‘না, না, সবাই তা নন,’ আপত্তি জানিয়ে মাথা নাড়লেন এসিজি। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বললেন, ‘সবাই যে একরকম হয় না তার জলজ্যান্ত প্রমাণ দেবারতি। ও খুন হয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে, আপনাদের দশজন লেখকের মধ্যে অন্তত একজন কাগজ-কলম হোক কিংবা বাস্তব, দু-জায়গাতেই অনায়াসে খুন করতে পারেন।’
‘কী শকিং ভাবুন তো!’ রত্নাবলীর মুখে ভয়ের ছায়া পড়ল।
‘শকিং—কিন্তু সত্যি।’ ঠান্ডা গলায় বললেন অশোকচন্দ্র। তারপর একটু সময় নিয়ে : ‘দেবারতি কি কাল-পরশু আপনার কোনও ইন্টারভিউ নিয়েছিল, মিসেস মুখার্জি?’
‘হ্যাঁ, কাল রাত আটটা সাড়ে আটটা নাগাদ ও আমার ঘরে এসেছিল কথা বলতে। নেহাতই সাধারণ কথাবার্তা হয়েছিল। নাইনটি ওয়ান আর নাইনটি টু-তে পরপর দু-বছর রবীন্দ্র পুরস্কারের ফাইনাল লিস্টে আমার একটা উপন্যাসের নাম উঠেছিল। সেটা নিয়েই ও বেশি কথাবার্তা বলেছিল…আমার রিঅ্যাকশন জানতে চাইছিল।’
‘ধন্যবাদ, মিসেস মুখার্জি। আপনি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বোঝাই যাচ্ছে। এখন গিয়ে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিন। দরকার হলে পরে কথা বলব।’
অতএব ‘সভা’ শেষ।
লোহার পায়ে ঘরের কার্পেট অতিক্রম করে দরজার কাছে এলেন রত্নাবলী। মনে হল যেন দরজা পেরোলেই মুক্তি। কিন্তু কিসের হাত থেকে মুক্তি?
দরজা পেরিয়ে করিডর। তারপর শ্লথ পায়ে সিঁড়ির দিকে। তাঁর ঘরটা পাঁচতলায়, না পাঁচশো তলায়? ভুরুর কাছটা এখনও ব্যথা করছে। আর মনে পড়ছে বেপরোয়া প্রাণোচ্ছল মেয়েটার কথা। কাল রাতে ইন্টারভিউ নেবার সময় ব্যক্তিগত আক্রমণই ছিল দেবারতির প্রধান হাতিয়ার। মনেই হচ্ছিল না, কনফারেন্সের প্রথম দিনে মেয়েটা তাঁর গল্পের অমন প্রশংসা করেছিল।
ঘড়িতে তখন কটা হবে? সাড়ে সাতটা কি পৌনে আটটা। নিজের ঘরে অনামিকার সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন, এমন সময় দরজার কলিংবেল বেজে উঠেছে।
অনামিকা উঠে গিয়ে দরজা খুলেই দেখে দেবারতি মানি। একটা কালো কর্ডের প্যান্ট আর হলুদ টি-শার্ট পরে আছে। হাতে সিগারেট।
ওকে দেখে হাসল দেবারতি। একটু ভারি গলায় বলল, ‘হাই—।’
অনামিকাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে এল দেবারতি। কোনওরকম ভূমিকা না করেই বলল, ‘মিসেস মুখার্জি, আপনার একটা ইন্টারভিউ নিতে এলাম। আপনাদের সবার ইন্টারভিউ নিয়ে একটা স্টোরি করব।’
রত্নাবলী হেসে ওকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, আর অনামিকাকে বলেছেন, ‘অনামিকা, তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব। ওঁর সঙ্গে কাজটা একটু সেরে নিই।’
অনামিকা আর দাঁড়ায়নি, চলে গেছে নিজের ঘরে। দেবারতি মেয়েটাকে দেখলেই ওর কেমন অস্বস্তি হয়। ওর সামনে থেকে সরে গিয়ে অনামিকা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
এরপর শুরু হয়েছে ইন্টারভিউ।
টেলিফোন করে রুম সার্ভিসকে কফি দিতে বলেছেন রত্নাবলী। দেবারতির মদ খাওয়ার দুর্বলতা তিনি জানেন…সকলেই জানে। কিন্তু রত্নাবলী কফির কথাই বললেন, কফির বদলে হুইস্কি বললে সৌজন্যটা বদলে যেতে পারে তোয়াজে। অন্তত লোকে তাই ভাববে।
কাগজ-কলম আর জ্বলন্ত সিগারেট যুত করে বাগিয়ে প্রথম প্রশ্ন করল দেবারতি, ‘আপনার লেখায় বিদেশি প্রভাব কতটুকু, মিসেস মুখার্জি?’
