এসিজি উঠে দাঁড়িয়ে হাসলেন। শ্রাবণীর চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, একসময় এই চোখে তির ছিল। কত যুবক সেই তিরে বিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু আজ তুণ খালি—তবুও সোনার দিনটা আন্দাজ করা যায়। ‘না, মিস চ্যাটার্জি, কোনও সার্টিফিকেট আপনাকে দেখাতে হবে না। বরং আমরাই আপনার কাছে সার্টিফিকেট চাইছি।’ এসিজি নরম গলায় বললেন।
‘তার মানে!’
‘আপনি ডক্টর দে-র সঙ্গে ওই পরদার আড়ালে একবার যান। ওখানে একটা ডেডবডি আছে। প্লিজ, এর পরের কথাটা শুনে হঠাৎ করে যেন চেঁচিয়ে উঠবেন না—কারণ, অন্য প্যাসেঞ্জাররা এখনও জানে না, এই প্লেনে একটা মার্ডার হয়েছে। আপনি কাইন্ডলি গিয়ে আপনার দাদার ডেডবডিটা আইডেন্টিফাই করুন। হি প্রব্যাবলি হ্যাজ বিন শট ইন দ্য মাউথ।’
সঙ্গে-সঙ্গে শ্রাবণী একটা অদ্ভুত শব্দ করে টলে পড়ে গেলেন। ইরিনা সময়মতো ওঁকে ধরে না ফেললে হয়তো মাথায় কিংবা ঘাড়ে চোট লাগতে পারত।
ইরিনা শ্রাবণীকে একটা সিটে বসিয়ে দিল। তারপর ছুটে গিয়ে একগ্লাস জল নিয়ে এল।
ওর হাত থেকে জলের গ্লাসটা শ্রাবণীর চোখে-মুখে সামান্য ছিটিয়ে দিলেন এসিজি। ভবানীপ্রসাদ চটপট শ্রাবণীর বাঁ-হাতের কবজি চেপে ধরে পালস রেট মাপতে চাইলেন।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই শ্রাবণীর চেতনা ফিরে এল। ধীরে-ধীরে চোখ খুললেন। অশোকচন্দ্র ওঁর দিকে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘প্লিজ, একটু শক্ত হোন, ম্যাডাম। আপনার সামনে এখন অনেক কাজ। এসময়ে ভেঙে পড়বেন না।’
কয়েকবার চোখ পিটপিট করে শ্রাবণী বললেন, ‘সরি। ইট ওয়াজ আ গ্রেট শক। দাদাকে খুব ভালোবাসতাম আমি…’ সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিলেন : ‘ওয়েল, হু ডিড ইট?’
অশোকচন্দ্র ঘাড়ের কাছে হাত নিয়ে সাদা চুলের গোছায় টান মেরে বললেন, ‘সেটাই তো জানার চেষ্টা করছি, মিস চ্যাটার্জি।’
‘আপনি কি পুলিশের লোক নাকি? সন্দেহে ভুরু কুঁচকে গেল ম্যাডামের।
এসিজি কিছু বলে ওঠার আগে ভবানীপ্রসাদ গলাখাঁকারি দিলেন। তারপর শ্রাবণীর কাছে এসে হেসে বললেন, ‘ইনি ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত—দ্য গ্রেট ইনভেস্টিগেটর। থিঙ্কিং মেশিন। দ্য বেস্ট ইন দ্য গেম।’
এসিজি এত প্রশংসার ওজন সামলাতে মাথা নিচু করলেন।
শ্রাবণী চ্যাটার্জির ভুরু কুঁচকেই ছিল। এবার ঠোঁটের কোণাটা সামান্য বেঁকে গেল : ‘য়ু মিন ডিটেকটিভ?’
‘হ্যাঁ, ম্যাডাম, আমি একজন হুনুর—হুনুরি করে আনন্দ পাই।’ এসিজি অপ্রস্তুভাবে হেসে বললেন, ‘যাঁকে সহজ কথায় বলে গোয়েন্দা…।’
বেশ কিছুক্ষণ ধরে এসিজিকে খুঁটিয়ে দেখলেন শ্রাবণী। তারপর বেশ অবাক হয়ে বললেন, ‘ডিটেকটিভ? আপনি? দেখে তো মনেই হয় না!’
