এমন সময় ইরিনা হন্তদন্তভাবে এসে হাজির হল। প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ক্যাপ্টেন, মিস চ্যাটার্জি…মানে, মিস্টার চ্যাটার্জির বোন…ওঁর সঙ্গে ট্র্যাভেল করছেন…উনি খুব উতলা হয়ে পড়েছেন। এখানে আসতে চাইছেন…।’
‘ওঃ হো,’ বেশ বিরক্ত হলেন অর্জন সুখানি। হাত নেড়ে ইরিনাকে বললেন, ‘ওঁকে দুশ্চিন্তা করতে বারণ করুন। বলুন, ব্যাপারটা আমরা হ্যান্ডল করছি। আর এদিকটায় যেন কেউ না আসে। দিস ইজ অ্যান অর্ডার। অ্যাড্রেস সিস্টেমে এটা অ্যানাউন্স করে দিন—এক্ষুনি।’
ইরিনা চটপটে পায়ে চলে গেল এক্সিকিউটিভ ক্লাসের দিকে।
ভবানীপ্রসাদ দে এসিজির কথাগুলো ভাবছিলেন। বৃদ্ধ গোয়েন্দার কথাগুলো একটু অতিনাটকীয় শোনাচ্ছে না কি? সুতরাং তিনি ছোট্ট করে কেশে গলা পরিষ্কার করে একটু চাপা গলায় এসিজিকে বললেন, ‘ডক্টর গুপ্ত, এত তাড়াহুড়ো করে ডিসিশান নেওয়ার দরকার কী? আসলে আমার মনে হচ্ছিল…।’
বৃদ্ধ হুনুর আপত্তি করে মাথা নাড়লেন, শান্ত গলায় বললেন, ‘ডক্টর দে, লক্ষ করেছেন, কী বীভৎসভাবে ভদ্রলোকের মুখের নীচের দিকের অংশটা ছত্রখান হয়ে উড়ে বেরিয়ে গেছে। চোখের নীচটায়…বিশেষ করে নাক আর মুখের জায়গাটা কিছু আর নেই। মুখের ভেতরে পিস্তলের নল ঢুকিয়ে গুলি করলে এরকম হওয়া সম্ভব। নাঃ, মিস্টার চ্যাটার্জি ডায়েড ইনস্ট্যান্টলি…নো ডাউট অ্যাবাউট ইট…।’
অর্জন সুখানি ইতিমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন। যে-গরমিলটা অনেকক্ষণ ধরে ওঁকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল সেটা এখন হঠাৎই মনে পড়ে গেল। টয়লেটের ভেতরে পিস্তল কিংবা রিভলভার ফায়ার করলে…।
ক্যাপ্টেন সুখানি অশোকচন্দ্রের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালেন। ঠোঁটের কোণে তেরছা একটা হাসির ভাব ফুটিয়ে বললেন, ‘ডক্টর গুপ্ত, আপনার থিয়োরিতে এমনিতে কোনও ফাঁক নেই—শুধু একটা পয়েন্ট ছাড়া। টয়লেটের ভেতরে কোনও লো ক্যালিবারের ফায়ার আর্মসও যদি ফায়ার করা হয়ে থাকে…মানে, মুখে রিভলভারের নল ঢুকিয়ে…তা হলে মাথা ফুটো করে গুলিটা সোজাসুজি গিয়ে লাগবে টয়লেটের দেওয়ালে। ওটা যে-ফোর্সে গিয়ে লাগবে তাতে দেওয়াল অনায়াসে ফুটো হয়ে যাবে। দ্যাট উইল কজ ডিকম্প্রেশান। বুঝতেই পারছেন, এই তেত্তিরিশ হাজার ফুট উঁচুতে একটা বুলেট যদি এয়ারক্র্যাফটের দেওয়াল ফুটো করে দেয়, তা হলে কী প্রবলেম হতে পারে?’
রঙ্গলাল সুখানির কাছে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, ‘হোয়াট ইজ ডিকম্প্রেশান, ক্যাপ্টেন?’
