এসিজিকে বাধা দিয়ে কুমারমঙ্গলম বলল, ‘ব্যাপারটা সুইসাইড হতে বাধা কোথায়, মিস্টার গুপ্ত? ভদ্রলোক টয়লেটের ভেতরে দরজা লক করে বসেছিলেন। সেখানে বাইরে থেকে…ওঃ, ইমপসিবল।’
এসিজি চোখ ফেরালেন চিফ স্টুয়ার্ডের দিকে : ‘আপনার পয়েন্টটা আমি বুঝতে পারছি। তবে নেচার অফ উন্ড দেখে মনে হচ্ছে মিস্টার চ্যাটার্জি ইনস্ট্যানটেনিয়াসলি মারা গেছেন। তা হলে সুইসাইড করার পর তাঁর পক্ষে অস্ত্রটা কি লুকিয়ে ফেলা সম্ভব? সুতরাং, সুইসাইড যদি হয়, তা হলে অস্ত্রটা কোথায় গেল? আর মার্ডার যদি হয়, তা হলে মার্ডারার টয়লেটের দরজাটা ভেতর থেকে লক করল কীভাবে? এখন এই দুটোই হচ্ছে আমাদের কাছে মোস্ট ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন। সেইজন্যেই বলেছি, ব্যাপারটা বেশ মিস্টিরিয়াস। কী বলেন, ডক্টর দে?’
ভবানীপ্রসাদ দে কেমন যেন ধন্দে পড়ে গিয়েছিলেন। সেটা সামলে নিয়ে ক্যাপ্টেন এবং কুমারমঙ্গলমের দিকে একবার দেখলেন। তারপর এসিজিকে লক্ষ করে বললেন, ‘ওই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নের উত্তর তো আপনাকেই দিতে হবে, ডক্টর গুপ্ত।’
‘হুঁ…হুঁ…’ বলে সহাস্যে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ হুনুর।
ক্যাপ্টেন সুখানি অবিশ্বাসের চোখে দীর্ঘকায় বৃদ্ধ মানুষটির দিকে তাকালেন। এঁকে ডেকে এনে আরও ঝামেলা হল দেখছি। আমতা-আমতা করে তিনি বললেন, ‘মার্ডার ওয়েপনটা একবার ভালো করে খুঁজে দেখলে হয় না? হয়তো দরজার আড়ালে বা টয়লেট সিটের পেছনে আনাচে-কানাচে কোথাও একটা পড়ে আছে…।’
অশোকচন্দ্র এ-কথার কোনও উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না।
অর্জন সুখানি মরিয়া হয়ে অন্তত একটা খড়খুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছিলেন। কারণ, লকড রুম প্রবলেম বড় বিচ্ছিরি জিনিস।
এসিজির দিকে আকুল চোখে তাকিয়ে তিনি একটা নতুন থিয়োরির প্রস্তাব দিলেন, ‘আপনার কী মনে হয়, ডক্টর গুপ্ত? মিস্টার চ্যাটার্জিকে কোথাও খুন করে তারপর টয়লেটে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে?’
এসিজি বোধহয় ক্যাপ্টেনের মনের কথা আঁচ করতে পারলেন। তিনি বললেন, ‘সেটা হলেও তো লকড রুম প্রবলেমটাকে এড়ানো যাচ্ছে না, ক্যাপ্টেন। কারণ, ডেডবডিটা টয়লেটে সিটের ওপরে বসিয়ে দিয়ে মার্ডারার হয়তো সটকে পড়ল…ভালো কথা। কিন্তু টয়লেটের দরজাটা সে ভেতর থেকে লক করবে কী করে? তা ছাড়া, টয়লেটের ওয়ালে যেভাবে রক্ত ছিটকে লেগেছে তাতে এটা খুবই স্পষ্ট যে, মিস্টার চ্যাটার্জি যখন মারা যান তখন তিনি টয়লেট সিটেই বসেছিলেন এবং টয়লেটের দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল।’
কুমারমঙ্গলমের দিকে ঘুরে তাকালেন এসিজি : ‘কী, মিস্টার কুমারমঙ্গলম, ঠিক বলছি তো?’
