রঞ্জন দেবনাথ ঝটিতি ঘুরে তাকাল রঘুপতি যাদবের দিকে : ‘কেন, দড়ি বেয়ে সে নীচের তলার কোনও ঘরে পালিয়ে যেতে পারে না?’
‘তা হলে, পরে দড়ির গেঁটটা কে এসে খুলে দিয়ে যাবে সেটাও একটা প্রশ্ন—’ এই মন্তব্য করেছেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত।
রঘুপতি হেসে বলল, ‘কেন, ভগওয়ান এসে খুলে দিয়ে যাবেন! খুনির এই সঙ্কটে ওপরওয়ালা যদি তরস না খান, রহম না করেন, তা হলে তাঁর ওপর বিসওয়াস রেখে ফায়দা কী?’
ঘরের অনেকেই হেসে উঠলেন এ-কথায়।
রঞ্জন দেবনাথের মুখ লাল হল। উত্তেজনা আর অপমানে সে এক পা এগিয়ে গেল রঘুপতির দিকে।
রঘুপতি ওকে সাবধান করল : ‘রাইটার, ডোন্ট মেক এনি মিসটেক।’
এসিজি হাত তুলে শান্ত করতে চাইলেন রঞ্জনকে : ‘মিস্টার দেবনাথ, টেক ইট ইজি।’
‘একটা ফুটো পয়সার ইন্সপেক্টরের কাছ থেকে এর বেশি বুদ্ধি আমি আশাও করি না,’ রাগে থরথর করছে রঞ্জনের গলা : ‘কারণ আই. কিউ. খুব বেশি হলে বোধহয় পুলিশে চাকরি দেওয়া হয় না। কিন্তু মিস্টার গুপ্ত, আপনার কাছে থেকে এ-প্রশ্ন শুনব এটা ভাবিনি। মনে হয় আপনার থিঙ্কিং মেশিন বিগড়ে গেছে—রিপেয়ার করতে হবে।’
এসিজি একফোঁটাও বিচলিত হলেন না রঞ্জনের কথায়। শুধু ভাবলেন, দেবারতি মানির প্রেমিক এইবার আলটাহাই পোটেনশিয়ালের প্রদর্শনী শুরু করেছে। সুতরাং নতুন ফার্নিচার সংগ্রহের জন্য তিনি তাঁর মাথার কুঠরিটাকে তৈরি রাখলেন।
কিন্তু এগিয়ে এল রঘুপতি যাদব। শক্তির মোকাবিলা করার অভ্যেস ওর অছে। চোয়াল শক্ত করে ও বলে উঠল, ‘রাইটার কে বাচ্চে! বি কেয়ারফুল! পুলিশি দাওয়াই পড়লে এরপর থেকে হাতের বদলে পা দিয়ে লিখতে হবে। হুঁঃ, মুন্না আমার বুদ্ধিতে নোবেল প্রাইজ জিতে নিয়ে এসেছে!’
