‘আজকের যুগে কি এই ছায়ালেখকের ব্যাপারটা স্বাভাবিক বলে মনে হয়, মিস্টার গুপ্ত?’ রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় জিগ্যেস করেছেন এসিজিকে।
এসিজি হেসে বললেন, ‘ঠিকই ধরেছেন, ম্যাডাম। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক বলেই সেই সিক্রেট জানাজানি হলে সেটা নিউজপেপারের হেডলাইন হয়ে যেত। তখন আপনার তো সুইসাইড করা ছাড়া কোনও উপায় থাকত না। বলুন, ভুল বলেছি?’
রত্নাবলীর মুখের রক্ত ব্লটিং পেপার দিয়ে কেউ শুষে নিল পলকে। তিনি হাসতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু হাসিটা কান্নার মতো দেখাল। শাড়ির আঁচল ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। এপাশ-ওপাশ কয়েকবার তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিলেন। ওঁর শরীরটা একটু-একটু কাঁপছিল।
ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো উঠে দাঁড়িয়েছেন ভাস্কর রাহা। তাঁর দু-চোখে বিস্ময়। কোনওরকমে বলতে গেলেন, ‘মিস্টার গুপ্ত, বোধহয় কোথাও একটা…,’ কিন্তু কথা শেষ করতে পারলেন না। তিনি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন বাংলা রহস্য-সাহিত্যের সম্রাজ্ঞীর দিকে। সৌম্য, স্নিগ্ধ, শান্ত। অথচ শুধু কাগজে কলমে নয়, বাস্তবেও খুন করার ক্ষমতা রাখেন।
‘কিন্তু এসব কী বলছেন আপনি!’ এসিজিকে লক্ষ্য করে বলে উঠেছে অনামিকা সেনগুপ্ত, ‘রত্নাদির হয়ে কে বই লিখে দেয়? কে সেই গোস্ট রাইটার?’
হাত তুলে অনামিকাকে আশ্বাস দিলেন এসিজি, বললেন, ‘একটু ধৈর্য ধরো, মা-মণি, সব বলছি।’
‘মাপ করবেন, মিসেস মুখার্জি—মাপ করবেন, ভাস্করবাবু। আপনাদের দক্ষ গোয়েন্দা করঞ্জাক্ষ রুদ্র বা সুরজিৎ সেনের মতো গুছিয়ে নাটকীয়ভাবে হয়তো এই শেষ দৃশ্য আমি জমাতে পারব না, তবে চেষ্টা করতে দোষ নেই। আমি আগেই তো আপনাদের বলেছি, চেহারা আমার শার্লক হোমসের মতো নয়, সেরকম করে পাইপ টানতেও পারি না। এরকুল পোয়ারোর মতো মোমের পালিশ দেওয়া ছুঁচলো গোঁফও আমার নেই। মানে, আপনাদের কাহিনির গোয়েন্দাদের মতো সর্ববিষয়ে বিশারদ আমি নই—তবে আমি কোনওরকমে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে নিই। আমার হুনুরি খুব সাদামাঠা, সহজ-সরল।’
ঘরে গুঞ্জন চলছিল। প্রায় সকলেই বিধ্বস্ত রত্নাবলীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
শুধু রঘুপতি যাদব চোয়াল শক্ত করে ঘরের এককোণে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে।
‘প্রথমে বলি লকড রুম প্রবলেমের সলিউশনের কথা। মানে, কী করে খুন হয়েছিল দেবারতি মানি। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্যে আমি আপনাদের সাহায্য চেয়েছিলাম—এবং আপনাদের অনেকেই যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। আপনাদের কথাবার্তা থেকেই বন্ধ ঘরের রহস্যের আসল উত্তর খুঁজে পেয়েছি আমি। তবে সেই রহস্য ফাঁস করার আগে উৎপলেন্দুবাবুকে একটা প্রশ্ন করতে চাই—’ এসিজি ঘুরে তাকালেন উৎপলেন্দু সেনের দিকে : ‘মিস্টার সেন, খুব ভেবে একটা কথা বলুন তো। খুনের দিন রাত এগারোটা নাগাদ আপনি যখন তিনশো আট নম্বর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেবারতির সঙ্গে কথা বলেছিলেন তখন ওর গলার স্বর নিয়ে আপনার কোনওরকম সন্দেহ হয়নি? মনে হয়নি, দেবারতির বদলে অন্য কেউ আপনার সঙ্গে কথা বলছে?’
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপর উৎপলেন্দু জবাব দিলেন, ‘না, সন্দেহ হয়নি। তবে গলাটা একটু জড়ানো মনে হয়েছিল। তা ছাড়া, আমিও তো নেশা করে ছিলাম…।’
রত্নাবলী এতক্ষণে নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়েছেন। শুকনো হেসে বললেন, ‘সন্দেহ হওয়ার কথা নয়, মিস্টার গুপ্ত। আমার গলা শুনে বয়েস বোঝা যায় না। তা ছাড়া একটু জড়িয়ে কথা বলেছিলাম।’ একটু ইতস্তত করে আবার বললেন, ‘তখন উৎপলেন্দুবাবুর কথার জবাবও দিয়েছি আন্দাজে। কারণ তখন তো আর ”পরীক্ষা” বলতে কিসের পরীক্ষা বুঝিনি…।’
এই কথাবার্তায় ঘরের সকলেই বেশ অবাক হয়েছেন। রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় কেন দেবারতি মানির ঘরে এসে ওকে নকল করে অভিনয় করার চেষ্টা করবেন, এই ব্যাপারটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার হয়নি।
অশোকচন্দ্র ফুরিয়ে আসা সিগারেট দিয়ে নতুন একটা সিগারেট ধরালেন। তাতে কয়েকবার টান দিলেন। সিগারেটের ডগায় অগ্নিবিন্দু দপদপ করে উঠল তালে-তালে। গলগল করে ধোঁয়া ছেড়ে এসিজি বলে উঠলেন, ‘এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কী করে আমি আন্দাজ করলাম, উৎপলেন্দুবাবু দেবারতির সঙ্গে কথা বলেননি—কথা বলেছেন অন্য কারও সঙ্গে, শ্রীমতী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।’ গালে কয়েকবার হাত বুলিয়ে নিলেন এসিজি : ‘এ-ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করেছে অনামিকা। উৎপলেন্দুবাবু চলে যাওয়ার পাঁচ-সাত মিনিট পরেই ও দেবারতির ঘরের দরজার চাবির ফুটো দিয়ে উঁকি মেরে ঘরে কাউকে দেখতে পায়নি। দেখতে পায়নি, কারণ ঘরে সত্যিই তখন কেউ ছিল না। উৎপলেন্দুবাবু দরজার কাছ থেকে সরে যাওয়ার পরই রত্নাবলীদেবী বেরিয়ে আসেন দেবারতির ঘর থেকে। দরজা বন্ধ করে সেটা বাইরে থেকে লক করে চটপট রওনা হয়ে যান পাঁচতলায় নিজের ঘরের দিকে। তার দু-চার মিনিট পরেই অনামিকা এসেছিল দেবারতিকে ডাকতে, এবং স্বাভাবিক কারণেই ও ঘরে কাউকে দেখতে পায়নি।’
রূপেন মজুমদার অধৈর্য হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কিন্তু দেবারতি তখন কোথায়? ও কি তখন খুন হয়ে গেছে?’
হাসলেন এসিজি : ‘না, খুন হয়নি। ও তখন—সম্ভবত মদের সঙ্গে মেশানো—ঘুমের ওষুধ খেয়ে মিসেস মুখোপাধ্যায়ের ঘরে খুন হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে।’
