ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! ভাবলেন উৎপলেন্দু। যে-মেয়েটার ওপরে তাঁর এত রাগ এত জ্বালা, তাকেই তিনি স্বপ্নের ঘোরে নায়িকা বলে কামনা করেন! স্বপ্নের ভেতরে ঘটে যাওয়া ঊরুতাড়িত মহাযুদ্ধে তিনি দেবারতি মানিকে পরাস্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন! ফ্রয়েড দিয়ে কি এই অদ্ভুত মানসিকতার কোনও ব্যাখ্যা করা যায়?
দেবারতির বিছানার ভারি চাদর ছুঁয়ে এইসব কথাই ভাবছিলেন উৎপল। রূপেন মজুমদার তাঁর পাশে চুপটি করে বসে। চোখেমুখে সামান্য অস্বস্তির ছাপ। রত্নাবলী সুদৃশ্য ড্রেসিং টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। বোধহয় কল্পনায় দেখছেন, দেবারতি ভুরুতে হালকা কাজল ছোঁয়াচ্ছে। আর ভাস্কর রাহা চুরুট হাতে খুব ধীরে পা ফেলে গিয়ে দাঁড়ালেন জানলার সামনে। জানলা তো নয়, মরণের দরজা!
এসিজি কখন যেন সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছেন। এলোমেলো পায়চারি করছেন ঘরের মধ্যে। চোখ কার্পেটের নকশার দিকে। আর রঘুপতি যাদব কাগজে কী সব নোট করতে-করতে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। একটু পরেই আবার বেরিয়ে এল। সোজা চলে গেল ওয়ার্ডরোবের দিকে। দরজার পাল্লা খুলে ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
অনেকগুলো থমথমে মুহূর্ত কেটে যাবার পর অশোকচন্দ্র গুপ্ত কথা বললেন, ‘জানেন, প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম দেবারতি মানি আত্মহত্যা করেছে—’ বাঁ হাত চুলের ভেতরে চালিয়ে দিলেন। কয়েক গোছা চুল ধরে আলতো করে টান মারলেন কয়েকবার। তারপর : ‘…কারণ, এই ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল। হ্যাঁ, এটা ঠিকই যে, এইসব আধুনিক হোটেলের দরজা বাইরে থেকে অথবা ভেতর থেকে—দু-দিক থেকেই লক করা যায়, কিন্তু মিস মানির ক্ষেত্রে প্রবলেম হল, ওর দরজার চাবিটা আমরা পেয়েছি ওই টেবিলের ওপরে। তার অর্থ, মিস মানি নিজেই দরজা লক করেছিল ভেতর থেকে। আর তারপর ও…।’
এসিজির কথা কেড়ে নিয়ে শেষ করল রঘুপতি যাদব। ওয়ার্ডরোবের পাল্লা বন্ধ করে ও চট করে ঘুরে তাকিয়েছে এদিকে : ‘…তারপর মিস মানি লাফ দিয়েছেন ওই খিড়কি দিয়ে। সিধা গিয়ে পড়েছেন ওঁর মোটরের ছাদে।’ রাহার দিকে আঙুল তুলে দেখাল যাদব : ‘তারপর মোটর থেকে শান বাঁধানো টেরাসে। কোয়াইট আ মেসি জব। মাথাটা একেবারে চুরচুর হয়ে গেছে।’
একটু থেমে যাদব আবার বলল, ‘লেকিন তাজ্জব কী বাত হল, দেবারতি মানির ঘরের ওই দরজা—’ আঙুল তুলে দরজার দিকে দেখিয়ে সে বলেছে, ‘অন্দরসে লক করা ছিল। আর চাবিটা ছিল ওই টেবিলের ওপরে—’ জানলার কাছাকাছি রাখা গোল টেবিলটাকে ডান হাতের তর্জনী ব্যবহার করে দেখিয়ে দিয়েছে রঘুপতি যাদব।
‘কেন, তাজ্জব কী বাত কেন?’ প্রশ্নটা করেছেন রূপেন মজুমদার, ‘সুইসাইড যদি হয় তা হলে তো এরকমটাই হওয়ার কথা—’ রূপেন মজুমদার এখনও বোধহয় এই ব্যাপারটাকে আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছু বলে ভাবতে পারছিলেন না।
‘এইরকম ভোলাটাইল মেমোরি নিয়ে আপনি ডিটেকটিভ ফিকশন লেখেন!’ ব্যঙ্গের হাসি হাসল রঘুপতি যাদব : ‘একটু আগেই তো নীচে স্যার আপনাদের বললেন, ইটস আ কেস অফ মার্ডার—প্লেইন অ্যান্ড সিম্পল। সেইজন্যেই বলেছি তাজ্জব কী বাত।’
উৎপলেন্দু সেন মাথা ঝুঁকিয়ে সিগারেট ধরালেন। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘প্রশান্তবাবু তো শুনলাম দরজা ভেঙে এ-ঘরে ঢুকেছেন। তারপর কেউ এসে চাবিটা টেবিলের ওপরে রেখে যায়নি তো?’
