রূপেন মজুমদার চোখের পলকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। আমতা-আমতা করে এসিজিকে বললেন, ‘খুনটা হয়েছিল জানলা দিয়ে। ছুরির হাতলে নাইলনের দড়ি বেঁধে খুনি ছুরিটা ছুড়ে মেরেছিল মেয়েটাকে লক্ষ করে। তারপর কাজ হাসিল হয়ে যেতেই দড়ি টেনে ছুরিটা নিয়ে পালিয়ে গেছে।’
‘বাঃ, কায়দাটা বেশ নতুন তো! ডিকসন কারের কোনও গল্পে এরকম ইনজিনিয়াস মোডাস অপার্যানডাই-এর কথা বলা নেই—’ প্রশংসা করলেন রত্নাবলী। কিন্তু উৎপলেন্দুর যেন মনে হল, ওঁর প্রশংসার মধ্যে কোথায় যেন বিদ্রূপের তীর লুকোনো রয়েছে।
প্রশংসায় রূপেন মজুমদার খানিকটা বেপরোয়া হয়ে ঢাক পেটাতে শুরু করলেন : ‘তাহলেই দেখুন, ওই সাহেবের চেয়ে বুদ্ধিতে আমি কিছু কম যাই না! তা ছাড়া আমার গল্পে এরকম গরাদ ছাড়া জানলা আর দু-দিক থেকেই লক করা যায় এমন সাহেবী দরজা ছিল না। এসব থাকলে খুনের কায়দা তৈরি করা তো জলের মতো সহজ!’ নাটকীয়ভাবে একটু থামলেন রূপেন মজুমদার। তৃপ্তির অহঙ্কার আর এক চিলতে হাসি তাঁর চোখেমুখে। পাতলা হয়ে আসা মাথার চুল ডান হাতের আলতো ছোঁয়ায় ঠিক করে নিলেন। তারপর সরাসরি তাকালেন এসিজির চোখে।
এসিজি বেশ বুঝতে পারছিলেন, অহঙ্কারে ভদ্রলোকের আলুথালু অবস্থা। অফিসে রূপেন মজুমদারের অধীনে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের হয়তো বাধ্য হয়ে ওঁর লেখা বই কিনতে হয়। আর অসহায়ভাবে সবিস্তারে শুনতে হয় একজন মৌলিক প্রতিভার নানান কৃতিত্বের কথা।
‘ওই জলের মতো সহজ ব্যাপারটা যদি দয়া করে আমাদের খুলে বলেন—’, অশোকচন্দ্র বিনয়ের সুরে কথাটা বলেছেন বটে, কিন্তু সেটা যে পুরোপুরি বিনয় নয় তা বুঝতে কোনও অসুবিধে হয় না।
রূপেন মজুমদার নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিলেন, ‘কেন, খুনি খুন করেছে, ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করেছে। তারপর চাবিটা ওই টেবিলের ওপরে রেখে জানলা দিয়ে পালিয়ে গেছে। এ-হোটেলের কোনও ঘরের জানলাতেই গরাদ নেই—ওটাই তো সাহেবি জানলার সুবিধে।’
গতকাল রাতে ঘটনাস্থলে এসে সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখেছেন এসিজি। রূপেন মজুমদার যত সহজ ভাবছেন, এই ঘরের জানলা দিয়ে পালানো তত সহজ নয়। কারণ জানলার বাইরে কার্নিশ বলতে কিছু নেই। তা ছাড়া জানলা দিয়ে পালাতে গেলে নীচে দাঁড়ানো লোকজনের চোখে পড়ে যাওয়ার ভয় আছে।
যেসব কিছু না বলে এসিজি ধন্যবাদ জানালেন মৌলিক রহস্য-লেখককে।
উৎপলেন্দু অনেকক্ষণ ধরেই উসখুস করছিলেন কিছু একটা বলার জন্য। এখন ফাঁক বুঝে কথা বললেন, ‘রূপেনবাবু, একটা কথা তখন থেকে ভাবছি। আপনার ”ডাকিনীর হাতছানি”-তে খুনি ওই নাইলনের দড়ি বাঁধা অবস্থায় ছুরিটা ঠিকমতো টিপ করে ছুড়তে পারল!’
