‘তাই নাকি! তা হলে আপনি এক কাজ করুন। আপনার ঘরে চলুন, জার্নির ডিটেইলসটা আমাকে দিয়ে দিন। আমার সেজ শালা রেলে কাজ করে। আমি ওকে দিয়ে টিকিটটা করিয়ে আপনাকে বাড়িতে পৌঁছে দেব।’
‘তা হলে তো খুব ভালো হয়,’ হাসলেন প্রেমময় : ‘বুড়ো হাড়ে আর ধকল পোষায় না।’
ওরা চলে যাওয়ার পর ঘরে এখন মাত্র তিনজন লেখক : রতন বন্দ্যোপাধ্যায়, অনামিকা সেনগুপ্ত আর রঞ্জন দেবনাথ।
এসিজি রঘুপতি যাদবকে কাছে ডাকলেন। বললেন, ‘রঘুপতি, তুমি বরং ঘরগুলো সার্চ করার কাজ শুরু করে দাও। আমি এদিকে শেষ করে তারপর যাচ্ছি। তা না হলে শুধু-শুধু রাত হয়ে যাবে। তা ছাড়া তুমি এখন অনেককেই ঘরে পেয়ে যাবে।’
‘ওকে, স্যার।’ কাগজপত্র আর ফাইল গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল রঘুপতি।
এসিজি তখন অনামিকা আর রতনকে বললেন যে, রঞ্জন দেবনাথের সঙ্গে তিনি আলাদাভাবে কয়েকটা কথা সেরে নিতে চান।
রতন বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গে-সঙ্গে বিদায় নিলেন। যাবার আগে বললেন, ‘কোনওরকম দরকার হলে আমাকে খবর দেবেন…’
অনামিকাও চলে যাচ্ছিল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎই ও থমকে দাঁড়াল। ফিরে এসে রঞ্জনকে নীচু গলায় কী একটা বলল। তারপর চলে এল এসিজির কাছে—প্রায় মুখোমুখি।
‘মিস্টার গুপ্ত একটা কথা বলার ছিল।’
‘বোসো,’ একটা সোফায় ওকে বসতে বললেন এসিজি। নিজেও আর-একটা সোফায় বসে সিগারেট ধরালেন। তারপর : ‘বলো, কী বলবে—।’
অনামিকার নাকের ডগায় কয়েকটা সূক্ষ্ম ঘামের ফোঁটা। চোখ গভীর অথচ চঞ্চল। মাঝে-মাঝে আড়চোখে দেখছে রঞ্জনের দিকে।
‘দেবারতি ঠিক ক’টার সময় খুন হয়েছে বলুন তো?’
‘ভাস্করবাবু আর হোটেলের লোকজন যা বলছেন তাতে মনে হয় রাত সোয়া এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটার মধ্যে। কিন্তু হঠাৎ এ-প্রশ্ন?’
‘না, মানে, কাল রাতে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছিল। একটু আগে উৎপলদার কথা শোনার পরই ব্যাপারটা আমার অদ্ভুত মনে হচ্ছে।’
‘কী ব্যাপার?’
‘কাল রাতে উৎপলদা দেবারতির ঘরের কাছ থেকে চলে যাওয়ার মিনিট পাঁচ-সাত পর আমি দেবারতির কাছে গিয়েছিলাম…মানে, তখন এগারোটা বেজে বড়জোর পাঁচ-সাত কি দশ মিনিট হবে—’
এসিজি একটু উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। কী বলছে অনামিকা!
‘তোমার টাইমের ব্যাপারটায় কোনও ভুল নেই তো?’
