‘শ-শ-শ। আস্তে—’ ঠোঁটে আঙুল তুলে এসিজিকে সাবধান করলেন অনিমেষ। বললেন, ‘সাবধানে বলুন, কেউ হয়তো ওভারহিয়ার করে ফেলতে পারে।’ তারপর চারপাশে একবার সতর্ক নজর বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আমি তখন একটা ক্লাস সেভেনের ইতিহাস বইয়ের প্রূফ দেখছিলাম…।’
‘তারপর?’
‘…ভাবছি কে ধাক্কা দিচ্ছে, এমন সময় শুনতে পেলাম উৎপলেন্দু সেনের গলা। দেবারতি মানিকে ডাকছেন। কী যেন পরীক্ষা করার বিষয়ে কীসব বলছেন। ওঁর গলা জড়ানো ছিল, তাই কথাগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। কিন্তু মিস মানির উত্তরটা পরিষ্কার শুনতে পেয়েছি আমি। উনি একটু ধরা গলায় চেঁচিয়ে বললেন, ”মাতাল অবস্থায় এ-পরীক্ষা দেওয়া যায় না। যান, ঘরে গিয়ে বোতল নিয়ে শুয়ে পড়ুন।” ব্যস, আর কিছু শুনতে পাইনি আমি। তবে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, মাতাল অবস্থায় কোন পরীক্ষা দেওয়া যাবে না। আমিও তো লেখাপড়া নিয়েই আছি—জীবনে কম পরীক্ষা দিতে হয়নি। আর পরীক্ষার খাতাও কম দেখি না। মাতাল অবস্থায় যে-কোনও পরীক্ষাই শক্ত। তা উৎপলেন্দুবাবু রাত এগারোটায় দেবারতিদেবীর ঘরে কী পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন কে জানে!’
‘ধন্যবাদ, অনিমেষবাবু,’ অশোকচন্দ্র অমায়িক হাসলেন : ‘আপনার মতো সহযোগিতা সকলের কাছ থেকে পেলে এতক্ষণে খুনি ধরা পড়ে যেত।’
‘উৎপলেন্দুবাবু কিন্তু খুন করেননি—’ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলে উঠলেন অনিমেষ চৌধুরি, ‘ওঁকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। আর…ওঁকে…ইয়ে, বলবেন না যে, এ-খবরটা আমি দিয়েছি—’ একটু চুপ করে থেকে সময় নিয়ে : ‘যতই বন্ধু হোক, সত্যি কথা তো আর গোপন রাখা যায় না!’
দেবারতি মানিকে জীবিত অবস্থায় শেষ কে দেখেছিল? ভাবলেন অশোকচন্দ্র গুপ্ত। গতকাল আটটা নাগাদ রত্মাবলী মুখোপাধ্যায়ের ঘরে কফি নিয়ে গিয়েছিল একজন বেয়ারা। তখন দেবারতি ইন্টারভিউ নিচ্ছিল। এরপর পৌনে নটা নাগাদ দেবারতিকে রূপেন মজুমদারের ঘরে ঢুকতে দেখেছেন জ্যোতিষ্ক সান্যাল। সেটাও ইন্টারভিউর ব্যাপার ছিল বোধহয়। তারপর, রাত সাড়ে নটা নাগাদ, ওকে দেখা যায় করিডোরে দাঁড়িয়ে রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলছে। আর সব শেষে পাওয়া খবর অনুযায়ী, রাত দশটার সময় ঘরে ডিনার চেয়ে পাঠায় দেবারতি, সঙ্গে ড্রিঙ্কস। ব্যস, এইটুকুই।
কিন্তু এখন প্রফেসর চৌধুরি যা বলছেন তাতে উৎপলেন্দু সেনই বোধহয় দেবারতিকে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখেছেন—মানে, ওর সঙ্গে কথা বলেছেন।
অশোকচন্দ্রের কপালের ভাঁজ ঘন হল। এখনও তো অনিমেষ চৌধুরিকে নিয়ে মোট ছ’জন লেখকের সঙ্গে তাঁর কথা বলা বাকি। তাঁদের কথা থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কোনও নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
‘আচ্ছা, অনিমেষবাবু, দেবারতি কীভাবে খুন হয়েছিল বলতে পারেন?’
