উর্দি পরা দুজন বেয়ারা ব্রেকফাস্ট নিয়ে ঘরে এসে ঢুকতেই থেমে গেল রঘুপতি। আয়তাকার ব্রেকফাস্ট টেবিলে খাবার-দাবারগুলো নামিয়ে নীচু গলায় ‘ম্যানেজারসাব পাঠিয়ে দিলেন।’ বলে তারা চলে গেল।
চোখের সামনে খাবার দেখে খিদেটা টের পেলেন সকলে। ভাস্কর রাহা রত্নাবলীর দিকে একপলক তাকালেন। এবং সঙ্গে-সঙ্গেই ‘বাংলা সাহিত্যের আগাথা ক্রিস্টি’ প্রথাগত বাঙালি গৃহিণী হয়ে গেলেন। খাবারের প্লেটগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে দিতে লাগলেন প্রত্যেকের হাতে।
রঘুপতি যাদব আবার পড়তে শুরু করল,
‘…আমি যে তাঁকে চিনে ফেলেছি সেটা প্রথমটায় বুঝতে দিইনি। কিন্তু তাঁর ইন্টারভিউ নেবার সময় তিনি বোধহয় আমার ঘেন্না রাগ এগুলো সাসপেক্ট করতে পেরেছেন। তবে আই ডোন্ট কেয়ার। আজ রাতেই আমি সেই লেখককে সরাসরি সব জানিয়ে দেব। জানিয়ে দেব, কনফারেন্সের শেষ দিনে ডায়াসে উঠে আমি তাঁর সবকিছু ফাঁস করে দেব। এরকম একটা শয়তানির পানিশমেন্ট হওয়া দরকার। তা ছাড়া এতগুলো বছর ধরে…।’
থামল রঘুপতি। বলল, ‘লেখাটা এখানেই শেষ।’ তারপর কাগজটা আবার রেখে দিল অন্যান্য কাগজপত্রের সঙ্গে।
রত্নাবলী ওর হাতে ব্রেকফাস্টের প্লেট তুলে দিলেন। তারপর নিজের প্লেটটা নিয়ে এসিজির কাছাকাছি একটা সোফায় বসলেন।
অশোকচন্দ্র হাতের সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে খাওয়া শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল চিন্তায় ডুবে আছেন।
বাকি সবাই চুপচাপ খাচ্ছিলেন। বোধহয় ভাবছিলেন দেবারতির শেষ লেখাটার কথা। কে সেই বিশ্বাসঘাতক লেখক? কী বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সে?
‘লেখাটা আর একটু থাকলে হয়তো জানা যেত দেবারতি মানি কোন লেখক সম্পর্কে অভিযোগ করছিল।’ খেতে-খেতেই হঠাৎ বললেন রূপেন মজুমদার।
এই মন্তব্যের জবাব দিল রঘুপতি : ‘লেখাটার শেষের দিকে দু-লাইন মতো হিজিবিজি করে কেটে দেওয়া। সেখানে কী লেখা ছিল কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না। তবে আমরা কালি কমপেয়ার করে দেখেছি—কাটাকুটিটা মিস মানির পেন দিয়েই করা হয়েছে। হো সকতা হ্যায় কে মিস মানি লাইন দুটো কেটে দিয়েছেন, নহী তো…’
‘তার মার্ডারার—’ রঘুপতির অসম্পূর্ণ কথা শেষ করলেন রত্নাবলী।
‘অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট, মিসেস মুখার্জি।’ এসিজি বললেন। তারপর ঘুরে তাকালেন উৎপলেন্দু সেনের দিকে : ‘মিস্টার সেন, এটাই আমাদের ডেফিনিট প্রমাণ। আশা করি আপনার আর কোন সংশয় নেই। তবে এ ছাড়াও বাড়তি কয়েকটা ইনডায়রেক্ট প্রূফ আমাদের হাতে আছে। যেমন, ওই টেবিলে একটা বই আধখোলা অবস্থায় পড়ে ছিল—’
‘কী বই?’ প্রশ্ন করলেন রূপেন মজুমদার।
ভাস্কর রাহাও কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইলেন অশোকচন্দ্রের দিকে। খুন হওয়ার আগে কী বই পড়ছিল মেয়েটা?
