হাসল দেবারতি মানি : ‘কার পেছনে কখন কোন হাত থাকে কে জানে!’
কী বলতে চাইছে মেয়েটা? কাল কনফারেন্সে এই মেয়েটাই না হাততালি দিয়ে তাঁর গল্পের প্রশংসা করছিল!
দরজায় মিষ্টি সুরে কলিংবেল বেজে উঠল।
এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে চলে গেল দেবারতি। দরজা খুলল। কফি এসে গেছে। উর্দি পরা বেয়ারা কফির কাপ সাজিয়ে দিয়ে গেল রত্নাবলীর সামনে, টেবিলের ওপরে।
দেবারতি ফিরে এল নিজের জায়গায়। কোনও কথা না বলে কফির কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দিল।
আবার শুরু হল প্রশ্ন : ‘আপনার লেখায় এত পুরুষালী ভাব কেন?’
‘কী করে জানব! এরকম কথা আগে কেউ বলেনি।’
‘প্রেমময় চৌধুরির সঙ্গে এককালে আপনার সম্পর্ক ছিল?’
হাসলেন রহস্য-সম্রাজ্ঞী : ‘ছিল কেন, এখনও আছে—লেখক সম্পাদক সম্পর্ক।’
‘ও—’ একটু থমকে গেল দেবারতি মানি। তারপর : ‘তা হলে রঞ্জন দেবনাথের সঙ্গে সম্পর্কটা কিসের?’
মেয়েটা আমার মনের ক্ষতচিহ্নগুলো বেছে নিচ্ছে একে একে। আচ্ছা, মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কেন? রঞ্জন দেবনাথের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তিনি কখনও অস্বীকার করেননি, এখনও করলেন না। সেকথাই স্পষ্ট করে বললেন সাংবাদিককে।
সিগারেটে গভীর টান দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া ছাড়ল দেবারতি। তারপর থুতনি সামান্য উঁচু করে বলল, ‘ধরুন, আপনাকে রবীন্দ্র পুরস্কার দিয়ে আবার কেড়ে নেওয়া হল। তখন আপনার কেমন লাগবে?’
হঠাৎ কেন যেন বিস্ফোরণ ঘটে গেল রত্নাবলীর মাথার ভেতরে। অপমানে লাল চোখমুখ নিয়ে কাঁপা হোঁচট খাওয়া গলায় বললেন, ‘ধরুন, এক্ষুনি আপনাকে গলা ধাক্কা দিয়ে এই ঘর থেকে বের করে দেওয়া হল। তখন আপনার কেমন লাগবে?’
জ্বলন্ত সিগারেটটা কফির কাপে আচমকা ডুবিয়ে দিল দেবারতি। ‘ছ্যাঁক’ করে শব্দ হল একটা। তারপর ঘাড় কাত করে তাকাল : ‘নাঃ, আপনার আই. কিউ. সত্যিই কম! সেটা এখন আরও বেশি করে বোঝা যাচ্ছে।’
রত্নাবলী আর থাকতে পারলেন না। সপাং করে মুখের মতো জবাব দিলেন, ‘আই. কিউ. কী করে বাড়বে বলুন! আমার মা তো আর হোটেলে গান গাইত না—আর বাবারও মদের দোকান ছিল না!’
