ক্যাপ্টেন চট করে এগিয়ে গেলেন পরদার কাছে। পরদা সরিয়ে উঁকি মারতেই সাবরিনাকে দেখতে পেলেন। ওকে ইশারায় ডাকলেন।
সাবরিনা আসতেই রঙ্গলালকে বললেন, ‘আপনি কাইন্ডলি হোস্টেসের সঙ্গে যান। যতটা ইনকন্সপিকুয়াসলি পারেন ওই দু’জন প্যাসেঞ্জারকে চিনিয়ে দিন…।’
‘ইনকন…কী বললেন?’ রঙ্গলাল প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন ক্যাপ্টেনের চোখে।
এসিজি হেসে রঙ্গলালকে বললেন, ‘এমনভাবে চেনাবেন যেন কেউ বুঝতে না পারে।’
ওঁরা দু’জন চলে যেতেই এসিজি ক্যাপ্টেনকে বললেন, ‘মিস্টার চ্যাটার্জির বোনের সঙ্গে প্রথম কথা বলা যাক। উনি তো শুনলাম বেশ অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। তা ছাড়া, ডেডবডির ফরমাল আইডেন্টিফিকেশানটা এখন করিয়ে নেওয়া যেতে পারে।’
এমনসময় কুমারমঙ্গলম ফিরে এল। বলল যে, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এক্সিকিউটিভ ক্লাসে একটা কর্নার স্পেসে বসে ডক্টর গুপ্ত সকলের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তবে প্যাসেঞ্জাররা বেশ রেস্টলেস হয়ে পড়েছে একজন রেগুলার প্যাসেঞ্জার তো বলেই বসেছে, প্লেন হঠাৎ কোর্স চেঞ্জ করে ভাইজাগের দিকে যে যাচ্ছে তার আসল কারণটা কী? সত্যিই কোনও টেকনিক্যাল প্রবলেম, নাকি অন্য কিছু? কুমারমঙ্গলম তাকে যতটা সম্ভব বুঝিয়ে-টুঝিয়ে শান্ত করেছে।
ক্যাপ্টেন কুমারমঙ্গলমকে বললেন, ‘ডক্টর গুপ্তদের কাজের সময় প্যাসেঞ্জাররা এদিক-ওদিক চলে-ফিরে বেড়ালে প্রবলেম হবে। আপনি ইরিনাকে বলুন পি. এস. সিস্টেমে অ্যানাউন্স করে দিক, সব প্যাসেঞ্জার যেন নিজের-নিজের সিটে বসে সিট বেল্ট বেঁধে নেয়। কারণ, আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই টারবুলেন্স আশা করছি। একে তো কুয়াশার জন্যে ফ্লাইট লেট হয়েছে, ফলে প্যাসেঞ্জাররা ধরে নেবে আজ প্রকৃতি আমাদের সঙ্গে নেই।’ ডক্টর গুপ্তর দিকে তাকালেন ক্যাপ্টেন সুখানি : ‘এবার তা হলে মিস চ্যাটার্জিকে খবর দেওয়া যাক?’
