ফ্লাইট ডেকের দিকে রওনা হওয়ার আগে ক্যাপ্টেন ডক্টর গুপ্তকে জিগ্যেস করলেন, ‘আমাদের এম.পি-র নামটা কী বললেন যেন?’
‘মিস্টার পরেশ সান্যাল। কিন্তু চেয়ারম্যানসাহেবকে এতসব কি বলার দরকার আছে?’
‘আছে। এম.পি-টেম.পি. শুনলে ওঁরা একটু বেশি ভরসা পান। আর আমি এখুনি অ্যানাউন্সমেন্টেরও ব্যবস্থা করছি। ধরে নিন, আমরা ভাইজাগের দিকে রওনা হয়ে গেছি। কুমারমঙ্গলমের দিকে তাকালেন ক্যাপ্টেন সুখানি : ‘কুমারমঙ্গলম, য়ু প্লিজ লুক আফটার দিস অড কাপল অফ ডক্টরস। ওঁরা যা-যা বলেন কো-অপারেট করুন। নাউ দে আর দ্য বস। আমি এক্ষুনি আমাদের চেয়ারম্যান মিস্টার সুরেশ ওয়ালিয়ার সঙ্গে কথা বলে সব ক্লিয়ারেন্স নিয়ে নিচ্ছি।’
তড়িঘড়ি পা ফেলে ক্যাপ্টেন অর্জন সুখানি পরদা সরিয়ে চলে গেলেন।
এসিজি ডক্টর দে-র দিকে ফিরে বললেন, ‘ডক্টর’ দে, আসুন, এবারে বডিটা সাবধানে বের করে ফেলা যাক।’
কুমারমঙ্গলম একেবারে হাঁ-হাঁ করে এসিজিকে বাধা দিল, বলল, ‘আপনি কেন হাত লাগাবেন, ডক্টর গুপ্ত! আপনি এপাশটায় দাঁড়ান…আমি আর ডক্টর দে ম্যানেজ করে নিচ্ছি।’
সরে এলেন এসিজি। হাসলেন মনে-মনে। এম.পি.-র নাম নেওয়ার অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে মনে হচ্ছে! এইসব নাম-টাম নেওয়া ওঁর অভ্যেস নয়। এখানে এরকম একটা ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন হয়েছে বলে বাধ্য হয়ে পরেশ সান্যালের নামটা বলতে হয়েছে। বছরতিনেক আগে মিস্টার সান্যালের একটা চুরি-যাওয়া সোনার হাতঘড়ি এসিজি উদ্ধার করে দিয়েছিলেন। সেই থেকেই পরিচয়টা গাঢ় হয়েছে।
এসিজি খেয়াল করেননি, কখন যেন রঙ্গলাল ওঁর খুব কাছাকাছি চলে এসেছেন। ওঁর কানের কাছে মুখ এনে রঙ্গলাল যখন চাপা গলায় বললেন, ‘আকাশে মার্ডার/ প্রবলেম হার্ডার’, তখনই এসিজি ওঁকে খেয়াল করলেন। এবং হেসে ফেললেন।
মিনিট-পনেরোর মধ্যেই অর্জন সুখানি ব্যস্তসমস্ত ভঙ্গিতে এলেন। ততক্ষণে মদনমোহন চ্যাটার্জির দেহটা টয়লেট স্পেস থেকে বের করে বাইরে মেঝেতে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং ভবানীপ্রসাদ দে ওঁর প্রাথমিক পরীক্ষা সেরে ফেলেছেন।
পরীক্ষা করে এসিজির সঙ্গে একমত হয়েছেন ভবানীপ্রসাদ। পিস্তল কিংবা রিভলবার, যা-ই ব্যবহার করা হয়ে থাকুক না কেন, সেটা ফায়ার করা হয়েছে মুখের মধ্যে নল ঢুকিয়ে। এবং মৃত্যু হয়েছে তৎক্ষণাৎ।
অর্জন সুখানি ডেডবডির দিকে একবার তাকালেন। তারপর এসিজির মনোযোগ পাওয়ার আশায় ছোট্ট করে বারদুয়েক কাশলেন।
এসিজি কপালে ভাঁজ ফেলে মুখ তুলে তাকালেন ক্যাপ্টেনের দিকে।