অশোকচন্দ্র গুপ্ত উৎপলের কথার জবাব দিলেন, ‘না, সেরকম কোনও সুযোগ ছিল না। এক্সিকিউটিভ ম্যানেজারের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। পুলিশ না আসা পর্যন্ত এই ঘরের দরজায় কড়া পাহারা ছিল। আমাদের অন্য কিছু ভাবতে হবে, উৎপলেন্দুবাবু।’
উৎপলেন্দুর দিশেহারা অভিব্যক্তি দেখে ভাস্কর রাহা এই প্রথম কথা বললেন, ‘অর্থাৎ, ইম্পসিবল প্রবলেম—জন ডিকসন কার।’
ভাস্কর রাহা মন্তব্যটি করেছিলেন নীচু গলায়। কিন্তু অশোকচন্দ্রের প্রখর কান সেটা শুনতে পেয়েছে। আর উৎপলেন্দু রাহার কাছাকাছি থাকায় তাঁরও শুনতে কোনও অসুবিধে হয়নি।
পায়চারি থামিয়ে একটা সোফায় নিজেকে ডুবিয়ে দিলেন এসিজি। পাকা চুলের গোছায় বাঁ হাতের আঙুল ডুবিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে মুচকি হাসলেন তিনি : ‘চমৎকার বলেছেন, ভাস্করবাবু। জন ডিকসন কার। ডিকসন কার নিজের নামে অথবা কার্টার ডিকসন ছদ্মনামে সারাজীবন শুধু ”অসম্ভব রহস্য” নিয়েই গল্প-উপন্যাস লিখে গেছেন। ব্যবহার করেছেন দুই গোয়েন্দা : ড. গিডিয়ন ফেল, আর স্যার হেনরি মেরিভেল।’ একটু থামলেন অশোকচন্দ্র, সকলের মুখের দিকে একবার তাকালেন : ‘…সুতরাং ভাস্করবাবু, একটা জিনিস তো আপনি ভালোই জানেন…এই ইম্পসিবল প্রবলেমগুলোর সমাধান খুব সাদামাঠা হয়। আমার ধারণা, দেবারতি মানির বেলাতেও এই জেনারাল রুলের কোনও হেরফের হবে না। শুধু প্রবলেমটা সলভ করতে একটু সময় লাগবে, এই যা।’
উৎপলেন্দু আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। বেশ বিরক্তভাবে বলে উঠলেন, ‘সেই কাল রাত থেকে এর-ওর মুখে শুনে আসছি দেবারতি খুন হয়েছে। আবার দু-একজন বলছেন সুইসাইড। আজ সকালে আপনারা বললেন ব্যাপারটা খুন—তার ডেফিনিট প্রমাণ আপনারা পেয়েছেন। অথচ দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে হয়েছে। দরজার চাবি পাওয়া গেছে ওই টেবিলে। এরপরেও যদি ব্যাপারটা সুইসাইড না হয়, তা হলে কোথায় সেই ডেফিনিট প্রমাণ? আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে।’