থতমত খেয়ে গেলেন অধ্যাপক। তারপর সতর্ক চোখে এপাশ-ওপাশ দেখে নিয়ে পানের পিক ফেললেন একটা টবের গোড়ায়। কয়েক সেকেন্ড ধরে ‘উম-ম’ শব্দ করে অবশেষে বললেন, ‘আমি জীবনে গোয়েন্দা গল্প লিখেছি একটাই : আমার লেখা প্রথম গল্প। তারপর থেকে শুধু কল্পবিজ্ঞান আর…।’
‘পিশাচতন্ত্র, তাই তো!’ হাসলেন এসিজি : ‘আপনার লেখা আমি পড়েছি। বলতে দ্বিধা নেই, আপনি পিশাচসিদ্ধ। কিন্তু তবুও যদি আমাকে একটু সাজেশন দিয়ে সাহায্য করেন।’
অধ্যাপক চৌধুরি কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘এটা ভিনগ্রহের কোনও প্রাণীর কীর্তি নয়তো!’
অশোকচন্দ্র অতি কষ্টে হাসি চাপলেন। কিন্তু তাঁর মগজের ভেতরে একটা কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল : অধ্যাপক অনিমেষ চৌধুরি হয় নিপাট ভালোমানুষ, নয়তো ধুরন্ধরের জাসু। তিনি স্বাভাবিক সুরে বললেন, ‘থ্যাংক ইউ প্রফেসর, আমি তা হলে এবার আসি।’
অধ্যাপক চৌধুরি হাত তুলে থামালেন এসিজিকে : ‘একটা কথা, মিস্টার গুপ্ত। আমি এই মার্ডারের ব্যাপারে কিছু তথ্য জোগাড় করেছি। ওগুলো আপনাকে দেব।—যদি আপনার কোনও কাজে লাগে। কাজে লাগলে কিন্তু আমার হেল্প করার ব্যাপারটা সবাইকে বলবেন—মানে, অ্যাকনলেজ করবেন…।’
এসিজি একটু অবাক চোখে ভদ্রলোককে দেখলেন। আশ্চর্য! এত নাম-ডাক খ্যাতি হওয়া সত্ত্বেও কী নির্লজ্জ খ্যাতিলোভাতুর।
‘এ-ব্যাপারে পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব,’ বলে অধ্যাপককে এড়িয়ে গেলেন অশোকচন্দ্র।
অনিমেষ চৌধুরি তাঁকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু এসিজি দ্রুতপায়ে পিঠটান দেওয়ায় সে-সুযোগ আর পেলেন না।
তিনতলায় ভাস্কর রাহার দুশো আট নম্বর ঘরের দরজা খোলাই ছিল। এসিজি সপ্রতিভ পায়ে ঢুকে পড়লেন ঘরে।
জমজমাট আসরে বোধহয় কনফারেন্স চলছিল অথবা দেবারতির রহস্যময় মৃত্যুর ব্যাপার নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল, এসিজিকে দেখেই নিমেষে সব স্তব্ধ। ঘরের আবহাওয়া থমথমে হয়ে গেল পলকে।
ভাস্কর রাহা জ্বলন্ত চুরুট হাতে কিছু একটা বলছিলেন। তাঁকে ঘিরে বসে-দাঁড়িয়ে রতন বন্দ্যোপাধ্যায়, অনামিকা সেনগুপ্ত, রঞ্জন দেবনাথ আর প্রেমময় চৌধুরি। খানিকটা দূরে একা একটা সোফায় বসে উৎপলেন্দু সেন কী একটা লেখায় চোখ বোলাচ্ছেন। আর জানলার কাছে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে উঁকি মেরে কী যেন দেখছিল প্রীতম নন্দী। পাশে দাঁড়িয়ে ওর সঙ্গে বোধহয় কথা বলছিলেন কল্পনা সেন।
‘ডিসটার্ব করার জন্যে দুঃখিত, ভাস্করবাবু। আপনাদের কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা বলা বাকি আছে—সেটা এখন সেরে নিতে চাই।’ কথাগুলো বলে অশোকচন্দ্র গুপ্ত পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে কী যেন দেখলেন। তারপর : ‘রতন বন্দ্যোপাধ্যায়, অনামিকা সেনগুপ্ত, রঞ্জন দেবনাথ, জোতিষ্ক সান্যাল আর অর্জুন দত্ত। শেষ দুজন ঘরে নেই দেখতে পাচ্ছি…ভাস্করবাবু, যদি কাইন্ডলি ওঁদের একটু খবর পাঠান এ-ঘরে আসার জন্যে। কথা দিচ্ছি, খুব সংক্ষেপে কাজ সারার চেষ্টা করব।’
