‘মিস্টার চ্যাটার্জির ওয়ার্থ কত ছিল?’ শ্রাবণীর পাশের সিটটায় বসে অশোকচন্দ্র প্রথম প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন।
‘ওয়ার্থ মানে?’ ক্লান্ত গলায় জানতে চাইলেন শ্রাবণী।
‘মানে, স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ওঁর সম্পত্তি কীরকম দাঁড়াবে?’
বিষণ্ণভাবে হাসলেন শ্রাবণী, অনেকটা আপনমনেই বললেন, ‘ঠিক জানি না, তবে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা তো হবেই। টাকার নেশা দাদাকে পাগল করে দিয়েছিল। টাকার পেছনে ছুটতে কী ভালোবাসত! আমি বাড়াবাড়িরকম ঝামেলা করলে দাদা বলত, ”শানু, কী করে তোকে বোঝাব এটা একটা দারুণ নেশা—অনেকটা মোটর রেসের মতো—থামলে কোনও মজা নেই, ছুটলেই বরং মজা।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত থামতে তো হলই! কী প্যাথেটিক…।’ গলা ভেঙে গেল শ্রাবণীর, চোখের কোণে জল এসে গেল। ব্যাগ থেকে ছোট্ট লেডিজ রুমাল বের করে চোখের কোণ মুছে নিলেন।
‘এখন…মানে, উনি চলে যাওয়ার পর…এই বিশাল সম্পত্তির মালিক কে হবেন?’
‘অনেকটাই আমার কপালে এসে জুটবে।’ তেতো গলায় শ্রাবণী বললেন, ‘কী করব আর বলুন…একেই বলে নিয়তি।’
‘কেন, আপনি সম্পত্তি ভালোবাসেন না?’
ধারালো চোখে তাকালেন এসিজির দিকে : ‘ভালোবাসি অবশ্যই—তবে দাদার জীবনের বদলে নয়।’
এসিজি বেশ বুঝতে পারছিলেন, শ্রাবণী চ্যাটার্জির ইমোশানের পোটেনশিয়াল ক্রমেই চড়ছে। সত্যি, মানুষের ভেতরকার আবেগগুলো অনেকটা ইলেকট্রিক পোটেনশিয়ালের মতো। বাড়তে-বাড়তে হঠাৎই বাজ পড়ার ঢঙে ডিসচার্জ করে যায়। তখন বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো মনের খুব গভীরের ভাবনাগুলো চট করে বেরিয়ে আসে। মানুষটাকে ঠিকঠাক চেনা যায়।
দাদাকে সত্যিই কি এতটাই ভালোবাসতেন ভদ্রমহিলা!
‘আপনি ছাড়া মিস্টার চ্যাটার্জির ফ্যামিলি বলতে আর কারা আছেন?’
‘আমি ছাড়া দাদার আর কেউ ছিল না…কেউ না। তেমনি আমারও যা কিছু ছিল দাদা। এখন…এখন আমি একা হয়ে গেলাম। একেবারে একা…।’
কথা বলতে-বলতে শ্রাবণীর চোখের পাতা ভারী হয়ে গিয়েছিল, সেইসঙ্গে গলাও। রুমালটা আর-একবার ব্যবহার করলেন তিনি।
এসিজি ওঁকে বেশ খুঁটিয়ে জরিপ করছিলেন। ওঁর মনে হল, দুঃখটা মিথ্যে নয়।
শ্রাবণীকে একটু সময় দিয়ে তারপর কিছু একটা জিগ্যেস করতে যাবেন, অলিপথের ওপারের একটা সিটে বসেছিলেন ডক্টর দে—তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কেন, ম্যাডাম, মিস্টার চ্যাটার্জি তো ম্যারেড ছিলেন—ওঁর ওয়াইফকে আমি দেখেছি…।’
ডক্টর দে-র দিকে তাকালেন শ্রাবণী : ‘দেখতেই পারেন—দাদার সঙ্গে বহু প্রোগ্রামেই বউদি যেত—কাগজেও একবার ছবি বেরিয়েছিল। তবে সবই ছ-বছর আগের কথা। নাইনটি সেভেনে বউদি সেরিব্রাল অ্যাটাকে মারা গেছে। তারপর দাদা আর বিয়ে করেনি—যদিও আমি বহুবার দাদাকে রিকোয়েস্ট করেছি। আর…’ এসিজির দিকে চোখ ফেরালেন শ্রাবণী : ‘দাদা-বউদির কোনও ইস্যু ছিল না।’
তারপর ভবানীপ্রসাদের দিকে তাকালেন : ‘বউদিকে আপনি কোথায় দেখেছিলেন? কোনও অনুষ্ঠানে?’
