কথা শেষ করার পরেও উৎপলেন্দুর মুখ সামান্য লাল। তা ছাড়া কথা বলার সময়ে বিরক্তি ছাড়াও কিছুটা রাগের ছোঁওয়া পাওয়া গিয়েছিল তাঁর ভঙ্গিতে।
উৎপলেন্দুর কথা শেষ হতেই শুরু হল নিস্তব্ধতা।
ভাস্কর রাহার চুরুট নিভে গিয়েছিল। সেটা তিনি ছাই ঝেড়ে পকেটে ঢোকালেন। এসিজি চুপচাপ তাঁর হাতের সিগারেটের অগ্নিবিন্দুর দিকে তাকিয়ে। রূপেন মজুমদার বেশ অপ্রস্তুত—কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। আর রঘুপতি যাদব জরিপ নজরে উৎপলেন্দুকে দেখছে।
নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বলল সে-ই।
‘ওয়ান্ডারফুল! ইনভেস্টিগেশনে হেল্প করার মতো এই প্রথম একটা ইমোশনাল রিঅ্যাকশান পাওয়া গেল।’ তারপর অশোকচন্দ্রের দিকে ফিরে, ‘স্যার, ইসকে বারে মে আপকা কেয়া রায় হ্যায়? এসবই তো আমরা চাই—ইমোশন্যাল রিঅ্যাকশন। কারণ এরকম জোশ থেকেই হয়তো মিস মানি খুন হয়ে গেছেন।’
এসিজি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল।
এবার ভাস্কর রাহা রিসিভার তুললেন।
রঘুপতি যাদব যথারীতি চটপটে পা ফেলে এগিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু রাহা টেলিফোনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরাস্ত রঘুপতি ‘ফোঁস’ করে একটা শব্দ করল। ভাস্কর রাহা আড়চোখে ইন্সপেক্টরকে একবার দেখলেন, তারপর টেলিফোনে কথা বললেন। ঘরের সিলিং-এ আধুনিক ডিজাইনের পাখা ঘুরছিল। তার বাতাসে ভাস্কর রাহার চওড়া কপালে শনের মতো চুল উড়ছিল।
ও-প্রান্ত থেকে প্রশান্ত রায় কথা বলছিলেন, ‘ডাইনিং হলে আসার দরকার নেই। ছ’জনের ব্রেকফাস্ট পাঠাচ্ছি। তিনশো আট নম্বরে। ওকে?’
‘পাঠিয়ে দিন,’ বলে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন রাহা। ভাবলেন, এক্সিকিউটিভ ম্যানেজারসাহেব এখনও টেলিগ্রাফিক ল্যাঙ্গুয়েজের ছক থেকে বেরোতে পারেননি। পুলিশি ধমক বলে কথা!
ব্রেকফাস্টের খবরটা সকলে শুনলেন।
উৎপলেন্দুর একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। অকালমৃত এক তরুণীর ঘরে বসে ব্রেকফাস্ট! কিন্তু রাহা তা ভাবেননি। দেবারতির ঘরে ব্রেকফাস্ট খেলে ও ভীষণ খুশি হত। প্রাণ ভরে গল্প করত ‘মুকুটহীন সম্রাট’-এর সঙ্গে। গল্পে গল্পে সময় কেটে যেত।
এখন তফাতের মধ্যে শুধু ও নেই।
উৎপলেন্দু সেনের প্রশ্নটা তখনও ঘরের বাতাসে ভাসছিল। তাঁর দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে অশোকচন্দ্র রঘুপতিকে বললেন, ‘রঘুপতি, আর চেপে রেখে লাভ নেই। মিস মানির লেখাটা ওঁদের পড়ে শোনাও—।’
‘দেবারতি মানির লেখা!’ রত্নাবলী রীতিমতো অবাক হয়ে গেলেন : ‘কী লেখা? সুইসাইড নোট?’