অশোকচন্দ্রের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। তৃপ্তির ছোট্ট শব্দ তুলে তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাতের খালি প্লেটটা ব্রেকফাস্ট টেবিলের এক কোণে রেখে মিসেস মুখোপাধ্যায়ের দিকে তাকালেন। মুখে সৌজন্যের হাসি ফুটিয়ে অনুরোধের সুরে বললেন, ‘মিসেস মুখার্জি, যদি কাইন্ডলি আমাদের চায়ের ব্যবস্থাটা করেন—।’
টেবিলে টি-পট, মিল্ক পট, শুগার কিউব এবং সুদৃশ্য পেয়ালা-পিরিচের সেট রাখাই ছিল। সুন্দর করে হেসে আরও একবার গৃহিণী হয়ে গেলেন রত্নাবলী। তাঁকে দেখে মনেই হচ্ছিল না, তাঁর বয়েস আর কোনওদিন পঁয়ষট্টিতে পা দেবে না। তিনি সপ্রতিভভাবে চলে এলেন ব্রেকফাস্ট টেবিলের কাছে। চায়ের আয়োজন শুরু করলেন।
‘মিস্টার গুপ্ত, কী বই পড়ছিল দেবারতি?’ ভাস্কর রাহা প্রশ্ন করলেন এবার।
অশোকচন্দ্র মাথার চুলে হাত চালালেন। আপন খেয়ালেই মাথা নাড়লেন এপাশ ওপাশ। তারপর বললেন, ‘খুব ইন্টারেস্টিং বই। ”দ্য মার্ডার অফ রজার অ্যাকরয়েড”—আগাথা ক্রিস্টির লেখা।’ একটু থেমে মাথাটা বাঁ দিকে সামান্য হেলিয়ে এসিজি আচমকা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন : ‘বইটা ইন্টারেস্টিং বললাম কেন বলুন তো?’
তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন উৎপলেন্দু সেন, ‘ ”ড. ওয়াটসন” অ্যাজ মার্ডারার—এটাই বইটার বিশেষত্ব। যে-চরিত্র ”আমি” হয়ে গল্পটা বলছে, সে-ই খুনি। আর মজা হল, গল্প বলার সময় খুন করার ব্যাপারটাও সে কায়দা করে পাঠককে বলে গেছে।’ একটু থেমে উৎপল ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললেন, ‘আরও একটা কারণে বইটা উল্লেখযোগ্য—।’
‘কেন?’ জিগ্যেস করেছে রঘুপতি যাদব।
উৎপল উত্তর দিলেন অশোকচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে, ‘এই বইটা থেকে গল্প মেরে বিখ্যাত লেখক নীহাররঞ্জন গুপ্ত ”ঘুম নেই” নামে একটা ”ওরিজিন্যাল” উপন্যাস লিখে গেছেন।’ খুকখুক করে হেসে কথা শেষ করলেন উৎপলেন্দু সেন।
রত্নাবলী একে-একে সকলের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়েছেন, নিজেও নিয়েছেন। তারপর বসেছেন গিয়ে দেবারতির বিছানায়।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এসিজি বললেন, ‘উৎপলেন্দুবাবু দেখছি নির্ভুল খবর রাখেন। আর আপনি বলেছেনও ঠিক : এই বইটা আগাথা ক্রিস্টির অন্য সব বইয়ের চেয়ে আলাদা। সেইজন্যেই ব্যাপারটা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়েছে।’
‘এবারে আসা যাক দেবারতি মানির লেখাটার প্রশ্নে—’ শব্দ করে কাপে চুমুক দিলেন অশোকচন্দ্র : ‘লেখাটা থেকে আমরা কয়েকটা বেসিক ইনফরমেশন পাচ্ছি। এক : দেবারতি মানির চোখে আপনাদের দশজনের মধ্যে একজন বিশ্বাসঘাতক—বেইমান। সুতরাং, শুনতে খারাপ লাগলেও এই কনফারেন্সে ইনভাইটেড দশজন লেখকের মধ্যে কোনও একজন দেবারতিকে—খুন করেছেন…।’