‘না, আপনাদের বালিগঞ্জের বাড়িতে…প্রায় বছরদশেক আগে। মিস্টার চ্যাটার্জির অ্যাজমার প্রবলেম ছিল। আমি ওঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। তখন অবশ্য আপনাকে দেখিনি।’
‘না, আমি তখন ও-বাড়িতে থাকতাম না।’ ঠোঁট টিপে বললেন শ্রাবণী। তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে দিলেন : ‘ঠিকই বলেছেন, দাদার হাঁপানির প্রবলেমটা ভীষণ ভোগাত। বয়েসের সঙ্গে-সঙ্গে ওটা খুব বেড়ে গিয়েছিল।’
এরপর কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ।
অশোকচন্দ্র গুপ্ত অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিলেন। এবার মুখ খুললেন।
‘যদি কিছু মাইন্ড না করেন তাহলে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব, ম্যাডাম?’
ভুরু কুঁচকে এসিজির দিকে তাকালেন শ্রাবণী। এসিজি দেখলেন, সত্যি, ওঁর চোখদুটোর একফোঁটা বয়েস বাড়েনি।
শ্রাবণী বললেন, ‘দাদার এই ব্রুটাল মার্ডার কেসটা সলভ করার জন্যে যদি পার্সোনাল প্রশ্ন করাটা জরুরি হয় তা হলে অবশ্যই করবেন। আই ওন্ট মাইন্ড।’
‘আপনি বিয়ে করেননি কেন?’ প্রশ্নটা করেই হাত তুলে ইশারা করলেন এসিজি : ‘ম্যাডাম, ইচ্ছে করলে আপনি জবাব না-ও দিতে পারেন।’
‘না, সেরকম কিছু নয়।’ মাথা সামান্য নিচু করলেন শ্রাবণী : ‘বিয়ে করেছিলাম। ওই যে, ডক্টর দে যখন দাদাকে চেক-আপ করতে গিয়েছিলেন, তখন আমি হাজব্যান্ডের সঙ্গে সল্টলেকে থাকতাম। পরে…পরে বিয়েটা নষ্ট হয়ে যায়…।’
‘সরি ম্যাডাম।’ ছোট্ট করে বললেন অশোকচন্দ্র।
‘না, ঠিক আছে।’ মুখ তুলে তাকালেন শ্রাবণী চ্যাটার্জি।
মাথা হেলিয়ে ঘাড়ে হাত বোলালেন এসিজি : ‘এবারে একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। মিস্টার চ্যাটার্জির সঙ্গে আপনারা মোট চারজন ট্র্যাভেল করছিলেন…আপনি ছাড়া বাকি তিনজন কে-কে একটু বলবেন…?’
শ্রাবণী রুমালটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে বললেন, ‘আমি ছাড়া রমেশ—রমেশ শর্মা, ব্রজেন দাস, আর শাওনি রাঘবন। রমেশ আমার সঙ্গে এক্সিকিউটিভ ক্লাসে আছে। আর বাকি দু’জন ইকনমি ক্লাসে।’
‘এদের একটু-আধটু ইনট্রো দিলে সুবিধে হয়…।’
‘রমেশ শর্মা লাস্ট পাঁচবছর ধরে দাদার পারসোনাল সেক্রেটারি। এমনিতে প্রায় দশবছর কাজ করছে দাদার কাছে। প্রথমে ”চ্যাটার্জি মাইনিং করপোরেশন”-এ—এম.পি-র কোরবাতে দাদার দুটো কপার মাইন আছে। শুনেছি ভালো প্রফিট হয়। সেখানে রমেশ জুনিয়ার ম্যানেজার ছিল। পরে দাদার ওকে ভালো লেগে যায়। তাই ওকে পার্সোনাল সেক্রেটারি করে নেয়। হি ইজ আ জেম অফ আ ওয়ার্কার। দিন-রাত কাজ করতে ভালোবাসে। এই তো, প্লেনে বসেই ব্রিফকেস খুলে দাদা কীসব কাগজপত্র বের করে রমেশের সঙ্গে ডিসকাস করছিল।’
