অশোকচন্দ্রকে দেখে বিভ্রান্ত বলে মনে হচ্ছিল। অতএব রঘুপতি যাদবও মোটামুটি দিশেহারা। তবে এটা ঠিক, আর দু-তিন দিনের মধ্যে যদি সে কাউকে অ্যারেস্ট করতে না পারে তাহলে প্রচুর ঝামেলা হবে, হইচই হবে।
রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় কেমন এক টেনশনে ভুগছিলেন। উৎপলেন্দু আর রূপেন চলে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর ভীষণ একা একা লাগছে। ভুরুর কাছটা টনটন করছে। বোধহয় চশমার পাওয়ার পালটেছে। আর বুকের ভেতরটা কেমন ধড়ফড় করছে। গত সপ্তাহে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। এখন সেই ওষুধ চলছে। গাদা-গুচ্ছের ট্যাবলেট। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে। দুপুরে সামান্য কিছু খেয়ে ওষুধ খেতে হবে। তারপর বিশ্রাম। আজ আর কনফারেন্সে যাবেন না। তাতে খুব একটা ক্ষতিও নেই। কারণ আজ তাঁর শুধু শ্রোতার ভূমিকা। কিন্তু কেন যেন শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। এখন অশোকচন্দ্র তাঁকে কী জিগ্যেস করবেন কে জানে!
‘মিসেস মুখার্জি’, এসিজি পায়চারি থামিয়ে ঘুরে তাকিয়েছেন রত্নাবলীর দিকে : ‘জানি, আপনার খুব ক্লান্ত লাগছে। তাই পাঁচ মিনিট কথা বলেই আপনাকে আমি ছেড়ে দেব। আপনার কাহিনির নায়ক গোয়েন্দা করঞ্জাক্ষ রুদ্রের নাম আজ সব পাঠকের মুখে মুখে ফেরে। আপনার খ্যাতি প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে চলে গেছে। করঞ্জাক্ষ রুদ্র ক্ষুরধার বুদ্ধির মালিক হলেও আসলে সে-বুদ্ধি আপনারই কাছ থেকে ধার করা। সুতরাং আপনার কাছেই আমি জানতে চাইছি, দেবারতি কীভাবে খুন হয়েছে।’
রত্নাবলী একেবারে বালিকার মতো অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন, যেন চাকরির ইন্টারভিউতে তাঁকে খুব শক্ত প্রশ্ন করা হয়েছে। শাড়ির নীল পাড়ের কাছটায় আলতো করে নখের আঁচড় কাটতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর বিব্রতভাবে হেসে তিনি মিহি গলায় বলতে শুরু করলেন, ‘মানে, এক্ষুনি হুট করে কিছু বলা সম্ভব নয়…তবে…ইয়ে, ভেবে দেখা যেতে পারে।’ আবার কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপর : ‘ধরা যাক, খুনি দেবারতির সঙ্গে ওর ঘরে ছিল। আর, ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল। একথা-সেকথা বলতে বলতে ওরা দুজনে ওই জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর খুনি আচমকা ওকে এক ধাক্কা মেরে জানলা দিয়ে ফেলে দেয় নীচে। খুনের ঠিক পরেই খুনি ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাই টেবিলের আধখোলা বই বা কাগজপত্রের দিকে ঠিকমতো খেয়াল করেনি। সোজা দরজা খুলে সে চলে এসেছে বাইরে। দরজায় চাবি দিয়ে চলে গেছে নিজের ঘরে।’
‘লেকিন ওই টেবিলের ওপরে যে-চাবিটা পাওয়া গেল সেটা এল কোথা থেকে—’ প্রশ্ন করেছে রঘুপতি।
ওর দিকে সরল চোখে তাকালেন রত্নাবলী। আলতো গলায় বললেন, ‘খুনি একটা নকল চাবি তৈরি করে সেটা দিয়ে দরজা লক করে চলে গেছে। আর আসল চাবিটা রেখে গেছে ওই টেবিলের ওপরে।’
