মনে আছে। সেগুলো নানানভাবে খতিয়ে দেখেছেন এসিজি, কিন্তু তার মধ্যে খুনির স্পষ্ট পরিচয় বা সেরকম কোনও ইশারা লুকিয়ে নেই।
আরও একটা ব্যাপার ভাবিয়ে তুলেছে তাঁকে : পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট।
হাতের কাগজ দুটো রঘুপতি যাদবকে ফিরিয়ে দিয়ে পি.এম. রিপোর্টের কপিটা দেখতে চাইলেন এসিজি।
খুন হওয়ার আগে মদ খেয়েছিল দেবারতি। তা ছাড়া ওর পাকস্থলীতে পাওয়া গেছে ঘুমের ওষুধ।
মেয়েটা কি অনিদ্রায় ভুগত? তা হলে ওর ঘর সার্চ করে স্পিÏপিং পিলস পাওয়া গেল না কেন?
এসিজির দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এক্ষুনি একটা সিগারেট ধরাতে না পারলে তিনি মরে যাবেন। রঘুপতিকে রিপোর্টের কপিটা ফেরত দিয়ে বললেন নীচু গলায়, ‘আমি বাইরের বারান্দায় আছি। তুমি কান খাড়া করে শোনো কে কী বলছে। এখন আমাদের কোনও ইনফরমেশন মিস করা চলবে না।’
রঘুপতি বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় নাড়ল। এসিজি বেরিয়ে গেলেন বলরুম ছেড়ে।
বাইরের বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরাতেই দেখতে পেলেন, বলরুমের আর-একটা কাচের দরজা ঠেলে ভাস্কর রাহাও বেরিয়ে আসছেন। উদ্দেশ্য বোধহয় একই : ধূমপান।
এসিজি ভাস্কর রাহাকে লক্ষ্য করে হাত নাড়লেন।
চুরুট ধরিয়ে খোলা বারান্দায় এসিজির কাছে চলে এলেন ভাস্কর। চারপাশে সোনা-রোদ, নীল আকাশ, হালকা ঠান্ডা বাতাস, টবে সাজানো গাছ। সামনের বড় রাস্তায় বেলা সাড়ে এগারোটার ব্যস্ততা।
এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে স্মিত হেসে ভাস্কর রাহা সপ্রশ্নে তাকালেন এসিজির দিকে। দেবারতি খুন হওয়ার পর থেকে এই বৃদ্ধ অধ্যাপক তাঁদের কম জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। গতকালও তাঁর প্রশ্নবাণের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি, তার ওপর ঘর তল্লাশি করার নাজেহাল ব্যাপার।
‘আজই তো শেষদিন ভাস্করবাবু—,’ ‘শেষদিন’ শব্দটার ওপরে একটু জোর দিয়ে যেন বললেন এসিজি।
ভাস্কর রাহা ঘাড় নাড়লেন নীরবে।
‘আপনি কখনও রুবিক কিউব দেখেছেন, ভাস্করবাবু?’
‘না—’ মাথা নাড়লেন ভাস্কর।
‘হাঙ্গেরির এক অধ্যাপক ছাত্রদের গ্রুপ থিয়োরি পড়াতে গিয়ে একটা কিউব তৈরি করেছিলেন ১৯৭৫ সালে। সেই অধ্যাপকের নাম আর্নো রুবিক। এই কিউবে কতকগুলো খুদে-খুদে রঙিন কিউব জুড়ে তৈরি করা হয়েছে একটা বড় কিউব। খুদে কিউবের থাকগুলোকে নানানভাবে ঘুরিয়ে বড় কিউবটার ছ’টা পিঠে নানানরকম নকশা তৈরি করা যায়। ভারি মজার ধাঁধা…।’
ভাস্কর রাহা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না এখন তাঁর কী বলা উচিত। এই বৃদ্ধ গোয়েন্দা হঠাৎই বা তাঁকে রুবিক কিউবের গল্প শোনাচ্ছেন কেন?