অনামিকা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘না, না—আমি ঘড়ি দেখেছি।’
‘তুমি দেবারতির কাছে গিয়েছিলে কেন?’ এসিজি জানতে চাইলেন। সিগারেটে বারকয়েক ঘন-ঘন টান দিলেন।
‘আসলে…ওর সঙ্গে…’ একটু ইতস্তত করে অনামিকা বলল, ‘আমার একটু ইয়ে, মানে, ঝগড়া মতন হয়েছিল—ওই ইন্টারভিউ নেবার সময়। ওর কথায় আমি একটু মাথা গরম করে ফেলেছিলাম। পরে ভেবে দেখলাম, কাজটা ঠিক হয়নি। মানে, আমি তো সবে লেখালিখি করছি…”সুপ্রভাত”-এর রবিবারের পাতাতেও গল্প দিয়েছি। ওই পাতাটা যিনি দেখেন, মানে, রমাতোষ ভৌমিক, তাঁর সঙ্গে দেবারতি মানির রিলেশন বেশ ভালো। তাই মনে হল, ব্যাপারটা মিটমাট করে নিই। দেবারতি মনখোলা মেয়ে—ওকে বুঝিয়ে রিকোয়েস্ট করলে হয়তো আর কিছু মাইন্ড করবে না। সেইজন্যেই ওর ঘরে গিয়েছিলাম।’
একটু দম নিয়ে রুমালে নাক-মুখ আলতো করে মুছে অনামিকা আবার বলল, ‘তো দরজায় দাঁড়িয়ে কলিংবেল বাজিয়ে দেখি কোনও সাড়া নেই। তখন নব ঘুরিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করলাম। দরজা খুলল না—লক করা।’
‘ভেতর থেকে কোনও কথাবার্তার শব্দ পাওনি?’ প্রত্যাশায় চকচক করে উঠেছে বৃদ্ধ গোয়েন্দার চোখ।
‘না।’
‘কিন্তু আমার ধারণা, সেই সময়ে ঘরের ভেতরে দেবারতির সঙ্গে কেউ ছিল। সে-ই খুন করেছে দেবারতিকে।’
‘উঁহু, ওইখানেই তো যত গোলমাল।’
‘তার মানে? তুমি কি কিছু দেখেছ নাকি?’
আবার কিছুক্ষণ ইতস্তত করল অনামিকা। তারপর বলল, ‘না, কিছু দেখিনি। আর সেইজন্যেই তো ব্যাপারটার মধ্যে কেমন একটা হেঁয়ালি আছে বলে মনে হচ্ছে। ওর ঘর থেকে কোনওরকম সাড়াশব্দ না পেয়ে আমি দরজার চাবির ফুটো দিয়ে উঁকি মেরেছিলাম। দেখলাম, দরজার সোজাসুজি পশ্চিমের জানলাটা হাট করে খোলা। ঘরে আলো জ্বলছে—কিন্তু কেউ কোথাও নেই।’
‘হয়তো দেবারতি তখন টয়লেটে গিয়ে থাকতে পারে।’
‘না। কারণ চাবির ফুটো দিয়ে বাথরুমের দরজাটাও আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। ওটা খোলা ছিল। আর, বাথরুমে কোনও আলো জ্বলছিল না।’ মাথা নাড়ল অনামিকা : ‘না, মিস্টার গুপ্ত, তখন তিনশো আট নম্বর ঘরে কেউ ছিল না।’
মাথার চুলের গোছায় টান মারতে লাগলেন এসিজি। উঠে পড়লেন সোফার আরাম ছেড়ে। কী অদ্ভুত ব্যাপার! অনামিকা দেবারতির ঘরে কাউকে দেখেনি! অথচ তার পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই খুন হয়েছে মেয়েটা। তার মানে, উৎপলেন্দুবাবু চলে যাওয়ার ঠিক পরেই দেবারতি মানি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে, আবার অনামিকা চলে যাওয়ার পরে-পরেই ঘরে ফিরে এসেছে খুন হওয়ার জন্য। নাঃ, একেবারে অস্বাভাবিক!
এসিজির মগজের ভেতরে রুবিক কিউবের খুদে কিউবগুলো বনবন করে ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর একইসঙ্গে মাথা ঝিমঝিম করছিল তাঁর। ঘরেই ছিল না মেয়েটা, অথচ পট করে খুন হয়ে গেল!
রঞ্জন দেবনাথ এসিজির কাছে এগিয়ে এল। বলল, ‘থিঙ্কিং মেশিন, দিস ইজ আ রিয়েল প্রবলেম ফর ইউ।’ ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি।
‘আ-আমি তা হলে যাই…’ অনামিকা বলল।
এসিজির অন্যমনস্কতার ঘোর কেটে গেল হঠাৎ। একটু চমকে উঠেই বললেন, ‘হ্যাঁ—যাও।’
