‘সে-সাহস থাকলে অ্যাদ্দিনে আপনার মুখেভাত হয়ে যেত।’ কথাটা মনে পড়ে গিয়ে রাগে গা রি-রি করতে লাগল উৎপলেন্দুর।
রঘুপতি যাদব মাথা নীচু করে ডায়েরিতে কীসব নোট করছিল। সেদিকে আঙুল তুলে উঁচু গলায় বললেন উৎপলেন্দু, ‘ভালো করে লিখে নিন—যেন কিছু বাদ না যায়। এইমাত্র যা বললাম, সেই পরীক্ষা দিতেই ওর ঘরে কাল রাতে গিয়েছিলাম। দরজা খুললে বুঝিয়ে দিতাম, মুখেভাত হয়েছে কি হয়নি—।’
ভাস্কর রাহা উত্তেজিত উৎপলেন্দুকে শান্ত করার জন্য কাছে এগিয়ে এসেছিলেন। উৎপলের শেষ কথাটা শুনে অবাক হয়ে বললেন, ‘মুখেভাত! তার মানে!’
এসিজি আর রঘুপতিও একইসঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।
কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে উৎপলেন্দু বললেন, ‘ও কিছু নয়, আপনারা বুঝবেন না—’ তেতো হাসলেন তিনি : ‘তা মেয়েটা দরজা খোলেনি। হয়তো ঘরে অন্য কেউ ছিল। মেয়েটা তো একা শুতে পারত না। ওর কাছে সব মাসই ভাদ্রমাস।’
‘উৎপল! আপনি কি কাণ্ডজ্ঞান হারালেন!’ তিরস্কার করে উঠেছেন ভাস্কর। কারণ তিনি লক্ষ করেছেন, কিছুক্ষণ আগেই অনামিকা সরে গেছে সামনে থেকে। ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবি মনোযোগ দিয়ে দেখার ভান করছে। ওর খানিকটা পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে রঞ্জন দেবনাথ।
উৎপলেন্দুর মুখের ওপর দিয়ে লু বইছিল। অসহ্য এক তাপে তাঁর কান আর গাল যেন পুড়ে যাচ্ছিল। সম্পাদক-প্রকাশকদের উপেক্ষা আর অবহেলার অপমান তিনি সয়ে চলেছেন বহু বছর ধরে। কিন্তু তাই বলে একটা হাঁটুর বয়েসি মেয়ে-জার্নালিস্টের খোঁচাও তাঁকে একইভাবে সইতে হবে! সহ্যের একটা সীমা থাকা দরকার!
একটু সময় নিয়ে শান্ত গলায় অশোকচন্দ্র জিগ্যেস করলেন, ‘দেবারতির কথাবার্তা কি আপনার স্বাভাবিক মনে হয়েছিল?’
‘না, একটু জড়ানো মনে হয়েছিল—তবে সেটা বোধহয় ড্রিঙ্ক করার জন্যে।’
এসিজি ছোট্ট একটা শব্দ করলেন মুখ দিয়ে। মাথার চুলের গোছায় টান মারলেন দুবার। তারপর ধীরে-ধীরে বললেন, ‘উৎপলেন্দুবাবু, হিসেব মতো বলতে গেলে আপনার সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই দেবারতি মানি জানলা দিয়ে নীচে লাফিয়ে পড়েছে। তার মানে, ওই সময়ে কেউ যদি দেবারতির ঘরে থেকে থাকে তা হলে সে-ই ওকে খুন করেছে।’
‘তো যান, তাকে গিয়ে ধরুন…’ উৎপলেন্দু শব্দ করে শ্বাস ফেললেন। দেবারতির খুনি ধরা পড়ল কি পড়ল না তা নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা নেই। অসহ্য একটা বিরক্তি আর রাগ ফুলে-ফুলে উঠছিল তাঁর বুকের ভেতরে।
ভাস্কর রাহা এগিয়ে এসে উৎপলেন্দুর হাত ধরে আলতো করে টান মারলেন। বললেন, ‘চলুন, বাইরে যাই—’ তারপর এসিজিকে লক্ষ করে : ‘মিস্টার গুপ্ত, আমরা একটু বাইরের বারান্দায় যাচ্ছি। এখানে কেমন দম আটকে আসছে।’