ঠোঁট চেপে অস্বস্তির চোখে ক্যাপ্টেনের দিকে একবার তাকাল কুমারমঙ্গলম, তারপর এসিজির দিকে ফিরে বলল, ‘ঠিকই বলেছেন—টয়লেটের দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল।’
‘তা হলে কী করে…।’
উত্তেজিত ক্যাপ্টেনকে বাধা দিলেন এসিজি : ‘সেটাই আমাকে বের করতে হবে…যদি আপনি আমাকে দয়া করে অনুমতি দেন…।’
‘কীসের অনুমতি?’
‘ওই যে বললাম…মোস্ট ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অনুমতি।’
ক্যাপ্টেন সুখানি দোনামনা হয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আমি তা হলে আমাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলছি। আমার চেয়েও ওঁর পারমিশান নেওয়াটা জরুরি। ওঁকে বলি, প্লেনে একটা মিসহ্যাপ হয়ে গেছে। এক্সিকিউটিভ ক্লাসের একজন প্যাসেঞ্জার…ওয়েলনোন বিজনেস টাইকুন মিস্টার মদনমোহন চ্যাটার্জি হ্যাজ…।’
‘বিন মার্ডার্ড।’ ক্যাপ্টেনের কথা স্পষ্ট গলায় শেষ করলেন এসিজি : ‘আপনি আপনাদের চেয়ারম্যানকে আমার কথাও বলতে পারেন। এম.পি. মিস্টার পরেশ সান্যাল আমাকে পার্সোনালি জানেন। দরকার হলে সেকথাও আপনি জানাতে পারেন। এ ছাড়া আমার মনে হয়, ইনভেস্টিগেশানের ব্যাপারটা আমাদের প্লেনের মধ্যেই যতটা সম্ভব সেরে ফেলা উচিত। তাতে আমাদের সাইকোলজিক্যাল অ্যাডভানটেজ আছে। কারণ, মার্ডারার প্লেনে বন্দি থেকে আনসেফ ফিল করবে। হি অর শি উইল বি আন্ডার এক্সট্রিম টেনশান। ফলে আমরা সহজে তাকে চিনে নিতে পারব। দেন পুলিশ ক্যান টেকওভার।’
ক্যাপ্টেন হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কলকাতা পৌঁছোতে তো আর একঘণ্টাও বাকি নেই! সেখানে এয়ারক্র্যাফট ল্যান্ড করলে প্যাসেঞ্জারদের কিছুতেই আর প্লেনে আটকে রাখা যাবে না। প্যাসেঞ্জারদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বিগ শট। ওঁরা আমার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন…।’
হাত তুলে ক্যাপ্টেনকে অভয় দিলেন এসিজি। হেসে বললেন, ‘এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ক্যাপ্টেন। প্যাসেঞ্জারদের বলুন যে, প্লেনে একটু টেকনিক্যাল প্রবলেম দেখা দিয়েছে। সেটা ঠিক করার জন্যে বিশাখাপত্তনম এয়ার টার্মিনালে আমাদের ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং করতে হবে। আশা করি দু-একঘণ্টার মধ্যে রিপেয়ারের কাজটা মিটে যাবে। অ্যান্ড দ্য ইনকনভেনিয়েন্স কজড ইজ রিগ্রেটেড।’ শেষ কথাটা এসিজি বেশ নাটকীয়ভাবে ঘোষণার ঢঙে বললেন।
ক্যাপ্টেন সুখানির মুখে পলকে হাসি ফুটে উঠল। তিনি হাত বাড়িয়ে এসিজির সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন : ‘দ্যাট ওয়াজ আ রিয়েল বিউটি, ডক্টর গুপ্ত। নাউ আই বিলিভ য়ু ক্যান ন্যাব দ্য কিলার। থ্যাঙ্ক য়ু ভেরি মাচ।’
ক্যাপ্টেনের নির্মেঘ মুখের দিকে তাকিয়ে ভরসা পেল কুমারমঙ্গলম। কারণ, ক্যাপ্টেন সুখানি লোক চিনতে ভুল করেন না। তা ছাড়া, কুমারমঙ্গলমের কেন জানি না মনে হচ্ছিল, বৃদ্ধ এই লোকটা পারলেও পারতে পারে।
