতা শার্ট, তার ওপরে ছাই আর কালো রঙের ডোরাকাটা হাফ সোয়েটার। প্যান্টের রং হালকা নীল—তবে সামান্য ময়লা।
