অনামিকা চলে যেতেই রঞ্জন দেবনাথ একা। ওকে দেখে একটু অবাক লাগল এসিজির। সবে কাল রাতে মারা গেছে দেবারতি মানি। অথচ এর মধ্যেই রঞ্জন বেশ স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
‘দেবারতিকে কীরকম ভালোবাসতেন, রঞ্জনবাবু?’ আচমকা প্রশ্ন করেছেন এসিজি।
রঞ্জনকে হঠাৎই একটু অপ্রস্তুত দেখাল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, ভালোবাসতাম, তবে তার শ্রেণিবিভাগ করতে পারব না।’
পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করল রঞ্জন। মুখ আড়াল করে সিগারেট ধরাল।
‘দেবারতি সম্পর্কে দু-চারকথা বলুন,’ অনুরোধ করলেন অশোকচন্দ্র।
‘নতুন কী আর বলব বলুন!’ সিগারেটে গভীর টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল রঞ্জন : ‘ও রহস্য-সাহিত্যকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। আর আমাদের মধ্যে কোনও-কোনও লেখককে বলত রেস্তোরাঁর বেয়ারা। মানে, লেখার প্রতি ভালোবাসা, নিষ্ঠা, যত্ন, কিস্যু নেই…পাঠকরা যখন যা চায় রেস্তোরাঁর বেয়ারার মতো সেটাই প্লেটে সাজিয়ে দেয়…।’
‘আপনি কি সেই বেয়ারাদের একজন?’ রঞ্জনকে একটু খোঁচা দিতে চাইলেন এসিজি।
‘জানি না। ও কখনও আমাকে নামগুলো বলেনি।’
‘আপনার সঙ্গে ওর শেষ কখন দেখা হয়েছিল?’
‘ওই সাড়ে ন’টা দশটার সময়ে…এই লেখাটেখার ব্যাপার নিয়ে ওর ঘরে বসেই কথা হচ্ছিল…’
এসিজি সরাসরি তাকালেন রঞ্জনের চোখে : ‘তা হলে ইনভেস্টিগেশনে সাহায্য করার মতো আর কিছু আপনার বলার নেই?’
রঞ্জন দেবনাথের চোখের পাতা এতটুকু কাঁপল না। ও উদ্ধতভাবে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘আপনি হুনুর—এখানে হুনুরি করতে এসেছেন। খুনি ধরা আপনার কাজ, আমার নয়। বুদ্ধি থাকলে যেসব তথ্য পেয়েছেন তা থেকেই খুনি ধরা যায়। ইটস ইওর গেম। গুড বাই।’
রঞ্জন দেবনাথ দ্রুতপায়ে চলে গেল ঘর ছেড়ে। সিগারেটের ধোঁয়ার রেখার মাঝে অশোকচন্দ্র গুপ্ত দাঁড়িয়ে রইলেন পাথরের মূর্তির মতো। একা।
চোখ বুজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পলিতকেশ বৃদ্ধ হুনুর প্রাণপণে চেষ্টা করলেন খুনির ছবিটা দেখতে, কিন্তু অদৃশ্য এক পাগল-করা ঢেউ বারবার ছবিটাকে ঝাপসা করে দিচ্ছিল। তবে এটুকু বুঝতে পারছিলেন, দেবারতি কীভাবে খুন হয়েছে সেটা ধরতে পারলেই বাকিটা ধরে ফেলা যাবে অনায়াসে।
কিন্তু ঠিক কীভাবে খুন হয়েছে দেবারতি মানি?