‘ডক্টর গুপ্ত, আমাদের চেয়ারম্যানকে গোটা ব্যাপারটা জানিয়েছি। উনি আপনাকে এই কেসটা ইনভেস্টিগেট করার পুরো অথরিটি দিয়েছেন। মনে হয়, মিস্টার পরেশ সান্যালের সঙ্গে ওঁর পরিচয় আছে—কারণ, উনি মিস্টার সান্যালের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেছেন। আমরা আশা করছি, ভাইজাগেই ব্যাপারটা মিটে যাবে। তখন লোকাল অথরিটির কাছে কেসটা হ্যান্ডওভার করে দিতে হবে। মিস্টার ওয়ালিয়ার কথা মনে হল, হি ইজ কনভিন্সড অ্যান্ড ইমপ্রেসড অ্যাবাউট ইয়োর এবিলিটি। হয়তো মিস্টার সান্যাল কিছু বলে থাকবেন। ওয়েল…’ দু-পাশে হাত ছড়িয়ে বললেন ক্যাপ্টেন, ‘নাউ ইটস ইয়োর গেম।’
‘আমাদের প্লেন এখন তা হলে বিশাখাপত্তনমের দিকে যাচ্ছে?’ ভবানীপ্রসাদ জিগ্যেস করলেন।
‘হ্যাঁ। চেয়ারম্যানসাহেব বললেন, মিস্টার চ্যাটার্জি যখন মারাই গেছেন তখন অযথা তাড়াহুড়ো করে প্লেন ডাইভার্ট করে ডাক্তার-নার্সিং হোম খোঁজার কোনও মানে হয় না। আপনি কাজ শুরু করুন, ডক্টর গুপ্ত।’
‘গুড। তাহলে এক্সিকিউটিভ ক্লাসে যেখানে বেশ কিছু সিট ফাঁকা আছে সেরকম একটা জায়গা আমাদের দিন, ক্যাপ্টেন। মিস্টার চ্যাটার্জির সঙ্গে যাঁরা ট্র্যাভেল করছেন তাঁদের সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার। তবে অন্য প্যাসেঞ্জাররা যেন অযথা ভয়-টয় না পেয়ে যায় সেটাও খেয়াল রাখবেন। তা হলে আমাদের কাজের অসুবিধে হবে।’
‘কুমারমঙ্গলম, আপনি এক্সিকিউটিভ ক্লাসে একটু স্পেসের ব্যবস্থা করুন।’ চিফ স্টুয়ার্ডকে নির্দেশ দিলেন অর্জন, ‘দেখবেন, ডক্টর গুপ্তদের ওয়ার্কিং স্পেসের কাছাকাছি যেন কোনও প্যাসেঞ্জার না থাকে। অনেক সিট তো খালি আছে—সেরকম হলে তাদের একটু শিফট করিয়ে দেবেন।’
কুমারমঙ্গলম ‘ইয়েস, স্যার’ বলে বেরিয়ে গেল।
ক্যাপ্টেন এবার হালকা গলায় এসিজিকে প্রশ্ন করলেন, ‘কাকে আপনার সন্দেহ হয়, মিস্টার গুপ্ত? নরমালি দ্য কিলার ইজ সামওয়ান রিলেটেড টু দ্য ভিকটিম…।’
সাদা চুলের গোছায় কয়েকবার টান মারলেন এসিজি। তারপর ধীরে-ধীরে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন, মিস্টার চ্যাটার্জির সঙ্গে চারজন ট্রাভেল করছিলেন। দু’জন ওঁর সঙ্গেই বসেছেন—এক্সিকিউটিভ ক্লাসে। আর বাকি দুজনে আছেন ইকনমি ক্লাসে।’
সুখানি বললেন, ‘হ্যাঁ মদনমোহন চ্যাটার্জির বোন তো খেপে লাল! ইরিনাকে যা-তা ভাষায় অ্যাটাক করেছেন। তারপর আমি গিয়ে ওঁকে অনেক কষ্টে ঠান্ডা করেছি। কিন্তু ইকনমি ক্লাসে কোন দু’জন ওঁর গ্রুপের?’
‘ডক্টর দে বোধহয় এ-ব্যাপারে আপনার হেলপ করতে পারবেন…।’ কথা বলতে-বলতে ভবানীপ্রসাদের দিকে ফিরলেন এসিজি।
কিন্তু রঙ্গলাল গোস্বামী তৎপরভাবে বলে উঠলেন, ‘আমার সঙ্গে কেউ চলুন…আমি ওঁদের চিনিয়ে দিচ্ছি।’
