ভবানীপ্রসাদ সাবরিনার কথাগুলো শুনতে পেয়েছিলেন। তাই ওকে আর ফরমুলা মুখস্থ বলতে হল না। তার আগেই ভবানীপ্রসাদ উঠে দাঁড়িয়েছেন।
‘চলুন, মিস, তবে আমার সঙ্গে কোনও মেডিক্যাল ব্যাগ নেই। আমি একটু পার্সোনাল কাজে ব্যাঙ্গালোর এসেছিলাম। যদি সেরকম…।’
‘আমাদের প্লেনে ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল কিট আছে, ডক্টর। কিন্তু আমার মনে হয় না ওসবের আর দরকার হবে।’
ভবানীপ্রসাদ একটু অবাক হলেন, ভুরু কুঁচকে তাকলেন সাবরিনার দিকে। কিন্তু ততক্ষণে সাবরিনা এক্সিকিউটিভ ক্লাসের দিকে হাঁটা দিয়েছে।
রঙ্গলাল এসিজির কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে জিগ্যেস করলেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’
উত্তরে এসিজি ঠোঁট ওলটালেন। তারপর মন দিলেন রুবিক কিউবের দিকে।
ডক্টর ভবানীপ্রসাদ দে টয়লেট কিউবিকল থেকে বেরিয়ে এলেন বাইরে। ক্যাপ্টেন সুখানি এবং কুমারমঙ্গলমের দিকে তাকালেন। তারপর চোখ ফেরালেন হাতঘড়ির দিকে।
‘রক্ত যেভাবে জমাট বেঁধেছে তাতে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা হয়েছে আধঘণ্টা থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে…এই ধরুন সাড়ে আটটা কি পৌনে নটা নাগাদ।’
ক্যাপ্টেন সুখানি ছোট্ট করে ‘হুম’ শব্দ করলেন। তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘কীভাবে মারা গেছেন?’
ডক্টর দে মাথা চুলকোলেন, ঠোঁট কামড়ালেন বারকয়েক। খানিক সময় নিয়ে ইতস্তত করে বললেন, ‘বডিটা বাইরে বের করার ব্যবস্থা করুন। ডেফিনিট কিছু বলতে হলে আগে ফুল ইন্সপেকশান হওয়ার দরকার। তবে তার আগে একটা সাজেশান আছে…।’
‘কী সাজেশান?’
‘আমার সঙ্গেই একজন বিখ্যাত ক্রিমিনোলজিস্ট ট্র্যাভেল করছেন। ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশানের ব্যাপারে রিমার্কেবল জিনিয়াস…ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত…। ওঁর সঙ্গে আচমকা এই ফ্লাইটে দেখা। উনি একবার বডিটা দেখে যদি একটা ওপিনিয়ান দিতেনে তা হলে ভালো হত।’
অর্জন সুখানি কিংবা কুমারমঙ্গলম কেউই অশোকচন্দ্র গুপ্তের নাম শোনেনি। ওরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
ডক্টর দে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন, এটা আমার সিরিয়াস রিকোয়েস্ট। য়ু হ্যাভ গট নাথিং টু লুজ…।’
সত্যিই তো! যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। ডক্টর গুপ্তকে একবার ডেডবডি ইন্সপেক্ট করতে দিলে কী আর ক্ষতি হবে! কিন্তু…।
ক্যাপ্টেন সুখানি ভবানীপ্রসাদ দে-র মুখের দিকে তাকালেন। খুঁটিয়ে দেখতে চাইলেন ওর কথার আড়ালে কোনও উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে কি না। তা ছাড়া…।
অর্জন বললেন, ‘ডক্টর, কেসটা যদি প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল সুইসাইড হয় তা হলে একজন ক্রিমিনোলজিস্ট সেখানে…।’
‘ক্যাপ্টেন, আপনি অযথা হয়রান হচ্ছেন!’ একটু বিরক্ত হয়েই ভবানীপ্রসাদ বললেন, ‘অ্যাজ আই সেইড, য়ু হ্যাভ গট নাথিং টু লুজ।’
অগত্যা কী আর করা যায়!
