দেবারতি মোটেই রেগে যায়নি। খিলখিল করে হেসে বলেছে, ‘আপনি লেখা ছাপানোর জন্যে যতটা সিরিয়াস লেখার জন্যে মোটেই ততটা নন।’
এইখানেই শেষ হয়েছে অপমানজনক সাক্ষাৎকার। কারণ, জ্যোতিষ্ক সান্যাল যবনিকা টেনেছেন অকস্মাৎ। দেবারতির সামনে থেকে হনহন করে চলে গেছেন।
অর্জুন দত্ত আর রতন বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, তাঁদের ইন্টারভিউ নেহাতই মামুলি ছিল।
এসিজির গম্ভীর মুখ দেখে বোঝা গেল না, তিনি সে-কথা কতটা বিশ্বাস করলেন। তাঁর শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছিল : সকলের সঙ্গে কথা বলে দেবারতি মানির চরিত্র যতটুকু জানা গেছে, তাতে ও সাদামাঠা ইন্টারভিউ নেওয়ার মতো সাংবাদিক ছিল না। কিন্তু এখন তো আর সঠিক সত্য জানার উপায় নেই! তা ছাড়া দেবারতির ঘর থেকে পাওয়া শর্টহ্যান্ড নোটসগুলো রঘুপতি এর মধ্যে ডিসাইফার করিয়ে ফেলেছে। তাতে খাপছাড়াভাবে অনেক কথা লেখা আছে।
বিষয় : রহস্য-সাহিত্য আর রহস্য-সাহিত্যিক। তবে সেই নোটসগুলো ঠিক কোন-কোন লেখক সম্পর্কে সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
মোটামুটি হতাশ হয়ে অনামিকা সেনগুপ্তকে ইন্টারভিউর কথা জিগ্যেস করলেন অশোকচন্দ্র। কিন্তু কোনও লাভ হল না। অনামিকাও ‘মামুলি’ শব্দটার সাহায্য নিল।
অথচ সাক্ষাৎকারটা বোধহয় ঠিক মামুলি ছিল না, ভাবল অনামিকা।
‘আপনাকে লেখা ছাপানোর জন্যে খুব একটা কষ্ট করতে হবে না।’ মন্তব্য করেছিল দেবারতি মানি।
‘কেন?’ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল অনামিকা।
‘সম্পাদক, প্রকাশক, সিনিয়ার লেখক—দেখবেন, সবাই আপনাকে হেল্প করবে। আড়াল আর সুযোগ পেলে আপনার লেখা সামনে-পেছনে কারেকশন করে দেবে।’ প্রগলভ হাসি—যার সবটাই অর্থময় : ‘আপনাকে দেখতে-শুনতে খারাপ নয়। এ যেন ভগবানের দেওয়া লাখ টাকার চেক। শুধু ভাঙাবেন আর খাবেন। সেরকম কোনও পরিশ্রম করার দরকার নেই।’
‘আপনার উপদেশের জন্যে ধন্যবাদ—’ ঠোঁট টিপে জবাব দিয়েছে অনামিকা।
তারপর অনেক ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আক্রমণ করেছে দেবারতি। আর শেষ পর্যন্ত ইন্টারভিউটার ডাকনাম হয়ে গেছে ‘ঝগড়া’।
কিন্তু এসব কথা কি প্রকাশ্যে বলা যায়! তা ছাড়া খুনের সঙ্গে কী-ইবা সম্পর্ক আছে এর!
ঘরে হাজির সাতজন লেখককে জরিপ করলেন অশোকচন্দ্র। আপাতভাবে সবাইকেই খুব শান্ত আর স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, ওই প্রশান্ত অভিব্যক্তির আড়ালে চলেছে সর্বনাশা ঢেউয়ের উথালপাথাল।
অনিমেষ চৌধুরিকে ইন্টারভিউর কথা জিগ্যেস করা হয়নি—আর জিগ্যেস করে বোধহয় লাভও নেই। তবে অধ্যাপকের দেওয়া সূত্র ধরে উৎপলেন্দু সেনকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
রঘুপতিকে কাছে ডাকলেন এসিজি। চাপা গলায় বললেন, ‘এখানকার কাজ শেষ হলেই তুমি ঘরগুলো সার্চ করার কাজ শুরু করে দাও। ঘরের নম্বর ধরে লিস্ট তৈরি হলে তারপর তোমার ওই টাইম-চার্টগুলো নিয়ে আর একবার বসব।’ তারপর হঠাৎই যেন মনে পড়ে গেছে এমনভাবে : ‘আচ্ছা, পি.এম. রিপোর্টের খবর কী?’