নয়
আজ সম্মেলনের শেষ দিন।
দেবারতি মানির ঘটনার পরদিন থেকেই সম্মেলনের সুর কেটে গেছে। যেন যান্ত্রিকভাবে কয়েকটা রোবট তাদের মাস্টার প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করে চলেছে। দর্শক বা শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই চাপা আলোচনা করে চলেছেন দেবারতির মৃত্যু নিয়ে। খবরের কাগজগুলো এখনও পর্যন্ত ব্যাপারটাকে আত্মহত্যা অথবা দুর্ঘটনা বলে চালাতে চেষ্টা করছে। তবে পাঠকদের বেশিরভাগই সেটা মেনে নিতে নারাজ। তার প্রধান কারণ, সাধারণ মানুষ, যাদের রোজকার জীবন নিতান্তই সাধারণ, তারা সবসময় রহস্য-রোমাঞ্চ পছন্দ করে। কোনও খবর চাঞ্চল্যকর হলে তবেই সেটা তাদের আগ্রহ জাগায়, তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে সেই খবরের ওপরে।
সুতরাং বলরুমে মোটামুটি একটা অশান্তভাব ছিল। গত পরশু সকালে ভাঙা হাটে সম্মেলন শুরু হওয়ার সময়ে দেবারতি মানির আকস্মিক মৃত্যুর জন্য শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল, আর পালন করা হয়েছিল এক মিনিট নীরবতা। ব্যস, তারপর থেকেই আসর জুড়ে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে একটাই প্রশ্ন : দেবারতি মানির মৃত্যুর পিছনে রহস্যটা কী?
আজ, বার্ষিক এই অনুষ্ঠানের শেষ দিনেও, সেই একই প্রশ্ন কুরে-কুরে খাচ্ছে সবাইকে।
হলের একেবারে পিছনের সারিতে বসেছিলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। চোখের কোণে, কপালে আর নাকের দুপাশে বলিরেখা প্রকট। পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা নাড়াচাড়া করছিলেন একটা সিগারেট ধরানোর জন্য। কিন্তু এয়ার কন্ডিশন্ড বলরুমে ধূমপান নিষেধ।
এসিজির পাশেই বসে ছিল রঘুপতি যাদব। হাতে যথারীতি কাগজপত্রের ফাইল। এ-ক’দিনের ধকলে বেচারার মুখেও ক্লান্তির ছাপ পড়েছে।
ওয়ার্কশপে গল্পপাঠের আসর বসেছে। প্রত্যেক লেখক নিজের লেখা পড়ে শোনাচ্ছেন। এই লেখা প্রত্যেকে লিখেছেন গত চারদিনের মধ্যে—অর্থাৎ, কনফারেন্স শুরু হওয়ার দিন থেকে তাঁরা লেখায় হাত দিয়েছেন।
এসিজি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। গল্প পড়ে শোনাচ্ছিল অনামিকা সেনগুপ্ত। গল্পের বিষয় লকড় রুম প্রবেলম। জানলা-দরজা বন্ধ একটা ঘরের ভেতরে একজন মানুষ মরে পড়ে আছে। বুকে বিঁধে আছে তীর। জানলা বা দরজায় এমন কোনও ফাঁক-ফোকর নেই যা দিয়ে তীর ছোড়া যায়।
এসিজির মনে পড়ে গেল কার্টার ডিকসনের লেখা ‘দ্য জুডাস উইন্ডো’ উপন্যাসটার কথা। সেখানেও সমস্যাটা একইরকম ছিল। আর সমাধান ছিল ভারি অদ্ভুত! দরজার হাতলের প্লেটের স্ক্রুগুলো খুলে ফেলেছিল খুনি। তারপর প্লেটসমেত হাতলটা সরিয়ে নিয়েছে। ফলে দরজার গায়ে যে-ছোট্ট ফোকর তৈরি হয়েছে তাতে ক্রসবো লাগিয়ে সে তীর ছুড়েছে নির্ভুল লক্ষ্যে। তারপর আবার হাতলটা লাগিয়ে দিয়েছে জায়গা মতো। অভিনব, তবে বড্ড কষ্টকল্পিত সমাধান।
কিন্তু অনামিকার সমাধানটা অনেক সহজ-সরল এবং বাস্তব। খুন হওয়ার আগে মানুষটা দাঁড়িয়ে ছিল দরজার বাইরে। হঠাৎই খুনির ছুড়ে দেওয়া তীর এসে লাগে তার বুকে। সেই অবস্থায় সে ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতরে। দরজা বন্ধ করে দেয়। জানলাগুলো সব আগে থেকেই বন্ধ করা ছিল। সুতরাং আহত লোকটি যখন ছটফট করতে-করতে বন্ধ ঘরের মধ্যে মারা যায়, তখনই তৈরি হয়ে যায় ‘বন্ধ ঘরের রহস্য’।