অশোকচন্দ্র বেশ একটু হতাশভাবেই দেখছিলেন রত্নাবলীকে। ওঁর গল্প-উপন্যাসে করঞ্জাক্ষ রুদ্রের যে-ক্ষুরধার বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায় সেই তুলনায় এই সমাধানটা যেন বড্ড সাদামাঠা। অবশ্য ডিকসন কারের বইতেও বন্ধ ঘরের রহস্যের এ-জাতীয় সাদামাঠা সমাধানই পাওয়া যায়। কিন্তু তা হলেও…। বরং অবাস্তব হলেও রূপেন মজুমদারের ‘ডাকিনীর হাতছানি’-র সমাধান অনেক অভিনব।
এসিজি জিভ দিয়ে ছোট্ট একটা শব্দ করলেন। মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘ধন্যবাদ, মিসেস মুখার্জি। তবে আমার ধারণা, দেবারতি মানির খুনের ঘটনা ঘটে গেছে হঠাৎই। মানে, আগে থেকে কোনওরকম পরিকল্পনা খুনির ছিল না। যদি সত্যিই তাই হয়ে থাকে তা হলে নকল চাবি তৈরি করার ব্যাপারটা খুব সলিড গ্রাউন্ডের ওপরে দাঁড়াচ্ছে না।’ একটু চুপ করে থেকে অস্পষ্ট স্বরে তিনি বললেন, ‘হয়তো দেবারতি মানির সিক্রেট যাতে ফাঁস না হয়, তার জন্যেই খুনিকে খুনটা করতে হয়েছে। ওই সিক্রেটটা জানতে পারলেই খুনের মোটিভ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে।’
রত্নাবলী কোনও কথা বললেন না। হঠাৎই ঘুমে তাঁর চোখ জড়িয়ে আসছিল। ভাবছিলেন, ‘কখন শেষ হবে এই জিজ্ঞাসাবাদ? দেবারতিকে নিয়ে এত কথা এত আলোচনা আর একটুও ভালো লাগছে না। নিজে খুন হয়ে মেয়েটা আমাদের কী বিপদেই না ফেলে গেছে!’
‘আচ্ছা মিসেস মুখার্জি, এই কনফারেন্সে যেসব রাইটার এসেছেন তাঁদের কারও সঙ্গে মিস মানির ইশক ছিল—মানে, ভালোবাসা ছিল?’ নীল আকাশ থেকে বজ্রপাতের মতো প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েছে রঘুপতি।
এ-ব্যাপারে এসিজি গতকালই হোটেলের লোকজনের কাছে খোঁজখবর নিয়েছেন। তাতে মোটামুটিভাবে একটা নাম তিনি পেয়ে গেছেন। তাই সে-বিষয়ে লেখকদের কাউকে আর কোনও প্রশ্ন করেননি। কিন্তু রঘুপতি বোধহয় সে-ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হতে চায়।
স্পষ্টতই রত্নাবলীর ফরসা মুখ লালচে হয়। কয়েক সেকেন্ড মাথা নীচু করে বসে রইলেন তিনি। তারপর আমতা-আমতা করে বললেন, ‘সেরকমভাবে কিছু জানি না, তবে…রঞ্জন দেবনাথের সঙ্গে ওকে প্রায়ই দেখা যেত। আপনারা রঞ্জন দেবনাথকে বরং জিগ্যেস করে দেখবেন—।’
রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের সুন্দর মন আর শালীনতাবোধ এসিজিকে অবাক করল। মাথার চুলের গোছায় টান মেরে তিনি বললেন, ‘আপনার এই ডিসেন্সি নিয়ে কী করে আপনি ওইসব ভয়ঙ্কর প্যাঁচালো গোয়েন্দা-কাহিনিগুলো লেখেন! ভাবতে অবাক লাগে, মিসেস মুখার্জি।’
রত্নাবলী মুখ তুলে সরাসরি দেখলেন বৃদ্ধ হুনুরের দিকে। ধীরে ধীরে বললেন, ‘মিস্টার গুপ্ত, আমরা, গোয়েন্দা-কাহিনির লেখকরা, বোধহয় অদ্ভুত জাতের মানুষ। কাগজে-কলমে তাঁরা অনায়াসে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা ঘটাতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে ওইসব ঘটনার মুখোমুখি হলে তাঁরা আপাদমস্তক শিউরে ওঠেন। ফলে অদ্ভুত এক পরস্পর-বিরোধী মানসিকতা নিয়ে তাঁদের দিন কাটাতে হয়…।’
