জরিপের কাজ সেরে অর্জন সুখানি কুমারমঙ্গলমের মুখোমুখি হতেই ও রুমাল দিয়ে মুখ মুছল, টেনশন কমানোর চেষ্টায় আলতো করে বলল, এইরকম সিচুয়েশানের কথা আমাদের কোম্পানির ইমার্জেন্সি ম্যানুয়ালে লেখা নেই। লোকটা সুইসাইড করার আর জায়গা পেল না—একেবারে আকাশে, টয়লেটের মধ্যে!’
অর্জন মাথা নেড়ে বললেন, ‘সুইসাইড বলছেন? কিন্তু টয়লেটের মধ্যে তো কোনও ফায়ার-আর্মস চোখে পড়ল না!’
কুমারমঙ্গলম, ইরিনা আর সাবরিনা বড়-বড় চোখে তাকিয়ে রইল ক্যাপ্টেনের মুখের দিকে।
‘প্যাসেঞ্জারদের এদিকটায় আসতে বারণ করেছেন ভালোই করেছেন। কিন্তু এখন কী করবেন কিছু ভেবেছেন?’ ক্যাপ্টেন সুখানি কুমারমঙ্গলমকে জিগ্যেস করলেন।
‘দুদিকে পরদা লাগিয়ে এই সেকশানটা আইসোলেট করে দেব। তারপর বোধহয় বডিটাকে বাইরে বের করতে হবে।’
‘ভদ্রলোক শুনলাম খুব বিগ শট?’
ইরিনা এবার জবাব দিল, ‘তার চেয়েও বেশি। মিস্টার মদনমোহন চ্যাটার্জি। ওঁর কথায় শেয়ার মার্কেট ওঠানামা করে।’
‘তার ওপর পলিটিক্যাল কানেকশানের ব্যাপারটা তো আছেই!’ কুমারমঙ্গলম যোগ করল, ‘এই কেসটা ঠিকমতো হ্যান্ডল করতে না পারলে পার্লামেন্টে আমাদের এয়ারলাইনস কোম্পানির পিণ্ডি চটকানো হবে।’
‘ওঁর সঙ্গে আর যাঁরা আছেন তাঁদের খবর দেওয়া হয়েছে? ওঁর সঙ্গে কে যেন আছেন বললেন না?’ শেষ প্রশ্নটা ইরিনাকে লক্ষ করে ছুড়ে দিলেন ক্যাপ্টেন সুখানি।
ইরিনা মাথা নেড়ে সায় দিল : ‘হ্যাঁ—এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ওঁর সঙ্গেই দু’জন ট্রাভেল করছেন। সিটে বসানোর সময়ে খেয়াল করেছিলাম, উনি তাঁদের সঙ্গে বেশ কথাবার্তা বলছিলেন, ঠাট্টা করছিলেন…।’
‘তাঁদের ইনফর্ম করেছেন?’
‘করেছি। তবে শুধু বলেছি, একটা প্রবলেম হয়েছে—ব্যস, এইটুকুই।’
ক্যাপ্টেন সুখানি কুমারমঙ্গলমের দিকে তাকালেন : ‘প্যাসেঞ্জার লিস্ট চেক করে দেখুন কোনও ডক্টর আছে কি না। বডি রিমুভ করার আগে একটা ফরম্যাল মেডিক্যাল ওপিনিয়ান খুব জরুরি। আমাদের কোম্পানির মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি রুটিনের যা গাইডলাইন আছে আমরা সেটাই ফলো করব। আর আমি হেড অফিসে ব্যাপারটা ইনফর্ম করছি।
কুমারমঙ্গলম সায় দিয়ে ঘন-ঘন মাথা নাড়ল।
ক্যাপ্টেনের কথা শোনামাত্রই সাবরিনা ব্যস্তসমস্ত হয়ে একটা ক্যাবিনেটের কাছে গেল। ওটার ছোট্ট পাল্লা খুলে প্যাসেঞ্জার লিস্টটা বের করে নিল। তারপর লিস্টের নামগুলোর ওপরে তাড়াহুড়ো করে চোখ বোলাতে লাগল।
একটু পরেই ও চোখ তুলে তাকাল ক্যাপ্টেনের দিকে।
‘ক্যাপ্টেন, ইকনমি ক্লাসে দু’জন ডক্টর আছেন। এক্সিকিউটিভ ক্লাসে কেউ নেই।…’
‘সিট নাম্বার কত?’ কুমারমঙ্গলম জিগ্যেস করল।
‘এম-টু আর কিউ ফোর…।’