ক্যাপ্টেন সুখানি বিরক্ত হয়ে কুমারমঙ্গলমের দিকে কড়া চোখে তাকালেন। মাথা ঝাঁকিয়ে ইশারায় ওঁকে সরিয়ে নিতে বললেন।
কুমারমঙ্গলম রঙ্গলাল গোস্বামীকে একপাশে টেনে নিয়ে বলল, ‘আসুন, আমি আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি…।’
ক্যাপ্টেনের কথার সুরে একটা বাঁকা ভাব এসিজি লক্ষ করেছিলেন। কিন্তু তাতে বৃদ্ধ হুনুর কিছু মনে করেননি। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষেরই অ্যানালিটিক্যাল মাইন্ড থাকতে হবে এই চাহিদা বড্ড বাড়াবাড়ি। আর আই. কিউ. লেভেলও সকলের উঁচু তারে বাঁধা থাকতে হবে এমন কোনও মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। শরীরের ব্যায়াম না করলে কখনও শরীর চোস্ত হয় না। মগজের বেলাতেও ঠিক তাই। থিঙ্কিং মেশিনটার কলকবজায় নিয়মিত তেল দিলে তবে না মেশিন কাজ করবে! ক্যাপ্টেন সুখানিকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কোম্পানির হোমরাচোমরাদের তেল দিতেই বেশি ব্যস্ত। ফলে ওঁর জং-ধরা মগজটা যেমন থাকার কথা তাই-ই আছে।
সুতরাং নরম হেসে মোলায়েম গলায় এসিজি বললেন, ‘একটা বোধহয় ভুল হচ্ছে, ক্যাপ্টেন। আমি কখনও বলিনি যে, মিস্টার চ্যাটার্জি বুলেট ফায়ারিং-এই খুন হয়েছেন। আমি বলেছি, মুখের ভেতরে পিস্তলের নল ঢুকিয়ে গুলি করলে এরকম হওয়া সম্ভব…।
কুমারমঙ্গলম তখন হাত-পা নেড়ে রঙ্গলালকে ডিকম্প্রেশান বোঝাচ্ছিল।
‘…গ্রাউন্ড লেভেল থেকে অ্যাবাউট থার্টি থ্রি থাউজ্যান্ড ফুট হাইটে অ্যাটমসফিয়ার খুব থিন হয়ে যায়। মানে, বাতাস এত পাতলা যে, তার প্রেসার নেগলিজিবলি স্মল হয়ে যায়। এই পাতলা বাতাসে মানুষ বাঁচতে পারে না…।’
ঘাড় নেড়ে রঙ্গলাল বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—সেইজন্যেই সবাই অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে পাহাড়ে ওঠে।’
‘অ্যাবসলিউটলি রাইট।’ কুমারমঙ্গলম বলল, ‘সেইজন্য প্লেনের ভেতরে গ্রাউন্ড লেভেলের অ্যাটমসফেরিক প্রেসারে বাতাস ভরা থাকে। যদি কোনও কারণে প্লেন ফুটো হয়ে যায়…খুব ছোট ফুটো হলেও চলবে…তা হলে আলপিন ফোটানো বেলুন যেমন হাওয়া বেরিয়ে চুপসে যায় সেরকম আমাদের প্লেনের ভেতরকার বাতাসও ফুস করে বাইরে বেরিয়ে যাবে। তখন শ্বাসকষ্টে প্যাসেঞ্জার, ক্রু—সবাই কাহিল হয়ে পড়বে। সেইজন্যেই ডিকম্প্রেশানকে আমরা ভয় পাই।’
‘বুঝেছি, বুঝেছি—’ মাথা নেড়ে বললেন রঙ্গলাল, ‘যদি না থাকে বায়ুচাপ/ বলবে সবাই বাপরে বাপ।’
কুমারমঙ্গলম রঙ্গলালের স্বভাব-কবিতার কী বুঝল কে জানে! তবে একগাল হেসে ঘন-ঘন মাথা নেড়ে সায় দিল।
ওরা এসিজিদের কাছে এসে দাঁড়াল আবার।
এসিজি মাথার চুলে হাত বোলালেন। তারপর সামান্য কেশে ক্যাপ্টেনকে লক্ষ করে বললেন, ‘আসলে আমি বলতে চাইছি, ক্যাপ্টেন, ব্যাপারটা বেশ মিস্টিরিয়াস। উন্ডটা গানশটের মতো, অথচ টয়লেটের দেওয়াল ফুটো হয়নি…।’
