‘রত্নাদি দেবারতি মানির ঘরে এসেছিলেন কী করতে?’ অনামিকা।
‘উনি দেখতে এসেছিলেন, দেবারতির ঘরের পশ্চিমদিকের—মানে, টেরাসের দিকের জানলাটা খোলা আছে কি না। অর্থাৎ জানলাটা খোলা থাকাটা তাঁর প্ল্যানের পক্ষে খুব জরুরি ছিল। যাতে সবাই ভাবে, দেবারতি ওর ঘরেরই জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছে।’
অনেকের মুখেই হতবুদ্ধি ভাব। শুধু রঞ্জন দেবনাথ নির্বিকার। আর অনিমেষ চৌধুরি।
স্মিত হাসলেন এসিজি। রত্নাবলীর দিকে একপলক তাকিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, আমার যদি কোথাও ভুল হয় তা হলে দয়া করে শুধরে দেবেন।’ তারপর অধ্যাপকের দিকে ফিরে : ‘দেবারতি ভাস্করবাবুর গাড়ির ওপরে পড়েছে রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের পাঁচতলার ঘরের পশ্চিমের জানলা দিয়ে, চারতলা থেকে নয়। গালিলেও আর নিউটনের সূত্রের সাহায্য নিয়ে, ভাস্করবাবুর গাড়ির আঘাতের পরিমাণ মাপজোখ করে, মাধ্যাকর্ষণের নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলে হয়তো সহজেই বোঝা যেত, দেবারতি হোটেলের পাঁচতলা থেকে নীচে পড়েছে—চারতলা থেকে নয়। কিন্তু যেহেতু এসব মাপজোখ বা পরীক্ষা আমরা করে দেখতে পারিনি, তাই ব্যাপারটা বুঝতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।’ বাঁ হাতে মাথার পাকা চুলের গোছায় টান মারলেন অশোকচন্দ্র। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘অনামিকা যখন দেবারতির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ওকে ডাকাডাকি করছে, তখন, ঠিক তার ওপরের ঘরে, রত্নাবলী ভীষণ পরিশ্রমের কাজ করছেন : প্রায় অচেতন দেবারতিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলেছেন জানলার কাছে। অচেতন কেন? এর উত্তর খুব সহজ—সচেতন থাকলে রত্নাবলীর পক্ষে ওকে কায়দা করা সম্ভব হত না।
‘হোটেলের বেয়ারাদের কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে আমরা আপনাদের প্রত্যেকের সম্পর্কে একটা করে টাইম-চার্ট তৈরি করেছি। সেই চার্ট অনুযায়ী দেবারতি মানিকে রাত সওয়া দশটা নাগাদ রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের ঘরে ঢুকতে দেখা গেছে। আর-একটা ইন্টারেস্টিং ইনফরমেশন হল, রাত দশটা নাগাদ রুম সার্ভিসকে ফোন করে মিসেস মুখার্জি হুইস্কির একটা ছোট বোতল আনিয়েছিলেন। অর্ধেকের বেশি খালি বোতলটা পাওয়া গেছে তাঁর ঘরে। কিন্তু আমরা যতদূর খোঁজখবর নিয়েছি তাতে উনি ড্রিঙ্ক করতে অভ্যস্ত এ-কথা কেউ বলেননি। তা হলে তিনি হুইস্কি আনিয়েছিলেন কার জন্যে? দেবারতি মানির জন্যে। অর্থাৎ, সেই মুহূর্ত থেকেই খুনের পরিকল্পনা বাসা বেঁধেছে রত্নাবলীর মনে। তবে দেবারতিকে তিনি ঠিক কোন অজুহাতে ঘরে ডেকেছিলেন তা বলতে পারব না। শুধু এটুকু বলতে পারি, সেই হুইস্কিতেই ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে যেভাবেই হোক সেটা দেবারতিকে খাইয়ে দিয়েছিলেন রত্নাবলী। তারপর অচেতন দেবারতিকে ঘরে বন্ধ করে রেখে তিনি ওর ঘরে গিয়েছিলেন জানলাটা খুলতে—।’
উৎপলেন্দু সেন গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলেন, ‘কিন্তু আমার ডাকাডাকিতে দেবারতির ঘর থেকে রত্নাবলী সাড়া দিলেন কেন?’
উৎপলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন এসিজি : ‘সাড়া না দিয়ে ওঁর উপায় ছিল না। কারণ, আপনি যদি দেবারতির সাড়া না পেয়ে নেশার ঝোঁকে শোরগোল শুরু করে দিতেন তা হলে রত্মাবলীর সব পরিকল্পনাই বানচাল হয়ে যেত। অচেতন দেবারতি মানিকে খুঁজে পাওয়া যেত ওঁর ঘরে, আর তারপর, প্রথম সুযোগেই দেবারতি ওঁর লেখালিখির সব রহস্য নিষ্ঠুরভাবে ফাঁস করে দিত।’
টুকরো-টুকরো সব ছবিগুলো এক অদ্ভুত যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে পরপর জুড়ে নিচ্ছিলেন ভাস্কর রাহা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই। রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ই সেই বিশ্বাসঘাতক—যাকে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল দেবারতি।
ভাস্কর রাহা টের পাচ্ছিলেন, চুরুটের প্রিয় স্বাদ কেমন বিস্বাদ হয়ে গেছে তাঁর মুখে।
অনিমেষ চৌধুরি শব্দ করে পান চিবোচ্ছিলেন। সেই অবস্থাতেই অতি সাবধানে মুখ নেড়ে বললেন, ‘কিন্তু চাবি? চাবিটা বন্ধ ফ্ল্যাটের টেবিলের ওপরে গেল কী করে?’
এসিজি মাথা নাড়লেন, চুল টানলেন কয়েকবার। তারপর যেন আপনমনেই বললেন, ‘হুম…চাবি…লকড রুম প্রবলেম।’ মুখ তুলে একে-একে দেখলেন সবাইকে : ‘এ-ব্যাপারে আপনাদের অনেকের সাহায্যই আমি পেয়েছি। তবে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন ভাস্করবাবু। কারণ দেবারতির খুনের বেলায় খুনি বেরিয়ে গেছে দরজা দিয়েই, তবে চাবিটা ওর ঘরে ঢুকেছিল জানলা দিয়ে। ভাস্করবাবু বলেছিলেন, খুনি টেরাস থেকে চারতলার ঘরের জানলা দিয়ে ছুড়ে দিয়েছিল চাবিটা। আসলে চাবিটা জানলা দিয়ে ঢুকলেও সেটা নীচ থেকে আসেনি—এসেছে ওপর থেকে।
‘এলোমেলো গল্পটা এবারে খুব সংক্ষেপে গুছিয়ে নেওয়া যাক। যেভাবেই হোক দেবারতি মানি জেনে ফেলেছিল রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় একজন ছায়ালেখক ব্যবহার করে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছেছেন। এতে দেবারতি ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে—কারণ সত্যি-সত্যিই ও রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। ভাস্করবাবুর কাছেই শুনেছি, কনফারেন্সের প্রথম দিনে রত্নাবলীর গল্পপাঠের সময় ও কীরকমভাবে রিঅ্যাক্ট করেছিল। আপনারা হয়তো সেটা প্রশংসা ভেবেছেন, কিন্তু আমার শুনে মনে হয়েছে, সেটা তীব্র ব্যঙ্গ ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ, দেবারতি—স্পষ্টভাষী। বেপরোয়া দেবারতি তখন ভেতরে-ভেতরে জ্বলছিল। আমার ধারণা, দেবারতি যখন রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের ইন্টারভিউ নেয় তখন এ-নিয়ে কথা তোলে, হিন্টস দেয়, হয়তো ওর স্বভাব অনুযায়ী আক্রমণও করে। ঠিক কী হয়েছিল তা এখন একমাত্র রত্নাবলীই বলতে পারবেন।’