‘সুইসাইড নোটই বটে—’ তেতো হাসলেন অশোকচন্দ্র। তারপর রঘুপতিকে ইশারা করলেন কাজ শুরু করতে।
রঘুপতি যাদব তার হাতের কাগজপত্র একটা সোফার ওপরে নামিয়ে রেখেছিল। ব্যস্ত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড সেগুলো হাঁটকে একটা ফুলস্ক্যাপ কাগজ বের করে নিল। তারপর পায়ে পায়ে এসে দাঁড়াল ঘরের মাঝখানে। বলল, ‘এই কাগজটা আমরা পেয়েছি ওই গোল টেবিলের ওপরে—’ আঙুল তুলে জানলার কাছে রাখা টেবিলটা দেখাল রঘুপতি : ‘…চাবিটা যেখানে ছিল, সেইখানে। ওই টেবিলে বহত সারে কাগজাত ছিল। ওই সব কাগজাতের ভেতর থেকে এই শিটটা আমরা পেয়েছি। এতে মিস মানির হাফ ফিনিশড একটা লেখা রয়েছে। সেটাই আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি।’
সিগারেট আর চুরুটের ভারি গন্ধে হালকা পারফিউমের গন্ধ কখন যেন ঢাকা পড়ে গেছে। রূপেন মজুমদার, উৎপলেন্দু সেন, রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় আর ভাস্কর রাহা—এই চারজন প্রবীণ লেখক একরাশ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন রঘুপতি যাদবের দিকে।
রঘুপতি যাদব পড়তে শুরু করল।
‘বাংলা ডিটেকটিভ ফিকশন কখনও এরকম সাকসেসফুল জায়গায় আসবে সেটা সাত-আট বছর আগেও কেউ ভাবেনি। পনেরো-বিশজন লেখকের অক্লান্ত চেষ্টার পুরস্কার বলেই এটাকে মানতে হবে। অবশ্য তার সঙ্গে সম্পাদক আর প্রকাশকের ভূমিকাও রয়েছে। ওঁরা প্যাট্রনাইজ না করলে লেখকরা কী করে সামনে আসতেন!
‘এইসব চেষ্টার পাশাপাশি চলেছে রেডিও-টিভির পাবলিসিটি। তার ওপর যোগ হয়েছে এই অ্যানুয়াল কনফারেন্স। বলতে গেলে বাংলা ক্রাইম ফিকশনের এখন আর কোনও অভাব নেই। শিক্ষিত পাঠকও এটাকে এখন অ্যাকসেপ্ট করেছে। এটা আমার দারুণ তৃপ্তির জায়গা! ব্লিসফুল স্যাটিসফ্যাকশন।
‘রহস্য-সাহিত্য নিয়ে আন্দোলনের ব্যাপারটাকে আমি বরাবর শ্রেণি-সংগ্রাম হিসেবে দেখেছি। মেইনস্ট্রিম লিটারেচারের সঙ্গে একই সারিতে কখনও একে জায়গা দেওয়া হয়নি। কুলিন ব্রাহ্মণের সঙ্গে একই সারিতে কি হরিজনকে বসানো যায়! জন্মসূত্র ধরেই মানুষকে যেমন জাতপাতের বিভেদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়, এটার বেলাতেও যেন ঠিক তাই : জন্মসূত্রেই রহস্য-সাহিত্য তৃতীয় শ্রেণির সাহিত্য। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্যে নাক উঁচু সমালোচকদের কোনও যুক্তির দরকার হয় না। এ তো সবাই জানে, যুক্তি দেখাতে গেলে শিক্ষা-দীক্ষা প্রয়োজন। সুতরাং অশিক্ষিত সমালোচকের কাছে যুক্তির চেয়ে মতামতই হল বড় হাতিয়ার।
‘এরকম একটা অবস্থা থেকে যে-করে হোক সেই ‘হরিজন’ তার জায়গা করে নিতে পেরেছে ‘কুলীন ব্রাহ্মণ’-এর পাশে। নিশ্চয়ই কাজটা খুব সহজে হয়নি। যারা জানে তারা জানে।
‘এরকম একটা সিচুয়েশনে একটা খবর আমাকে চমকে দিল। একজন বিশ্বাসঘাতক লেখক হাজির রয়েছে এই কনফারেন্সে। খবরটা আমি যার কাছ থেকে শুনেছি তা মোটেই মিথ্যে হওয়ার নয়। ইটস ট্রুথ—বিটার ট্রুথ। আমি…।’
