রূপেন মজুমদার একটু-একটু করে ভয় পাচ্ছিলেন। ভয় পাচ্ছিলেন ভাস্কর রাহাও। ধীরে-ধীরে, একটু-একটু করে, ওঁদের উলঙ্গ সত্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রকাশক, সম্পাদক আর সাংবাদিকরা সন্দেহের আওতার বাইরে চলে গেলেন। বাকি রইলেন দশজন লেখক। শুধু দশজন লেখক।
‘ভাস্করবাবু, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। আমাদের মধ্যে কেউ এই জঘন্য কাজ করতে পারে না।’ রূপেন মজুমদার নীচু গলায় নিজের অবিশ্বাসের কথা ভাঙলেন রাহার কাছে।
ভাস্কর রাহা কিছু বলে ওঠার আগেই জ্বলে উঠল রঘুপতি যাদব। বেপরোয়া সুরে সে বলে উঠল, ‘মিস্টার রাইটার, ডোন্ট ট্রাই টু প্লে সন্ত যুধিষ্টির। এখানে সন্ত কেউ নেই—সারে কে সারে পাপী হ্যায়। কিঁউ, গুপ্তাসাব?’ শেষের কথাটা এসিজিকে উদ্দেশ্য করে, তাঁর সমর্থনের আশায়।
রত্নাবলী একটু সিঁটিয়ে গেলেন। উৎপলেন্দুর গলাটা কেমন শুকিয়ে গেছে। একটু ভিজিয়ে নিতে পারলে ভালো হত।
এসিজি এবারে আর উত্তেজিত রঘুপতিকে সামাল দেবার চেষ্টা করলেন না। বরং রঘুপতির কথা যেন শুনতেই পাননি এমন ভান করে বলে চললেন, ‘ফ্যাক্ট নাম্বার টু : যে-ই হোক একজন দেবারতি মানিকে সেই খবরটা দিয়েছে। তিন : দেবারতি সেই বেইমান লেখকটিকে চিনত। চার—দেবারতি তার ইন্টারভিউ নিয়েছে। ঠিক কবে কখন ইন্টারভিউটা ও নিয়েছিল সেটা লেখা না থাকলেও অনুমানে মনে হয়, গত দু-দিনের মধ্যে এই হোটেলেই ও ইন্টারভিউটা নিয়েছে। কারণ, ওর কাগজপত্র ঘেঁটে আমরা কিছু শর্টহ্যান্ড নোটস পেয়েছি—সেগুলো আমরা ডিসাইফার করতে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়েছি।’
একটু দম নিলেন এসিজি। চায়ের কাপ খালি হয়ে গিয়েছিল। সেটা টেবিলে আলতো করে নামিয়ে রেখে উদাস চোখে তাকালেন জানলার বাইরে। সেখানে দূরের ঘরবাড়ি, টিভি অ্যান্টেনা, পাম গাছের পাতা, নীল আকাশ আর চড়া রোদ্দুর। জানলার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। শান্ত স্বরে শেষ কয়েকটা কথা বললেন, ‘লাস্ট এবং পাঁচ নম্বর ইনফরমেশন হল, কাল রাতে হয়তো সেই বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে দেবারতির একটা মোকাবিলা হয়েছিল। হয়তো এই ঘরেই। তারপর…তারপর ”নটে গাছটি মুড়োল”।’
ঘরের সবাই চুপ। শুধু কারও কারও চায়ের কাপে শেষ চুমুকের শব্দ।
কিছুক্ষণ পর অশোকচন্দ্র পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালেন। তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে সিগারেট এবং চুরুট ধরালেন উৎপলেন্দু এবং ভাস্কর। ওঁদের দুজনের কপালেই চিন্তার ছাপ। নাকি দুশ্চিন্তার ছাপ?
