রঘুপতি যাদব ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল তার ‘প্রাক্তন স্যার’-এর দিকে।
প্রতীক্ষায়-প্রতীক্ষায় যেন ধৈর্যচ্যুতির সীমারেখায় পৌঁছে গেছেন প্রত্যেকে। কারণ, ঘড়িতে এখন সাতটা বেজে পাঁচ মিনিট। ভাস্কর রাহার দুশো আট নম্বর ঘরে এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে বা বসে অপেক্ষা করছেন দশজন রহস্য-লেখক। তাঁদের শ্বাস-প্রশ্বাস এখন বোধহয় স্বাভাবিক নয়। ‘বার্ষিক রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক সম্মেলন’ শেষ হয়ে গেলেও এখন হয়তো শুরু হবে তার আসল সমাপ্তি অনুষ্ঠান।
অনামিকা একটা পালিশ করা কাঠের আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটছিল। আর মাঝে-মাঝেই নীচু গলায় কথা বলছিল পাশে দাঁড়ানো রঞ্জন দেবনাথের সঙ্গে।
রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় বসে ছিলেন বিছানায়। তাঁর পাশে রূপেন মজুমদার আর রতন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের কাছ থেকে খানিকটা দূরে সোফায় বসে আছেন অধ্যাপক অনিমেষ চৌধুরি, জ্যোতিষ্ক সান্যাল আর অর্জুন দত্ত।
পশ্চিমের খোলা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ভাস্কর রাহা আর উৎপলেন্দু সেন। বাইরের গাঢ় আকাশের দিকে তাকিয়ে তাঁরা আলতো গলায় কী একটা বিষয় নিয়ে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘরের বাতাসে সিগারেট আর চুরুটের ভারি গন্ধ। আবহাওয়ায় উৎকণ্ঠার পরত জমতে-জমতে মাখনের মতো পুরু হয়ে গেছে।
শেষ পর্যন্ত অধৈর্য হয়ে প্রথম নীরবতা ভাঙল রঞ্জন দেবনাথ। শোনা যায় এমন স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, ‘মিস্টার গুপ্তের এত দেরি হচ্ছে কেন কে জানে!’
প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই দরজার কাছ থেকে শোনা গেল, ‘উনি এসে গেছেন।’
দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেছেন হোটেলের এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার প্রশান্ত রায়। কথাটা বলেছেন তিনিই। তাঁকে অনুসরণ করে ঘরে ঢুকলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত আর রঘুপতি যাদব। সঙ্গে দুজন উর্দি পরা কনস্টেবল।
প্রশান্ত রায়ের কপালে ঘামের ফোঁটা। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে নিয়ে তিনি বললেন, ‘মিস্টার গুপ্ত, এখন গোটা ব্যাপারটাই আপনার হাতে।’
হেসে মাথা ঝুঁকিয়ে ধন্যবাদ জানালেন এসিজি। ঘরের প্রায় মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘একটা সুতো খুঁজতে গিয়ে একটু দেরি হয়ে গেল।’
‘সুতো!’ অবাক হয়ে বলে উঠেছেন রত্নাবলী।
ওঁর দিকে তাকিয়ে বিনীত হেসে এসিজি বলেছেন, ‘হ্যাঁ, ম্যাডাম, সুতো। মানে, সূত্র—দেবারতি মানির খুনের সূত্র। কারণ, দেবারতির হত্যারহস্য বলতে গেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা সুতোর ওপরে।’ প্রত্যেকটি লেখককে বেশ সময় নিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন এসিজি। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘দেবারতি মানি ছিল সাংবাদিক। ক্রাইম জার্নালিস্ট। রহস্য-সাহিত্যকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসত ও। কী একটা টপ সিক্রেট ও জেনে ফেলেছিল কেমন করে। তাই এই কনফারেন্সে এসে ওকে খুন হতে হল। ব্রুটাল অ্যান্ড ন্যাস্টি মার্ডার। এবং খুনের পদ্ধতি বেশ জটিল এবং অভিনব—জন ডিকসন কারের বইতেও যা নেই।’ একটু থেমে তারপর : ‘তবে খুনি যে আগে থেকে প্ল্যান করে খুন করেছে তা নয়। বরং হঠাৎই খুনিকে এমন একটা নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর অনেকটা ঘটনাচক্রেই বলা যায়—খুনের পদ্ধতিটা হয়ে যায় ইনজিনিয়াস। ঠিক রূপেন মজুমদারের ”ডাকিনীর হাতছানি”-র মতো।’
হাতের জ্বলন্ত সিগারেটে শব্দ করে টান দিলেন অশোকচন্দ্র। তারপর বললেন, ‘দেবারতির টপ সিক্রেট জেনে ফেলার ব্যাপারটা মোটেই গোপন ছিল না, বরং সকলেই জেনে গিয়েছিলেন—এমনকী খুনিও। সম্পাদক প্রেমময় চৌধুরির উসকানিতে দেবারতি সকলের সামনেই একটু হিন্টস দিয়েছিল : পাঁচকড়ি দে এবং এডগার ওয়ালেস। আমি অনেক বইপত্তর ঘেঁটে মাত্র একটাই মিল পেয়েছি এই দুজন লেখকের মধ্যে। সমালোচকরা সন্দেহ করেন, এই দুজন লেখকেরই গোস্ট রাইটার বা ছায়ালেখক ছিল। অর্থাৎ, ওঁদের নামে যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে তার অনেকগুলোই প্রকৃতপক্ষে অন্য কেউ ওঁদের হয়ে লিখে দিয়েছেন।’
‘ছায়ালেখক!’ ভাস্কর রাহা অবাক হয়ে চুরুটের ধোঁয়া ছেড়েছেন।
‘কিন্তু অন্যের নামে লিখে সেই ছায়ালেখকের লাভ কী?’ প্রশ্ন করেছেন জ্যোতিষ্ক সান্যাল।
‘উত্তর অতি সহজ। টাকার জন্যে ছায়ালেখকেরা হয়তো বেনামে বই লিখতে রাজি হয়েছিলেন।’ অশোকচন্দ্র সিগারেটের ছাই ঝেড়ে আবার শুরু করলেন, ‘পাঁচকড়ি দে-র প্রধান ছায়ালেখক ছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ পাল—পাঁচকড়ি দে-র বইয়ের প্রকাশক ”পাল ব্রাদার্স”-এর একজন স্বত্বাধিকারী। আর এডগার ওয়ালেস এত উর্বর-লেখনীর মালিক ছিলেন যে, এক-একসময় বছরে পাঁচটা, সাতটা, আটটা কিংবা ন’টা পর্যন্ত বই প্রকাশ করেছেন। তাঁর এই অনর্গল লেখার স্রোত দেখে অনেকে মনে করতেন—বা বলা ভালো, এখনও সন্দেহ করেন—তাঁর অনেক গুপ্তলেখক বা ছায়ালেখক ছিল। বুঝতেই পারছেন, সমালোচকরা শুধু সন্দেহই করতে পেরেছেন, প্রমাণ করতে পারেননি। কারণ, এই ধরনের ব্যাপার কখনও প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
‘সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দেবারতি যদি ঠাট্টা না করে থাকে তা হলে বোধহয় ও গোস্ট রাইটারের কথাই বলতে চাইছিল। অর্থাৎ, এই সম্মেলনে—মানে, এখন এই ঘরে—এমন একজন লেখক হাজির রয়েছেন যিনি ছায়ালেখক ব্যবহার করে একের পর এক বই প্রকাশ করে চলেছেন এবং রহস্য-সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান হয়েছেন—।’