রূপেন মজুমদার বিজ্ঞের মতো হেসে চটপট জবাব দিলেন, ‘খুনি তো সার্কাসের নাইফ-থ্রোয়ার ছিল, সেইজন্যেই ব্যাপারটা ইজি হয়ে গেছে। আপনাকে তো ”ডাকিনীর হাতছানি” বই দিয়েছিলাম, পড়েননি?’
উৎপলেন্দু একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমার ভাইপোকে পড়তে দিয়েছিলাম। ওর খুব ভালো লেগেছিল। তারপর ও যে কাকে পড়তে দিল…’ রূপেন মজুমদার গম্ভীর হয়ে গেলেন। এসিজিকে লক্ষ করে বললেন, ‘আমি একটু উঠব। ঘরে যেতে হবে। কাজ আছে।’
‘একটা কথা, মিস্টার মজুমদার। কাল বা পরশু দেবারতি কি আপনার কোনও ইন্টারভিউ নিয়েছিল?’
ভাস্কর রাহার মন্তব্য মনে পড়ল রূপেন মজুমদারের। তাই বললেন, ‘হ্যাঁ, পাঁচ-দশ মিনিট কথা বলেছিল। একেবারেই, মামুলি ইন্টারভিউ।’
‘ঠিক আছে, এবার আপনি যেতে পারেন,’ এসিজি রূপেন মজুমদারকে অনুমতি দিলেন। তখন উৎপলও অস্পষ্টভাবে এসিজিকে কী যেন বললেন। তারপর রূপেন মজুমদার আর উৎপলেন্দু সেন রওনা হলেন ঘরের দরজার দিকে।
যেতে-যেতে রূপেন উৎপলেন্দুকে বলছিলেন, ‘বুঝলেন, ওয়ার্কশপের জন্যে একটা নতুন আইডিয়া ভেবেছি। এমন লিখব না, সাহেবদেরও তাক লেগে যাবে…।’
ভদ্রলোকের ‘সাহেব’ নিয়ে অবসেশনটা এল কোথা থেকে? ভাবছিলেন উৎপলেন্দু। ওঁর অফিসের ডিরেক্টরদের মধ্যে দু-তিনজন সত্যিকারের সাহেব এখনও আছে বলে ওঁর মুখেই শুনেছেন। অবসেশনটা সেই কারণে বলে তো মনে হয় না। তাহলে কি রূপেন মজুমদার আগের জন্মে-স্বাধীনতা-সংগ্রামী ছিলেন?
অশোকচন্দ্র গুপ্ত আবার নতুন সিগারেট ধরিয়েছেন। ঘরের সিলিং-এর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছিলেন। এর মধ্যেই অনেক তথ্য পেয়েছেন তিনি। কিন্তু সব তথ্যের সঠিক অর্থ এখনও স্পষ্ট নয়। তার জন্য কিছুটা হোমওয়ার্ক দরকার।
তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছিলেন। রঘুপতি যাদব দূর থেকে তার ‘স্যার’-কে লক্ষ করছিল। সে গোয়েন্দা কাহিনির তেমন ভক্ত না হলেও এটুকু বুঝতে পারছে, স্যারের এবারের লড়াইটা অন্যরকম। যাঁরা কাগজে-কলমে সকাল বিকেল ‘খুন’ করেন, সেরকম দশজন লেখকের সঙ্গে বুদ্ধির লড়াই। কাল রাত থেকে এখন, এই মুহূর্ত পর্যন্ত রঘুপতি কম নোটস নেয়নি। সেগুলো ঠান্ডা মাথায় বসে খতিয়ে দেখা দরকার। দেবারতি মানি ‘সুপ্রভাত’-এর আপকামিং ক্রাইম জার্নালিস্ট ছিল। নেহাত কম বিখ্যাত ছিল না। আজকের সব কাগজেই ওর মারা যাওয়ার খবর ছাপা হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত ব্যাপারটাকে ‘আত্মহত্যা’ বা ‘দুর্ঘটনা’-র মোড়কে রাখা হয়েছে। তা ছাড়া এই খুনের সুপারফাস্ট সলিউশনের জন্য পলিটিক্যাল প্রেসারও আসতে শুরু করেছে।
