ঘরের সবাই এখন অশোকচন্দ্রের খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছেন। বাস্তবের এই গোয়েন্দা এবার কী নির্দেশ দেবে কে জানে!
‘যাঁদের নাম বললাম তাঁরা ছাড়া আর সবাই ইচ্ছে হলে চলে যেতে পারেন। তবে ভাস্করবাবু অবশ্যই থাকবেন। কারণ, ওঁর ঘরে আমরা অতিথি।’
ভাস্কর রাহা বিনীত হেসে অশোকচন্দ্রের দেওয়া সম্মান গ্রহণ করলেন। তারপর এগিয়ে গেলেন টেলিফোনের দিকে।
প্রেমময় চৌধুরি সোফায় যেমন বসে ছিলেন তেমন বসেই রইলেন। তাঁর দু-চোখে কৌতূহল আর শিরা-বের-করা আঙুলের ফাঁকে সিগারেট জ্বলছে।
উৎপলেন্দু, প্রীতম আর কল্পনা চুপচাপ চলে যাচ্ছিলেন ঘর ছেড়ে। অশোকচন্দ্র উৎপলেন্দুর পিঠে আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে বললেন, ‘আপনি থাকুন, উৎপলেন্দুবাবু। কয়েকটা কথা আছে আপনার সঙ্গে।
উৎপলেন্দু ছোট্ট করে ঘাড় হেলিয়ে বসে পড়লেন একটা সোফায়।
ভাস্কর রাহা অশোকচন্দ্রের কাছে এসে বললেন, ‘খবর দিয়েছি—ওরা আসছে।’
সিগারেটে শব্দ করে টান দিয়ে বারকয়েক কেশে উঠলেন অশোকচন্দ্র। তারপর গলা উঁচু পরদায় তুলে বললেন, ‘ভাস্করবাবু, সবার কাছে প্রশ্ন আমার একটাই : কীভাবে খুন হয়েছে দেবারতি মানি—।’
এসিজি প্রশ্নটা প্রথমে রাখলেন রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।
রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখেমুখে বেশ দুশ্চিন্তার ছাপ। প্রথম দিনের হাসিখুশি ফুলবাবু চেহারাটি আর নেই। আজ তাঁর বয়েস বোঝা যাচ্ছে।
রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাল্পনিক গোয়েন্দা শিবদাস সরখেল—অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারপতি। সিল্কের ড্রেসিং গাউন পরা পাইপ খাওয়া এই গোয়েন্দা যেন উত্তম-সুচিত্রার পুরোনো আমলের হিট ছবির বড়লোক নায়িকার রাশভারি পিতা। শিবদাস সরখেলের জনপ্রিয়তা করঞ্জাক্ষ রুদ্রের মতো মারাত্মক না হলেও মাঝারি গোছের বলা যায়।
রতন বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকবার চোখ পিটপিট করলেন। চোখের কোনও দোষ নয়, মুদ্রাদোষ। তারপর বলতে শুরু করলেন, ‘আমার গোয়েন্দা শিবদাস সরখেল হলে কী ভাবতেন সেটা বলি।’ সকলের মুখের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘ধরুন, দেবারতিকে খুন করার পর খুনি ওর চাবি দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে গোটা দরজাটাকে খুলে ফেলল ফ্রেম থেকে। দরজা লক করল চাবি দিয়ে। চাবি রেখে এল ঘরের ভেতরে, টেবিলে। তারপর বন্ধ দরজাটাকে ঠিকমতো সেট করে আবার স্ক্রু এঁটে বসিয়ে দিল দরজার ফ্রেমে।’
‘চমৎকার! চমৎকার!’ প্রশংসার সাধুবাদ জানালেন এসিজি : ‘কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, এই হোটেলের দরজাগুলো বন্ধ অবস্থায় স্ক্রু-র নাগাল পাওয়া যায় না। ওগুলো দরজা আর ফ্রেমের ভাঁজে লুকিয়ে পড়ে। শুধু এই হোটেলের কেন, বেশিরভাগ দরজার ডিজাইনই তাই। তবু আপনার মৌলিক চিন্তার জন্যে ধন্যবাদ।’