একটু পরেই ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত টয়লেটের কাছে এলেন। তাঁর খানিকটা পিছনেই দাঁড়িয়ে রঙ্গলাল। ভদ্রলোক হতভম্ব চোখে একবার তার মুখের ওপরে চোখ বোলালেন।
ক্যাপ্টেন ভুরু কুঁচকে রঙ্গলালকে দেখে ডক্টর দে-র দিকে তাকিয়ে ইশারায় প্রশ্ন করলেন, ‘ইনি কে?’
ভবানীপ্রসাদ দেখলেন বিশদ ব্যাখ্যায় গেলে ব্যাপারটা জটিল হয়ে যেতে পারে। তাই হেসে বললেন, ‘ওঁর খুব ক্লোজ। সাম সর্ট অফ অ্যাসিস্ট্যান্ট।’
রঙ্গলাল ক্যাপ্টেনের মুখের দিকে তাকিয়ে আকর্ণ হাসলেন।
অশোকচন্দ্র টয়লেটের ভেতরটায় উঁকি মারলেন। মাত্র কয়েকমিনিট। তারপরই বেরিয়ে এলেন বাইরে।
মাথায় ধবধবে সাদা চুলের গোছায় বারতিনেক টান মেরে ধীরে-ধীরে বললেন, ‘ভারি অদ্ভুত!’
‘কী অদ্ভুত?’ জানতে চাইলেন অর্জন সুখানি।
এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন। এসিজি। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে হেসে বললেন, ‘খবর বোধহয় ভালো নয়, ক্যাপ্টেন।’ রসিকতার সামান্য ছোঁওয়া টের পাওয়া গেল এসিজির কথায়, ‘বডিটা আগে সাবধানে বাইরে বের করে নিয়ে আসুন। ডক্টর দে খুব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বলুন, মিস্টার চ্যাটার্জির মৃত্যুর কারণটা কী? তারপর আমরা বুঝতে চেষ্টা করব, ঠিক কীভাবে ভদ্রলোক দুর্ঘটনাটা ঘটালেন…।’
‘দুর্ঘটনা! অ্যাক্সিডেন্ট! সুইসাইড নয় বলছেন…।’ এসিজির মুখের দিকে বিভ্রান্তভাবে তাকালেন ক্যাপ্টেন সুখানি।
‘আমি এখনও কিছু বলিনি…’ হাসলেন এসিজি : ‘যা বলার ডক্টর দে আগে বলবেন…তারপর আমি।’
নার্ভাসভাবে ঘাড়ে হাত বোলালেন ক্যাপ্টেন, বললেন, ‘ডক্টর গুপ্ত, আমাদের চেয়ারম্যানকে এক্ষুনি রেডিয়ো মেসেজ পাঠাতে হবে। এরকম ভাসা-ভাসা বললে উনি খুব বিরক্ত হবেন। হি ইজ লাইক টু হ্যাভ সামথিং মোর স্পেসিফিক! যদ্দূর মনে হয়, মিস্টার চ্যাটার্জির সঙ্গে ওঁর হয়তো আলাপ থাকলেও থাকতে পারে। ওঁদের অনেক কমন সার্কল আছে। আমাদেরই হয়েছে যত জ্বালা!’
‘কমন সার্কল আছে নয়, ছিল। আপনি আপনাদের চেয়ারম্যানসাহেবকে অনায়াসে বলতে পারেন যে, মিস্টার মদনমোদন চ্যাটার্জি এক্সিকিউটিভ ক্লাসের টয়লেটে…যতদূর মনে হচ্ছে…মার্ডার্ড হয়েছেন।’
অর্জন সুখানি একটা জোরালো ধাক্কা খেলেন।
মার্ডার! বন্ধ টয়লেটের মধ্যে সেটা কেমন করে সম্ভব! কিন্তু এটাও তো তিনি লক্ষ করেছেন যে, টয়লেটের মধ্যেও কোনও রিভলভার কি পিস্তল নেই।
ক্যাপ্টেন সুখানির সবকিছু কেমন গুলিয়ে যেতে লাগল।
সুইসাইড হলেও ব্যাপারটার ঠিক হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, আবার মার্ডার হলেও তাই।
