এসিজি শুনছিলেন আর অবাক হয়ে ভাবছিলেন। একই ঘটনার কতরকম সমাধান সম্ভব! দেবারতি মানির বেলাতেও তাই। দশজনের মধ্যে অন্তত ছ’জন লেখক ছ’রকম সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রত্যেকটা সমাধানের মধ্যেই কোনও না কোনও ত্রুটি রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর সাহায্য নিয়েই তিনি খুঁজে পেয়েছেন সঠিক উত্তর। বিশেষ করে অনামিকার শেষ কথাগুলো শোনার পর আর কোনও অসুবিধে হয়নি। চাবির ফুটো দিয়ে উঁকি মেরে ও ঘরে কাউকে দেখতে পায়নি, এই তথ্যটাই এসিজিকে সাহায্য করেছে সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া রঞ্জন দেবনাথের কাছ থেকেও তিনি কম সাহায্য পাননি। রঞ্জন উদ্ধত, তবে বুদ্ধিমান লেখক তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
কিন্তু এত সত্ত্বেও লকড রুম প্রবলেমের কিছুটা অংশ এখনও ঝাপসা থেকে গেছে।
রঘুপতির কাছ থেকে দুটো কাগজ চেয়ে নিলেন তিনি। গত দুদিনে দশটা ঘর সার্চ করে যা-যা পাওয়া গেছে তারই একটা নির্বাচিত তালিকা। আগেও অনেকবার দেখেছেন, তবু আরও একবার চোখ বোলালেন অশোকচন্দ্র।
অনামিকা সেনগুপ্ত (রুম নাম্বার ৪০৭) : রঞ্জন দেবনাথের উপহার দেওয়া দুটো গানের ক্যাসেট আর একটা বই—সমরেশ মজুমদারের ‘প্রেমের গল্প’। পাঁচ মিটার লম্বা একটা লাল রঙের নাইলনের দড়ি। একটা খালি বিয়ারের বোতল।
রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় (রুম নাম্বার ৪০৮) : দেড় ডজন ভ্যালিয়্যাম ফাইভ ট্যাবলেট। ছ’টা সিপলক্স ক্যাপসুল। চুলে কলপ করার মেহেদি পাতার গুঁড়োর প্যাকেট। ম্যাকডাওয়েল হুইস্কির একটা ছোট বোতল—তার অর্ধেকের বেশি খালি। এক কাটিম সাদা সেলাইয়ের সুতো। একটা মাঝারি মাপের ছুঁচ। রূপেন মজুমদারের উপহার দেওয়া এক কপি ‘ডাকিনীর হাতছানি’।
জ্যোতিষ্ক সান্যাল (রুম নাম্বার ৪০৯) : একটা এয়ার পিস্তল। একটা ছোট ছুরি। একটা রহস্য উপন্যাসের সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি—নাম ‘খুন জখম রাহাজানি।’।
রূপেন মজুমদার (রুম নাম্বার ৪১০) : বাইশ কপি ‘ডাকিনীর হাতছানি’। চারটি ছোট গল্প, একটি নভেলেট এবং একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি : প্রত্যেকটি পাণ্ডুলিপির প্রথম পৃষ্ঠায় ওপরে বাঁদিকে বড় বড় করে লেখা ‘সম্পূর্ণ মৌলিক কাহিনি’। এক শিশি ‘থার্টি প্লাস’ ট্যাবলেট। সবক’টি রহস্য-রোমাঞ্চ পত্রিকার নাম-ঠিকানা এবং ফোন নম্বর লেখা একটি ডায়েরি।
রঞ্জন দেবনাথ (রুম নাম্বার ৪১১) : অনামিকা সেনগুপ্তের দেওয়া জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’। কয়েকটা বিদেশি রহস্য উপন্যাস। একটা ক্রসওয়ার্ড পাজলের বই। দুটো প্রেমের কবিতা—অর্ধেকটা করে লেখা। একটা বড় কাঁচি আর হাত তিনেক লম্বা একটা সাদা দড়ি। চারটে রঙিন কাচের পুতুল। তিনটে ‘কামসূত্র’ কন্ডোম।