হাসলেন রত্নাবলী : ‘এমন নয় যে বলা যাবে চুরি করেছি। মানে, স্টাইল, ফর্ম এসবের প্রভাব আছে।’
‘মেইনস্ট্রিম লিটারেচার ছেড়ে হঠাৎ এই অপরাধ-সাহিত্যে এলেন কেন?’
‘ভালো প্রশ্ন করেছেন।’ কপালের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দিলেন রত্নাবলী : ‘ছোটবেলা থেকেই দেখতাম বাড়িতে ”মাসিক রোমাঞ্চ” পত্রিকা রাখা হত। ওগুলো পড়তাম। ভালো লাগত। তারপর হঠাৎই, ১৯৪৬ নাগাদ, হাতে এল ”রহস্য রোমাঞ্চ”—সম্পাদক বিমল কর—গত বিশ বছর ধরেই যিনি মেইনস্ট্রিম লিটারেচারের ফিনোমিনন। এই পত্রিকার গল্পগুলো পড়ে বেশ অন্যরকম লাগল। তখন আমার বয়স কত? এই উনিশ কি বিশ। মনে হল, লেখালিখি করলে এইরকম গল্প-টল্পই লিখব। তারপরই আমি টুকটাক লিখতে শুরু করি। বছর তিন-চারেকের মধ্যে কয়েকটা গল্প ছাপাও হল ”মাসিক রোমাঞ্চ” পত্রিকায়।’ সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন রত্নাবলী। তারপর : ‘ঠিক মনে পড়ছে না…বোধহয় পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় সাহিত্যিক কমলকুমার মজুমদার ”তদন্ত” নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেছিলেন। তখন আমি মোটামুটি লিখি। ওই কাগজে আমার একটা গল্প বেরিয়েছিল—।’
মুচকি হেসে দেবারতি জিগ্যেস করল, ‘এই সাহিত্য করেন বলে কোনওরকম ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্সে ভোগেন?’
মিষ্টি শব্দ করে হাসলেন রত্নাবলী। বললেন, ‘কেন, কমপ্লেক্সে ভুগব কেন? শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমল কর, কমলকুমার মজুমদার, সমরেশ বসু—এঁরা যখন রহস্য-গোয়েন্দা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তখন আমার ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্সটা আসবে কোথা থেকে! বরং সুপিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স যদি আমার থাকত তাহলে সেটা খুব একটা দোষের হত না।’
দেবারতি খুশি হয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘আপনার গল্পগুলো পড়ে আপনাকে যেরকম ইন্টেলিজেন্ট মনে হয় আসলে আপনি ততটা ইন্টেলিজেন্ট নন। আই. কিউ.-র ঘাটতি আছে। এর কারণ কী?’
অপমানে মুখ লাল হয়ে গেছে রত্নাবলীর। কী জবাব দেবেন এই অভদ্র দোআঁশলা ক্রাইম জার্নালিস্টের অশালীন প্রশ্নের? রাগে কপালের পাশের শিরা দপদপ করে উঠেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কাণ্ডজ্ঞান হারাননি রত্নাবলী। সংযত গলায় বলেছেন, ‘আপনার মনে হওয়ার ওপরে তো আমার হাত নেই—।’