ওঁদের দুজনকে দেখলেন এসিজি। তারপর ঘাড় নাড়লেন। অনেক ধকল যাচ্ছে এই দুই প্রবীণ লেখকের ওপর দিয়ে।
উৎপলেন্দু সেনকে নিয়ে ঘরের দরজার দিকে এগোলেন ভাস্কর রাহা। গত বিশটা বছর তিনি পথ হেঁটেছেন উৎপলের সঙ্গে। ওর মধ্যে কী সুন্দর একটা রসিক মানুষ ছিল। ক্রমাগত আঘাত পেয়ে-পেয়ে সেই মানুষটা রূঢ়ভাষী বেরসিক হয়ে গেছে।
মনে পড়ে, প্রায় আঠেরো-বিশ বছর আগে ‘মাসিক গোয়েন্দা’ পত্রিকার সম্পাদক তথা মালিক শুভব্রত চট্টোপাধ্যায়ের ছেলের পইতের নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছিলেন ওঁরা দুজনে। খেতে বসে সামনের একটা লম্বা করিডর দেখিয়ে উৎপলেন্দু বলেছিলেন, ‘বুঝলেন ভাস্করবাবু, ওটা হচ্ছে ”উৎপলেন্দু সেন সরণি”—।’
ভাস্কর ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারেননি। অবাক হয়ে বলেছিলেন, ‘মানে?’
উৎপলেন্দু খাওয়া থামিয়ে হেসে জবাব দিয়েছেন, ‘মানে আর কী! শুভব্রতদার কাগজে গত পাঁচ বছরে বিনিপয়সায় এত লেখা লিখেছি যে, ওগুলোর পাওনা টাকা দিয়েই ওঁর বাড়ির ওই করিডরটা তৈরি হয়েছে…সোজা বাংলায় ওই করিডরটুকুর মালিক আমি।’
এরপর প্রাণখোলা হেসে উঠেছেন দুজনে।
এখন ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে-যেতে ভাস্করের মনে হল, গত বিশ বছর ধরে উৎপলেন্দু সেন সরণির সব জায়গাতেই শুধু ব্যর্থতা, দুঃখ আর হতাশার তেতো ছাপ পড়েছে। আর উৎপলের সেদিনের সেই প্রাণখোলা হাসির সঙ্গে কবে থেকে যেন চাপা কান্না মিশে গেছে।
ভাস্কর আর উৎপলেন্দু ঘর থেকে চলে যেতেই উঠে দাঁড়ালেন প্রেমময় চৌধুরি। অশোকচন্দ্রের কাছে এসে বললেন, ‘আমি আসি, মিস্টার গুপ্ত। এতদিন ধরে রহস্য-গোয়েন্দা কাগজ চালাচ্ছি, তাই ব্যাপারটা নেশার মতো হয়ে গেছে। সেইজন্যেই এতক্ষণ ধরে আপনাদের কথাবার্তা শুনছিলাম। এখন যাই—খুব টায়ার্ড লাগছে। তা ছাড়া ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।’
এসিজি সৌজন্যের হাসি হাসলেন—কিছু বললেন না।
জ্যোতিষ্ক সান্যাল অর্জুন দত্তের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে চাপা গলায় বললেন, ‘বুঝেছেন, বুড়োর ”ওষুধ” খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। শালা এমন পাবলিক, আমার একটা গল্প নিয়ে সাত মাস ধরে চেপে বসে আছে।’
অর্জুন দত্ত শুধু বললেন, ‘চলুন, আমরাও যাই। আমার একটু লেখালিখির কাজ আছে।’
ওঁরা তিনজন প্রায় একসঙ্গেই বেরোলেন ঘর ছেড়ে। যেতে-যেতে জ্যোতিষ্ক প্রেমময়কে বললেন, ‘প্রেমদা, শুনলাম আপনি নাকি কী একটা কাজে সাতাশ তারিখে দিল্লি যাচ্ছেন—।’
‘হ্যাঁ, তিনদিনের জন্যে যাব…কিন্তু এখনও টিকিটটা কাটা হয়নি।’