‘ওঁদের একজনকে চট করে ডেকে নিয়ে আসুন।’ হাত নেড়ে বললেন অর্জন সুখানি। তারপর তাকালেন ইরিনার দিকে : ‘মেডিক্যাল চেকআপের পর মিস্টার চ্যাটার্জির কম্প্যানিয়নদের যে-কোনও একজনকে এখানে ডাকব। কারণ, ডেডবডির ফরমাল আইডেন্টিফিকেশানটাও খুব ইমপর্ট্যান্ট। উই উইল হ্যাভ টু প্লে দিস স্ট্রিক্টলি বাই দ্য কোম্পানি রুলস। নিয়মের মধ্যে কোনও ফাঁক আমি রাখতে চাই না।’
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, ক্যাপ্টেন সুখানি খুব টেনশনে রয়েছেন। ওঁর ভুরু এখনও কোঁচকানো, কপালে ভাঁজ। আর আনমনাভাবে নিজের কাঁচাপাকা গোঁফে আলতো করে আঙুল বোলাচ্ছিলেন।
সাবরিনা অলিপথ ধরে পেশাদারি ছন্দে হেঁটে এগিয়ে এল এম-টু সিটটার কাছে।
ভদ্রলোকের পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির ওপরে কাশ্মীরি কাজ করা সাদা শাল। মাথায় ধবধবে সাদা চুল, চোখে কার্বন ফ্রেমের চশমা। বয়েস ষাট-পঁয়ষট্টি কি তার একটু বেশি। ভদ্রলোক একটা অদ্ভুতরকমের রঙিন কিউব নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন।
এই ভদ্রলোক ডাক্তার! কে জানে!
ঝুঁকে পড়ে সাবরিনা নিচু গলায় জিগ্যেস করল, ‘ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত?’
ভদ্রলোক হাসিমুখে চোখ তুলে তাকালেন সাবরিনার দিকে।
বয়কাট চুল। শ্যামলা রং। টানা-টানা চোখ। পরনে আকাশ-নীল সিল্কের শাড়ি। মেয়েটি বেশ লম্বা হওয়ায় শাড়িটা দারুণ লাগছে। হাওয়াসখি হিসেবে শতকরা একশো ভাগ মানানসই।
‘ইয়েস মিস,’ বললেন এসিজি, ‘হাউ ক্যান আই হেল্প য়ু?’
‘ডক্টর, আই অ্যাম অ্যাফ্রেইড দ্যাট উই হ্যাভ আ মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি। আমাদের এক্সিকিউটিভ ক্লাসের একজন প্যাসেঞ্জারের একটু মেডিক্যাল প্রবলেম হয়েছে। যদি আপনি এসে একটু দেখেন তা হলে ক্যাপ্টেন খুব খুশি হবেন। প্লিজ, স্যার।’
কোম্পানির ম্যানুয়ালের মুখস্থ করা ফরমুলার মতো সাবরিনা কথাগুলো বলল। ট্রেনিং-এর সময়ে যেরকম যান্ত্রিক ঢং ওদের শেখানো হয়েছে তার বাইরে ও যেতে পারেনি। এবং কথার শেষে ট্রেনিং-এ শেখানো নিয়ম মেনে ও একচিলতে হাসি জুড়ে দিল।
সাবরিনার কথায় এসিজির হাসি একটু চওড়া হল : ‘সরি মিস, আমি ফিজিক্সের ডাক্তার—আই মিন ডক্টরেট। নট মাচ হেল্প টু য়ু। মনে হয় আপনি আমার এই বন্ধুকে চাইছেন। ডক্টর ভবানীপ্রসাদ দে। হি ইজ আ মেডিক্যাল ডক্টর…অ্যাকচুয়ালি হোয়াট য়ু নিড।’ কথা বলতে-বলতে ভবানীপ্রসাদের দিকে ইশারা করে দেখালেন অশোকচন্দ্র।
সাবরিনা ওর ঠোঁট আঠা দিয়ে সাঁটা যান্ত্রিক হাসি নিয়ে ঘুরে তাকাল ডক্টর দে-র দিকে। তাকিয়েই ও ভদ্রলোককে খেয়াল করতে পারল। কিউ-ফোর থেকে সিট চেঞ্জ করে এখানে এসে বসেছেন।