কুলকুল করে ধোঁয়া ছাড়লেন অশোকচন্দ্র। কাশির দমক এল হঠাৎ। কাশলেন কয়েকবার। ঊর্মিলা সামনে থাকলে নির্ঘাত হাত থেকে সিগারেটটা ছিনিয়ে নিত। ওর মায়ের স্বভাব পেয়েছে। ওর মা চলে গেছে প্রায় ন’বছর। কিন্তু এই একটা ব্যাপারে ঊর্মিলা সেই শূন্যস্থানটা বুঝতে দেয়নি। অথচ হাতে জ্বলন্ত সিগারেট না থাকলে কি থিঙ্কিং মেশিন কখনও কাজ করতে পারে!
অনেকক্ষণ পর অশোকচন্দ্র গুপ্ত কথা বললেন আবার, ‘আমাদের যা বলার মোটামুটি বললাম। এবার আপনাদের পালা। ভাস্করবাবু, আপনাকে দিয়ে কি আমরা এখনই শুরু করতে পারি?’
ঘরের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় একেবারে ডুবে ছিলেন ভাস্কর রাহা। এসিজির কথায় চমকে উঠে ফিরে তাকালেন তাঁর দিকে। দুচোখে প্রশ্ন।
এসিজি আবার কথাটা বললেন।
অদ্ভুত হতাশার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন ভাস্কর রাহা। ক্লান্ত স্বরে বললেন, ‘বলুন, কী জানতে চান।’
ঘটনার সবচেয়ে নোংরা অস্বস্তিকর অংশ শুরু হল তাহলে এইবার। ভাবলেন রত্নাবলী। কিন্তু মিস্টার গুপ্ত কি আমাদের সামনেই ভাস্করবাবুকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন? আলাদাভাবে হলে কি ব্যাপারটা ভালো হত না!
অশোকচন্দ্র একটা সোফা টেনে নিলেন বিছানার দিকে, ভাস্কর রাহার কাছাকাছি। মেঝেতে কার্পেট থাকায় কোনওরকম শব্দ হল না। সোফায় আরাম করে বসে পায়ের ওপর পা তুলে সিগারেটে টান দিলেন। চোখ থেকে সরু ফ্রেমের চশমাটা খুলে শূন্যে উঁচু করে ধরে অদৃশ্য কিছু একটা দেখার চেষ্টা করলেন। তারপর চশমাটা আবার ঠিকঠাক করে বসালেন নাকের ওপরে। বারকয়েক নাক কুঁচকে ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে ধীরে-ধীরে বললেন, ‘ভাস্করবাবু, আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আবেগ আছে। একটু আগে উৎপলেন্দুবাবু সে-প্রমাণ দিয়েছেন। তা সেই আবেগগুলো হল ইলেকট্রিক পোটেনশিয়ালের মতো। দুটো মানুষের মধ্যে যখন সম্পর্ক তৈরি হয় তখন তাদের আচরণ কীরকম হবে সেটা নির্ভর করে তাদের পোটেনশিয়াল বা আবেগের ওপরে। অর্থাৎ, কোনও কন্ডাক্টরের দুটো পয়েন্টের মধ্যে পোটেনশিয়াল ডিফারেন্সের মান অনুযায়ী যেমন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়—অনেকটা সেইরকম আর কী! আপনারা, লেখকরা, সাধারণত আবেগপ্রবণ মানুষ। আপনাদের প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে তীব্র আবেগ—হাই পোটেনশিয়াল। এই তীব্র আবেগ থেকেই হয়তো ঘটে গেছে দেবারতি মানির খুনের ঘটনা। ঘটনার পর খুনি হয়তো অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছে, অনুতাপে সে হয়তো মর্মাহত, কিন্তু…’ একটু থামলেন এসিজি। তারপর : ‘কিন্তু আমার কিছুই করার নেই। রঘুপতি যাদব অনেক আশা নিয়ে আমাকে ডেকে এনেছে।’
ভাস্কর রাহা নীরবে চুরুটে টান দিচ্ছিলেন। এসিজি তাঁকে এখনও কোনও প্রশ্ন করেননি। গল্পে-উপন্যাসে আর্মচেয়ার ডিটেকটিভরা প্রচুর প্রশ্ন করে থাকেন, অনেক জবানবন্দী আদায় করেন গোপনে। কিন্তু এই অহঙ্কারী পলিতকেশ বৃদ্ধ কোন পথে হাঁটতে চাইছেন?