ভাস্কর রাহা অনেকক্ষণ মুখ বুজে থেকেছেন। আর পারলেন না। এসিজিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ‘অভদ্রতা ছাড়া কি খুনের তদন্ত করা যায় না, মিস্টার গুপ্ত? শুনেই দেখুন না রঞ্জন কী বলতে চায়—।’
এসিজি হাত তুলে শান্ত করলেন দুজনকেই। তারপর রঞ্জনকে লক্ষ করে বললেন, ‘বলুন, মিস্টার দেবনাথ, কী বলতে চান আপনি—।’
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করল রঞ্জন। তারপর নীচু গলায় বলতে শুরু করল, ‘আমি বহুদিন লিখিনি ঠিকই, তবে তা বলে গর্দভ হয়ে যাইনি। দড়ি বেঁধে নেমে পড়ার অনেক টেকনিক আছে। তারই একটা এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতে পারে। এই টেকনিকে দড়িটাকে ঠিক বাঁধার দরকার হয় না। ভারি এবং শক্ত কোনও জিনিসের ফাঁক দিয়ে দড়িটাকে ঠিক ছুঁচে সুতো পরানোর মতো করে ঢুকিয়ে দিতে হবে। তারপর তার দু-মাথা এক করে একসঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া যায় জানলা দিয়ে। সেই জোড়া দড়ি ধরে খুনি নেমে যেতে পারে নীচে—মানে, নীচের কোনও ঘরে। তারপর দড়ির একমাথা ধরে টান মারলেই সেটা সড়সড় করে চলে আসবে খুনির হাতে। যেমন ধরুন—’ ভাস্কর রাহার খাটের কাছে এগিয়ে গেল রঞ্জন দেবনাথ। একটা কারুকাজ করা ভারী পায়ার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘এই পায়াটাকে ঘিরেও দড়িটা পরানো যেতে পারে—কোনও অসুবিধে নেই। তখন ভগওয়ানকে আর তরস খেয়ে রহম করে কষ্ট করে দেবারতির ঘরে নেমে এসে দড়ির গেঁট খুলে দিয়ে যেতে হবে না—’শেষ কথাটা বাঁকা চোখে রঘুপতি যাদবের দিকে ছুড়ে দিয়ে বক্তব্য শেষ করল রঞ্জন।
‘আপনাকে অভিনন্দন জানাই, মিস্টার দেবনাথ,’ এসিজি হাসিমুখে প্রশংসা উপহার দিলেন রঞ্জনকে, ‘রূপেন মজুমদারও আমাদের জানলা দিয়ে খুনির পালানোর কথা বলেছিলেন, তবে এত সুন্দর করে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলতে পারেননি। কিন্তু সমস্যা হল, দেবারতির ঘরের জানলা দিয়ে নেমে খুনি শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়! হয় সে খোলা জানলা দিয়ে ঢুকে পড়বে ভাস্কর রাহা কিংবা অনির্বাণ ঘোষের ঘরে…অথবা, সে নেমে পড়বে একেবারে নীচে—ভাস্করবাবুর গাড়ির ওপরে। এ তিনটে পথই সমান বিপজ্জনক—কারণ, দেবারতির খুন নিঃশব্দে হয়নি।’ একটু দম নিয়ে মাথার চুলে বারতিনেক টান মেরে তারপর : ‘সে যা-ই হোক, আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।’
কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। খোলা জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। নীচ থেকে ভেসে আসছে র্যাপ মিউজিক—হোটেল ‘সিরাজ’-এর রেস্তরাঁয় আমোদ-প্রমোদ চলছে।
এসিজি একটা সিগারেট ধরিয়ে রঞ্জন দেবনাথকে দেবারতির ইন্টারভিউর কথা জিগ্যেস করলেন। কিন্তু ওর উত্তরে নতুন কোনও তথ্য পাওয়া গেল না।
জ্যোতিষ্ক সান্যাল একই প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, দেবারতি তাঁর ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় শুধুই খোঁচা দিয়েছে, অপমান করেছে।
সন্ধের ঠিক মুখোমুখি জ্যোতিষ্ক সান্যালকে ধরেছিল দেবারতি। কনফারেন্স রুমের বাইরের করিডরে একপাশে সরে গিয়ে কথা বলেছিলেন ওঁরা।
‘আপনি লেখেন কেন, মিস্টার সান্যাল?’
‘লিখতে ইচ্ছে করে, তাই—।’
‘কখনও মনে হয় না, শুধু-শুধু পাতার পর পাতা ভরিয়ে লিখে গিয়ে কী লাভ!’
‘না, মনে হয় না।’
চোখ ছোট করে, ঘাড় কাত করে হেসেছে রমণী। তারপর : ‘অনেক সিরিয়াস লেখক ভালো লিখতে চান, অথচ পারেন না। তাই তাঁরা লেখা ছেড়ে দেন। ভাবেন, এরকম লিখে কী লাভ! আর আপনাদের মতো লেখকদের লজিক ঠিক উলটো : আপনারা ভাবেন, লিখলে কী-ইবা ক্ষতি! তাই না?’
‘আপনি কি লেখকদের লেখার লাইসেন্স ইস্যু করার ঠিকে নিয়েছেন?’ জ্যোতিষ্ক বেশ বুঝতে পারছিলেন, ব্লাড প্রেশার ক্রমেই ওপর দিকে উঠছে।