অনিমেষ চৌধুরি (রুম নাম্বার ৩০৭) : সতেরোটি বিদেশি কল্পবিজ্ঞানের উপন্যাস—প্রত্যেকটা বইয়ের টাইটেল পেজে ইংরেজি নামের পাশে হাতে লেখা সম্ভাব্য বাংলা নাম। দুটি বিদেশি সফট পর্নো ম্যাগাজিন। এক ফাইল বলবর্ধক ‘শিলাজিৎ’ ট্যাবলেট। ন’টা অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি।
রতন বন্দ্যোপাধ্যায় (রুম নাম্বার ৩১০) : নিজের লেখা বিভিন্ন বই—মোট সাতষট্টি কপি। দুটি উপন্যাস, তিনটি নভেলেট এবং সাতটি ছোট গল্পের পাণ্ডুলিপি। বিভিন্ন পাঠকের লেখা একতাড়া প্রশংসাপত্র। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর আগে পাওয়া বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপের জরাজীর্ণ দুটো সার্টিফিকেট আর তার পাঁচটি করে ফটোকপি। (এই সার্টিফিকেট দুটোর ফটোকপি দেবারতি মানির ঘর থেকে পাওয়া গেছে—সম্ভবত ইন্টারভিউ নেবার সময় লেখক দিয়েছিলেন)।
ভাস্কর রাহা (রুম নাম্বার ২০৮) : হুইস্কির একটা খালি বোতল। কয়েকটা বিদেশি সাহিত্য পত্রিকা। খবরের কাগজ থেকে কেটে নেওয়া রহস্য-সাহিত্য সংক্রান্ত কয়েকটা খবরের কাটিং। দেবারতি মানির লেখা একটা ফিচারের খসড়া। ‘ভয়ংকর’ আর ‘ছায়াময়’ পত্রিকার প্রথম বছরের চারটি পুরোনো সংখ্যা। কয়েকটা আধপোড়া চুরুট। এক বাক্স আলপিন। একটা নীল রঙের ‘রেনল্ডস’ বলপয়েন্ট পেন (দেবারতি মানির ঘরে টেবিলের ওপরে পাওয়া পেনটার মতো)।
অর্জুন দত্ত (রুম নাম্বার ২০৯) : তেরোটি বিদেশি রহস্য-রোমাঞ্চ ‘সত্যকাহিনি’ জাতীয় পত্রিকা। মহিলাদের চারটে ফ্যাশান ম্যাগাজিন। ব্যায়াম করার জন্য একটা ‘বুলওয়ার্কার’। দশটা ক্যামপোজ ট্যাবলেট। নাম-না-জানা দুজন মহিলার ফটো। ‘ছায়াময়’ পত্রিকার এ-বছরের পুজো সংখ্যা।
উৎপলেন্দু সেন (রুম নাম্বার ২১০) : বাংলা সাহিত্যের নামি কয়েকজন লেখকের লেখা পাঁচটি উপন্যাস—পাঁচটি বই-ই লাল কালি দিয়ে দাগ কেটে নানান মন্তব্যে ভরতি করে দেওয়া হয়েছে। রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়, ভাস্কর রাহা এবং রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা করে উপন্যাস (এগুলোও লাল কালিতে যথেষ্ট কলঙ্কিত)। দুটো ‘প্লেওয়ে’ আর একটা ‘ফ্যানটাসি’ পত্রিকা—তাতে ন্যুড পোস্টারের পাতাগুলো ব্যবহারে ব্যবহারে কোঁচকানো। দেবারতি মানি সম্পর্কে কটু মন্তব্য লেখা দুটো প্যাডের পাতা। পুরুষালী চিহ্নে কলঙ্কিত একটা লুঙ্গি আর একটা পাজামা। চারটে অসমাপ্ত লেখার পাণ্ডুলিপি। এক প্যাকেট ‘৭৭২’ তাস। তিনটে বিদেশি নাটকের বই।
এই তালিকার কোথাও কি লুকিয়ে রয়েছে খুনের উদ্দেশ্য বা কৌশলের কোনও ইঙ্গিত, কোনও সূত্র? অশোকচন্দ্র গুপ্ত ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছিলেন চিন্তায়। দেবারতি মানিকে তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন চোখের সামনে। খিলখিল হেসে মেয়েটা বলছিল, ‘ইউনিভার্সিটিতে পড়ানো আর হুনুরি এক ব্যাপার নয়, স্যার। ফর ডিটেকশন ইউ নিড রিয়েল ব্রেইন। হিন্টসগুলো মনে আছে তো!’