এসিজি রুবিক কিউব নিয়ে যেন আপনমনেই নানান কথা বলছিলেন আর সিগারেটে টান দিচ্ছিলেন ক্রমাগত। তাঁর মাথার ভেতরে খুদে কিউবগুলো বনবন করে ঘুরপাক খেয়ে দেবারতি মানির খুনের নকশা তৈরি করার চেষ্টা করছিল।
‘আচ্ছা ভাস্করবাবু, আপনাদের মধ্যে কারা-কারা ড্রিঙ্ক করেন বলতে পারেন?’ হঠাৎই জানতে চাইলেন এসিজি।
মজা করে হাসলেন ভাস্কর, বললেন, ‘ঠিক বলতে পারব না—তবে অনেকেই এ-রসে অভ্যস্ত। এটা না হলে লেখালিখি ঠিক জমে না…।’
‘তার মানে? নেশা না করলে আপনার লিখতে অসুবিধে হয়?’
আবার প্রসন্ন হাসলেন রাহা : ‘ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা খুব মুশকিল। মানে, আমার লেখার মূল সূত্র হচ্ছে, রহস্যের প্রত্যেকটি টুকরোকে কল্পনার সুতোয় গেঁথে খুশিমতো খেলিয়ে তারপর সেগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়া সাদা কাগজের পৃষ্ঠায়। একটু-আধটু নেশা করলে লাগামছাড়া কল্পনার সুতো খুশিমতো খেলা করতে পারে—অন্তত আমার তাই মনে হয়…।’
‘মাই গড!’ অবাক হয়ে বলে উঠলেন এসিজি। তাঁর চোখের নজর ভাস্কর রাহার শরীর ভেদ করে যেন চলে গেছে কোন দিগন্তে। কপালে বয়েসের কারুকাজ। বাতাসে সাদা চুল উড়ছে। দূরে পাখি ডাকছে কোথাও। আর তাঁর মগজের ভেতরে বনবন করে পাক খাওয়া খুদে কিউবগুলো চোখের পলকে নিজেদের সাজিয়ে নিয়ে ফুটিয়ে তুলল রুবিক কিউবের অভিনব এক নকশা—দেবারতি মানির খুনের নকশা।
কী আশ্চর্য! এই সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে এ ক’দিন কী নাজেহালটাই না হয়েছেন অশোকচন্দ্র! এখন তো বলতে গেলে সব জলের মতো স্পষ্ট! ঝাপসা যেটুকু আছে তা অতি সামান্য। রঞ্জন দেবনাথ পরশুদিন ঠিকই বলেছিল : আপনার থিঙ্কিং মেশিন বিগড়ে গেছে—রিপেয়ার করতে হবে।
‘ভাস্করবাবু, আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ—’ এসিজির গলার স্বর কাঁপছিল।
‘কেন?’ ভাস্কর রাহা এই বৃদ্ধ হুনুরের আচরণের কোনও থই পাচ্ছিলেন না।
‘এখন আমি জানি, দেবারতি মানিকে কে খুন করেছে, কীভাবে খুন করেছে। আজ সন্ধে সাতটার সময় আপনার ঘরে সবাইকে থাকতে বলবেন—।’
‘নাটকের শেষ দৃশ্য?’ ঠাট্টা করে জিগ্যেস করলেন রাহা।
‘আপনাদের সাহিত্যের ভাষায় হয়তো তাই…’ একটু থেমে সিগারেটে টান দিয়ে এসিজি বললেন, ‘তবে আমার কাছে পাখি ধরার কাজ। বুঝলেন, দেবারতি মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতী ছিল।’
‘কেন?’
‘খুব মজার হিন্টস দিয়েছিল। দারুণ!’ আপনমনেই হাসতে শুরু করলেন এসিজি।
রঘুপতি যাদব কখন যেন এসে হাজির হয়েছিল খোলা বারান্দায়। অশোকচন্দ্রকে হাসতে দেখে সে অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘কিঁউ স্যার, কেয়া বাত হ্যায়? কোই খাস বাত হ্যায় কেয়া?’
ওর দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে ডান হাত তুললেন এসিজি। হাসতে-হাসতেই বললেন, ‘ওহে আমার প্রাক্তন ছাত্র, অতি দুর্লভ প্রজাতির একটি পাখি আজ সন্ধেবেলা তুলে দেব তোমার হাতে…।’