‘কাল পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে ফোরেনসিক রিপোর্টও মিলে যাবে।’ রঘুপতি উত্তর দিল।
নিজের ঠোঁটে তর্জনী দিয়ে টোকা মারলেন এসিজি। মাথার পাকা চুলের গোছা টানলেন কয়েকবার। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ‘তা হলে কাল বাদ পরশু…সম্মেলনের শেষ দিন…।’
‘শেষ দিন কী, গুপ্তাসাব?’
‘ওই শেষ দিন আমাদেরও কাজ শেষ করতে হবে। পাখি ধরতে হবে, রঘুপতি, পাখি।’
রঘুপতি যাদব একটু অবাক চোখে তার পুরোনো ‘স্যার’-কে দেখল।
এইবার উৎপলেন্দু সেনের দিকে ঘুরে তাকালেন এসিজি। চোখ ছোট করে সিগারেটে টান দিয়ে হঠাৎই কেশে উঠলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘মিস্টার সেন, কাল রাতে আপনি ক’টায় শুতে গেছেন?’
একটু সময় নিয়ে ভেবে তারপর উত্তর দিলেন উৎপলেন্দু, ‘এই এগারোটা সাড়ে এগারোটা নাগাদ।’
‘শুতে যাওয়ার আগে দেবারতিকে আপনি ডাকতে গিয়েছিলেন?’
‘না, কেন বলুন তো?’ শান্ত স্বরে কথা বললেন উৎপল।
এসিজি বেশ কয়েক সেকেন্ড উৎপলেন্দুর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘মিথ্যে কথা বলার অভ্যেসটা আপনার কবে থেকে হয়েছে—লেখক হওয়ার আগে, না পরে?’
উৎপলেন্দু সেনের মুখ লাল হল। মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ।
‘আমরা খবর পেয়েছি, আপনি কাল রাত এগোরোটা নাগাদ দেবারতির ঘরের দরজায় গিয়ে ওকে ডেকেছিলেন। কী একটা রহস্যময় পরীক্ষার ব্যাপারে আপনাদের কথা হয়েছিল।’একটু থেমে এসিজি আবার যোগ করলেন, ‘স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, দেবারতি মানি আপনার সঙ্গেই শেষ কথা বলেছিল।’
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মুখ খুললেন উৎপলেন্দু সেন : ‘বুঝেছি, অনিমেষ চৌধুরি এসব খবর আপনাকে দিয়েছে…ওর ঘর দেবারতি মানির পাশেই। নির্ঘাত আড়ি পেতে সব শুনেছে…মেয়েছেলেরও অধম!’
উৎপলেন্দু ঘরে হাজির সকলের দিকে একবার তাকালেন। সবার সামনে কি বলা যায় কথাগুলো? বিশেষ করে অনামিকার সামনে? কিন্তু তাঁর বেলা তো সৌজন্য নিয়ে মাথা ঘামায়নি দেবারতি। তা হলে তিনি কেন মধ্যবিত্ত সৌজন্য নিয়ে সঙ্কোচ পাবেন? যা হওয়ার হাটের মাঝেই হোক।
‘দেবারতি মেয়েটা ভীষণ বাজে ছিল…।’
‘উৎপলদা, প্লিজ, একটু ভদ্রভাবে কথা বলুন!’ প্রতিবাদে মুখ খুলেছে রঞ্জন দেবনাথ।
‘সত্যি কথা চিরকাল একটু অভদ্রই শোনায়,’ উৎপলেন্দু প্রথমে রঞ্জনের দিকে তাকালেন, তারপর এসিজির দিকে : ‘এই কারণেই প্রথমে মিথ্যে বলেছিলাম, কারণ সত্যি কথা আপনারা সহ্য করতে পারবেন না। ভালো করে শুনুন—’ গলার স্বর কয়েক পরদা উঁচু হল তাঁর : ‘দেবারতি আমার পুরুষত্ব পরীক্ষা করতে চেয়েছিল…।’