সায় দিয়ে ঘাড় নাড়লেন এসিজি। ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে ক্যাপ্টেনের মনে হল বৃদ্ধ হুনুরের মন পড়ে আছে অন্য কোথাও—গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছেন তিনি।
কুমারমঙ্গলমকে ইশারায় নির্দেশ দিলেন ক্যাপ্টেন। অর্থাৎ মিস চ্যাটার্জিকে পাঠিয়ে দিন।
কুমারমঙ্গলম ব্যস্তভাবে চলে গেল।
ক্যাপ্টেন ভুরু উঁচিয়ে তাকালেন এসিজির দিকে। পুরোনো প্রশ্নটাই করলেন আবার : ‘কী বুঝছেন, ডক্টর গুপ্ত? হু কুড বি দ্য পসিবল কিলার? মিস্টার চ্যাটার্জির চেনা-জানা কেউ? না কি…।’
উত্তরে হাসলেন অশোকচন্দ্র : ‘এখনই কিছু বলা অসম্ভব। তবে, ক্যাপ্টেন, আপনার প্লেন চালানোর যেমন কিছু রুলস আছে, থিয়োরি আছে, ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশানেও ঠিক তাই। যারা সাসপেক্ট তাদের মধ্যে একজনকে খুঁজে বের করুন যার খুন করার উদ্দেশ্য আছে, সুযোগ আছে, আর সাহস আছে…।’
‘ইজ ইট সো?’ মজা করে জিগ্যেস করলেন অর্জন সুখানি।
‘ইয়েজ, ক্যাপ্টেন—মোটিভ, অপারচুনিটি অ্যান্ড গাটস—দ্য রুল অফ থ্রি ফর আ কিলিং।’
‘উইশ য়ু অল দ্য বেস্ট, ডক্টর। আমি ফ্লাইট ডেক-এ যাচ্ছি। কিপ মি ইনফরমড অফ এনি ডেভেলাপমেন্টস।’
ইরিনার সঙ্গে যে-ভদ্রমহিলা এসিজিদের কাছে এলেন ওঁকে দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল উনি যথেষ্ট বড়লোক এবং বিরক্ত।
বয়েস পঁয়তাল্লিশ পেরোলেও মেকাপ সেটাকে প্রাণপণে পিছনদিকে টানছে। ছিপছিপে ফরসা চেহারা, পানপাতার মতো মুখ। বয়েসে সুন্দরী ছিলেন অবশ্যই—ফলে এখনও যে কেন মিস থেকে গেছেন সেটাই আশ্চর্যের।
ভদ্রমহিলার কপালে টিপ, চোখের পাতায় মাসকারা, চোখের ঢাকনায় আইলাইনার, আরও কত কী! ওঁকে ঘিরে থাকা পারফিউমের হালকা গন্ধ মনটা ভালো করে দিচ্ছিল। পরনে সোনালি পাড়ের এক অদ্ভুত রঙের শাড়ি—যেন কেউ স্প্রে করে কয়েকটা আবছা রং মোলায়েমভাবে শাড়িতে বুলিয়ে দিয়েছে। আর কাঁধ থেকে ঝুলছে একটা কালো চকচকে শৌখিন লেডিজ ব্যাগ। ভদ্রমহিলার পোশাক দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এখন শীতকাল।
ওঁর শরীরে গয়না বলতে মাত্র তিনটি। হাতে আংটি এবং ব্রেসলেট। আর গলায় সরু সোনার চেনে বসানো লকেট। তবে তিনটে গয়নাতেই যথেচ্ছভাবে হিরে বসানো।
এসিজি জোরে নাক টানলেন। হয়তো পারফিউমের গন্ধ ছাপিয়ে টাকার গন্ধ পাওয়া যায় কি না দেখতে চাইছিলেন।
‘এসব কী শুনছি! দাদার নাকি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে! কোথায়, দাদা কোথায়? সেই কখন টয়লেটে গেছে! তখন থেকে এই অকর্মা মেয়েগুলোকে বলছি খোঁজ নিতে। কী করে যে এরা হোস্টেসের চাকরি পায় কে জানে! হোপলেস! এদিকে সিটে বসে আমি আর রমেশ দুশ্চিন্তায় মরছি—সেদিকে কারও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। আমি রমেশকে বললাম…।’
‘ম্যাডাম—’ ভদ্রমহিলার কথাপ্রপাতে বাধা দিলেন অশোকচন্দ্র : ‘আপনার নামটা প্লিজ আমাদের বলবেন—।’
এতক্ষণ ভদ্রমহিলা ভবানীপ্রসাদ দে-কে লক্ষ করে কথা বলছিলেন—হয়তো ওঁর কম বয়েসটাই তার কারণ। এখন চমকে ঘুরে তাকালেন পঁয়ষট্টি পেরোনো বৃদ্ধের দিকে। কয়েকপলক তাচ্ছিল্যের চোখে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন যেন ওঁর নাম না জানাটা এসিজির পক্ষে অপরাধ। তারপর বোধহয় এসিজির সাদা চুলের দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধকে ক্ষমা করতে পারলেন।
দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বললেন, ‘শ্রাবণী—শ্রাবণী চ্যাটার্জি। আমি মদনমোহন চ্যাটার্জির বোন। তার আবার সার্টিফিকেট দেখাতে হবে না কি!’