‘নীচুজাতের গালাগালিতে সাংবাদিকদের ধৈর্য হারালে চলে না,’ উঠে দাঁড়িয়েছে দেবারতি : ‘নমস্কার, মিসেস মুখোপাধ্যায়। আবার আমাদের দেখা হবে—সময় মতো।’
কথা শেষ করে আর দাঁড়ায়নি দেবারতি। হনহন করে চলে গেছে দরজার বাইরে। আর যাওয়ার সময় দড়াম করে বন্ধ করে দিয়ে গেছে ঘরের দরজা।
এরই নাম সাধারণ কথাবার্তা! একটু আগে অশোকচন্দ্রকে তিনি সেরকমই বলেছেন।
‘আপনার এই ডিসেন্সি নিয়ে কী করে আপনি ওই সব ভয়ঙ্কর প্যাঁচালো গোয়েন্দা-কাহিনিগুলো লেখেন! ভাবতে অবাক লাগে, মিসেস মুখার্জি।’
অশোকচন্দ্র গুপ্ত বিজ্ঞানী হতে পারেন, গোয়েন্দা হতে পারেন—কিন্তু উনি জানেন না, বাইরে যে যা-ই হোক, মেয়েরা আসলে মেয়েই।
আট
হোটেল ‘সিরাজ’-এ এসিজি আবার যখন পা দিলেন তখন সন্ধে সাতটা।
দুপুর পর্যন্ত কাজ সেরে বিদায় নিয়েছিলেন এসিজি আর রঘুপতি। তারপর ঘণ্টা চার-পাঁচ যা সময় পেয়েছেন তার খানিকটা কেটেছে বিশ্রামে, আর বাকিটা খরচ হয়েছে হোমওয়ার্কের পিছনে। বিশেষ করে পাঁচকড়ি দে আর এডগার ওয়ালেসের লেখাগুলো খতিয়ে দেখার জন্য বেশ কয়েকটা লাইব্রেরিতে এসিজি ঢুঁ মেরেছেন। এই দুই লেখকের নাম উচ্চারণ করে কোনও সূত্র দেওয়ার চেষ্টা করেছে দেবারতি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই ছিল ওর ফাজলামি? মনে-মনে যেন একটা রুবিক কিউব নাড়াচাড়া করছিলেন অশোকচন্দ্র। কিউবের ছ’টা পিঠে খুদে কিউবগুলো তাদের নানান রং নিয়ে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে। কিউবে ঠিকঠাক মোচড় দিয়ে খুদে কিউবগুলোকে নিয়ে আসতে হবে ঠিক-ঠিক জায়গায়। তবেই পাওয়া যাবে হারানিধি নকশা। তখনই বোঝা যায়, কীভাবে খুন হয়েছে দেবারতি মানি, কে খুন করেছে ওকে, আর কেনই বা খুন করেছে।
রঘুপতি যাদব তার কাজ করে গেছে নির্ভুলভাবে। দশজন লেখকের দশটা ঘরের সঙ্গে যুক্ত বেয়ারাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সে একেবারে ভাজা-ভাজা করে ছেড়েছে। তারপর প্রত্যেকটা ঘরের নম্বর লিখে সে হাসপাতালের বেডের মতো প্রতিটি ঘটনার আনুমানিক টাইম-চার্ট তৈরি করেছে। সেই চার্ট সামনে রেখে বহুক্ষণ বুঁদ হয়ে ছিলেন এসিজি, কিন্তু রুবিক কিউবের নকশা মেলেনি।
হোটেলের রিসেপশনে তাঁর দেখা হয়ে গেল অনিমেষ চৌধুরির সঙ্গে। ভদ্রলোক কেমন যেন সন্দেহজনকভাবে এদিক-সেদিক ঘুরঘুর করছিলেন। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি।
এসিজিকে দেখেই তিনি একেবারে আঁতকে উঠলেন। কাছে এসে বললেন চাপা গলায়, ‘আমি একটা সিক্রেট জানি—।’
হোটেলের লবিতে রঙিন টিভি চলছে। সোফায় গা ডুবিয়ে অনেকেই সেই ছোট পরদায় মন দিয়ে বসে আছেন। লবির বাঁ দিকে একটা বড় প্যানেলে সিরামিক টাইলসের বিমূর্ত কাজ। তার ঠিক নীচেই সুদৃশ্য টবে সাজানো রয়েছে কয়েকটা গাছ।
অশোকচন্দ্রের পাঞ্জাবির হাতা ধরে তাঁকে সেদিকে নিয়ে যেতে চাইলেন অধ্যাপক। এসিজি মনে-মনে প্রমাদ গুনলেন : ‘আবার সিক্রেট!’
পান চিবোতে-চিবোতে অধ্যাপক এসিজির কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললেন, ‘কাল রাত এগারোটা নাগাদ দেবারতি মানির ঘরের দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছিল।’
‘আপনি তখন কী করছিলেন?’ এসিজি জিগ্যেস করলেন। তিনি জানেন, অধ্যাপক চৌধুরির ঘর দেবারতির ঘরের ঠিক পাশেই।