উৎপলেন্দু সেন সোফা ছেড়ে উঠে ভাস্কর রাহার কাছে গেলেন। রাহার কাছ থেকে লাইটার চেয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। এবং সেই সুযোগে চাপা গলায় তাঁকে বললেন, ‘মৌলিক চিন্তাই বটে! জন ডিকসন কারের ”ডেড ম্যানস নক” উপন্যাসে এ-নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।’
ভাস্কর রাহা কোনও জবাব না দিয়ে উৎপলকে ইশারায় থামতে বললেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে ঢুকলেন জোতিষ্ক সান্যাল আর অর্জুন দত্ত। আর তার কয়েক সেকেন্ড পরেই ইন্সপেক্টর রঘুপতি যাদব।
এসিজি ওঁদের তিনজনকেই স্বাগত জানালেন।
রঘুপতির হাতে একটা মোটাসোটা ফাইল ছিল। সেটা ইশারায় দেখিয়ে অশোকচন্দ্রকে একপাশে ডেকে নিল সে। ফাইলটা খুলে কিছু কাগজপত্র দেখিয়ে চাপা গলায় অনেকক্ষণ ধরে কীসব বলল। সব শুনে অশোকচন্দ্র কিছুক্ষণ থম মেরে রইলেন। তারপর হাত তুলে ইশারা করে জানালেন, পরে হবে।
এরপর এসিজি বাকি চারজনকে একে-একে একই প্রশ্ন করলেন : কেমন করে খুন করা হয়েছে দেবারতি মানিকে? ওঁরা একে-একে উত্তর দিলেন।
অনামিকা সেনগুপ্ত : ‘আমার মনে হয়, খুন করার পর খুনি ওই ওয়ার্ডরোব অথবা বাথরুমের ভেতরে লুকিয়ে ছিল। তারপর দরজা ভাঙাভাঙি হইচই সব মিটে গেলে সে লুকিয়ে সটকে পড়ে।’
জ্যোতিষ্ক সান্যাল : ‘ব্যাপারটা সত্যি-সত্যি সুইসাইড নয়তো! দেবারতি মানি হয়তো আমাদের নাকাল করার জন্যে একটা চরম মশকরা করে গেছেন!’
অর্জুন দত্ত : ‘সরি, আমি কিছু ভেবে উঠতে পারছি না। ব্যাপারটা আমার কাছে ইম্পসিবল প্রবলেম হয়েই রয়ে গেছে।
সবার শেষে রঞ্জন দেবনাথ। ওর উত্তর এসিজিকে নাড়া দিল। এমনকি চমকে দিল আর সবাইকেও।
রঞ্জন দেবনাথ ইতিমধ্যেই বোধহয় ধাক্কা সামলে উঠেছে। এসিজি লক্ষ করেছেন, একটু আগেই ও গায়ে হাত ছুঁইয়ে অনামিকাকে ডেকে হেসে কী একটা বলেছে। তা ছাড়া এখন ওকে বেশ স্মার্ট সুন্দর দেখাচ্ছে। উজ্জ্বল দুটো চোখে ঝিলিক মারছে আত্মবিশ্বাস।
অশোকচন্দ্র রঞ্জনের ‘অন্ধকারে বাঘবন্দী খেলা’, ‘পায়ের শব্দ নেই’ এবং ‘খুনির নাম অজানা’—সবক’টা লেখাই পড়েছেন। বেশ ভালো লেখা। এই সাহিত্যের প্রথম সারিতে জায়গা করে নেওয়ার ক্ষমতা যে ওর আছে সেটা বোঝা যায়। ওর লেখা থেকে সবসময় একটা অদৃশ্য শক্তি ঠিকরে পড়ে চারিদিকে।
‘দরজা লক করা হয়েছিল ভেতর থেকে—’ রঞ্জন সিরিয়াস সুরে বলল, ‘আর খুনি পালিয়েছে জানলা দিয়ে।’
হাততালি দিয়ে উঠল রঘুপতি যাদব। আজ সকাল থেকে এই লকড রুম প্রবলেমের কত উদ্ভট সমাধান যে তাকে শুনতে হল তার কোনও হিসেব নেই। জন ডিকসন কারের বইতেও বোধহয় এত ভ্যারাইটি পাওয়া যেত না! রঘুপতি ক্রমেই ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছিল। সুতরাং এবার ও মুখ খুলল : ‘সাবাশ, রাইটারসাহেব, বহত খুব। খুনি তা হলে খিড়কি দিয়ে উড়ে পালিয়েছে!’