‘ওটা আমার ছদ্মবেশ, ম্যাডাম।’ হাত নেড়ে একটা ভঙ্গি করে এসিজি বললেন, ‘আসলে কী জানেন? চেহারা আমার শার্লক হোমসের মতো নয়—সেরকম করে পাইপ টানতেও পারি না। এরকুল পোয়ারের মতো মোমের পালিশ দেওয়া ছুঁচলো গোঁফ আমার নেই। দেবেন্দ্রবিজয়, হুকা-কাশি, রবার্ট ব্লেক কিংবা ব্যোমকেশের মতো প্রতিভা আমার নেই। কোনও ক্যারিশমা নেই—আমার মাথার পেছন থেকে জ্যোতি বেরোয় না।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এসিজি : ‘তবে আমার মতো গোয়েন্দা—রিয়েল লাইফ ডিটেকটিভরা—জোড়াতালি দিয়ে যা-হোক করে কাজ চালিয়ে নেয়। মানে, শেষ পর্যন্ত খুনিকে ধরে ফ্যালে। ইন সিম্পল টার্মস, উই আর এফেক্টিভ।
‘অনেক সময় নষ্ট হয়েছে, ম্যাডাম, আর নয়। প্লিজ, দাদার বডিটা আইডেন্টিফাই করে আপনি জলদি এখানে চলে আসুন। আই নিড ইয়োর হেলপ। ডক্টর দে, আপনি মিস চ্যাটার্জির সঙ্গে যান।’ কথা শেষ করে ইরিনাকেও সঙ্গে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন এসিজি। যদি ডেডবডি দেখে শ্রাবণী আবার অজ্ঞান-টগগান হয়ে যান!
ওঁরা তিনজন চলে গেলেন।
রঙ্গলাল অশোকচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসিজি স্যার, আমার কিন্তু শ্রাবণী চ্যাটার্জিকে সন্দেহ হয়।’
চোয়ালে আলতো টোকা মারতে-মারতে এসিজি বললেন, ‘সন্দেহ হয় খুব ভালো কথা। এবারে বলুন তো, মিস চ্যাটার্জি ওঁর দাদাকে কীভাবে খুন করলেন?’
কাঁচুমাচু মুখ করে রঙ্গলাল বললেন, ‘সে কি ছাই জানি? ওটা বের করবেন আপনি।’
অশোকচন্দ্র এই ছড়া-কাটা উত্তর শুনে মোটেই হাসলেন না। শুধু আপনমনে বিড়বিড় করে বললেন, ‘প্রথমে বুঝতে হবে হাউ, তারপর হোয়াই, আর সবশেষে হু।’
‘তার মানে?’
‘মানে তো সিম্পল! প্রথমে বুঝতে হবে ঠিক কীভাবে মদনমোহন চ্যাটার্জি খুন হলেন—হাউ। তারপর বের করতে হবে, কেন উনি খুন হলেন—হোয়াই। এ-দুটো প্রশ্নের উত্তর জানতে পারলেই শেষ প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া যাবে : কে ওঁকে খুন করেছে—হু।’
ফ্যাকাসে মুখে শ্রাবণী চ্যাটার্জি ফিরে এলেন। ওঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, বয়েস অনেকটা বেড়ে গেছে। ইরিনা ওঁকে ধরে-ধরে নিয়ে আসছিল।
অশোকচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে ভবানীপ্রসাদ ইশারা করে বোঝালেন, ঠিকঠাকভাবে আইডেন্টিফিকেশানের ব্যাপারটা মিলে গেছে।
শ্রাবণীকে একটা সিটে বসিয়ে দিয়ে ইরিনা চলে গেল। প্লেনের ক্রুদের সেরকমই নির্দেশ দিয়েছেন ক্যাপ্টেন সুখানি : জিজ্ঞাসাবাদের সময় কেউই এসিজির কাছে থাকবে না—অবশ্য যদি এসিজি কাউকে ডেকে পাঠান তা হলে আলাদা কথা।
সুতরাং এসিজি, ভবানীপ্রসাদ, আর রঙ্গলাল ছাড়া শ্রাবণীর সামনে আর কেউ নেই।
